নোয়াখালি দিবস নিয়ে বিজেপি নেতার টুইট ভাগ করলেন তথাগত রায়

“বাঙালি হিন্দু নোয়াখালী সম্পর্কে না জানলে ভবিষ্যতে নোয়াখালী হওয়া আটকাবে কিভাবে?” এতে প্রায় কমপক্ষে ৫,০০০ হিন্দু হত্যা করা হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। এছাড়া অনেক হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হন এবং হাজার হাজার হিন্দু নারী-পুরুষ’কে জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়।

অশোক সেনগুপ্ত আমাদের ভারত, ৭ অক্টোবর: নোয়াখালি দিবস নিয়ে বিজেপি-র সামাজিক মাধ্যম শাখার প্রধান স্বরূপ চট্টোপাধ্যায়ের টুইট ভাগ করলেন তথাগত রায়। এতে লেখা, “সামনেই নোয়াখালী দিবস আসছে। নোয়াখালী হিন্দু গণপহত্যার বর্ষপূর্তি। ক্যালেন্ডার মানলে ১০ই অক্টোবর আর ভারতীয় তিথি মানলে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন। ওই দিনটা কিন্তু স্মৃতিচারণ থেকে ভুললে চলবে না। বাঙালি হিন্দু নোয়াখালীর সম্পর্কে না জানলে ভবিষ্যতে নোয়াখালী হওয়া আটকাবে কিভাবে?”

এর পাশাপাশি টুইটারে তথাগতবাবু লিখেছেন, “মেঘনাদ সাহা যে তাঁর জন্মগ্রাম শেওড়াতলীতে ফিরে যেতে পারেননি তা তো তাঁর হিন্দু হবার অপরাধেই! সেটা বললেই ‘সেকুলার’ আর মোল্লাগোষ্ঠী হাঁ হাঁ করে উঠবে? সোয়া কোটি বাঙালি হিন্দুকে যে পথের ভিখারী করে ছেড়েছিল বাঙালি মুসলমানেরা তা কি ভুলে যেতে হবে?“

কী হয়েছিল নোয়াখালি দিবসে? তৎকালীন অবিভক্ত নোয়াখালী ছিল বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী নিয়ে এবং অবিভক্ত ত্রিপুরা জেলা ছিল বর্তমান কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া অঞ্চল নিয়ে গঠিত।

হিন্দুদের উপর এই গণহত্যার শুরু হয়েছিল ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর কোজাগরি লক্ষ্মী পূজার দিন এবং প্রায় চার সপ্তাহ ধরে অব্যাহত ছিল পৈশাচিক হত্যাকান্ড।

এতে কমপক্ষে ৫,০০০ হিন্দু হত্যা করা হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। এছাড়া অনেক হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হন এবং হাজার হাজার হিন্দু নারী-পুরুষ’কে জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ বেঁচে থাকা হতভাগ্যকে কুমিল্লা, চাঁদপুর, আগরতলা ও অন্যান্য জায়গার অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরগুলোতে আশ্রয় দেওয়া হয়। এছাড়া প্রায় ৫০,০০০ হিন্দু আক্রান্ত এলাকায় মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকে। কিছু এলাকায় হিন্দুদের স্থানীয় মুসলিম নেতাদের অনুমতি নিয়ে চলা ফেরা করতে হত।

জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিতদের কাছ থেকে জোর করে লিখিত রাখা হয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল তারা স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়েছে। তাদের একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে বা ঘরে আবদ্ধ করে রাখা হত এবং যখন কোনও আনুষ্ঠানিক পরিদর্শক দল পরিদর্শনে আসত তখন তাদের ওই নির্দিষ্ট বাড়িতে যাবার অনুমতি দেওয়া হত। হিন্দুদের ওই সময় মুসলিম লীগকে চাঁদা দিতে হত যাকে বলা হত জিজিয়া (যা একসময় ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। মুসলিম শাসন আমলে হিন্দুরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তৎকালীন শাসকদের ‍জিজিয়া নামক বাড়তি কর প্রদান করত।)

বঙ্গীয় আইন সভায় নোয়াখালী থেকে একমাত্র হিন্দু প্রতিনিধি হারান চন্দ্র ঘোষ চৌধুরী এই দাঙ্গাকে হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের প্রচণ্ড আক্রোশের প্রকাশ বলে বর্ণনা করেন। বাংলার সাবেক অর্থ মন্ত্রী ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়  নোয়াখালী দাঙ্গাকে একটি সাধারণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসেবে দেখানোর বিতর্ককে প্রত্যাখান করেন। তিনি এ ঘটনাকে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর সংখ্যাগুরু মুসলিমদের সুপরিকল্পিত এবং সুসংঘটিত আক্রমণ বলে বর্ণনা করেন।

৪ নভেম্বর, ১৯৪৬ তারিখে ভারত ও বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) আন্ডার সেক্রেটারি আর্থার হেন্ডারসন হাউস অব কমেন্সে উল্লেখ করেন, নোয়াখালী আর ত্রিপুরা জেলার (কুমিল্লা, চাঁদপুর  ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমন্বয়ে ছিল ত্রিপুরা জেলা) মৃতের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় সম্ভব হয়নি। এই দুই জেলায় কয়েক হাজার বাড়ি লুট হয়েছে, শুধুমাত্র ত্রিপুরাতেই ৯,৮৯৫ টি ধর্মান্তকরণের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে; নোয়াখালীতে যার সংখ্যা অগণিত। এছাড়া হাজার হাজার হিন্দু নারীদের অপহরণ করা হয়েছে।

মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে শিবির করেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নোয়াখালী ও এর আশেপাশের এলাকাগুলো ঘুরে দেখেন। যদিও এই শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কংগ্রেস সভাপতি আচার্য্য কৃপালনির স্ত্রী সুচেতা কৃপালনি নোয়াখালীতে নারী উদ্ধার করতে যান।

বেঁচে যাওয়া হিন্দুদের আত্মবিশ্বাস চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। তাঁরা কোনওদিন তাদের নিজেদের গ্রামে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেনি। এর মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্ব ভারত বিভাগ মেনে নেয় যার ফলে শান্তি মিশন এবং আক্রান্তদের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম পরিত্যক্ত হয়। বেশির ভাগ বেঁচে যাওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দুরা তাদের বাড়ি-ঘর ফেলে পশ্চিম বঙ্গ, ত্রিপুরা এবং অসমে  চলে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *