তাঁর সমালোচকদের কড়া জবাব দিলেন সুকান্ত মজুমদার

শ্রীরূপা চক্রবর্তী
আমাদের ভারত, ১৫ সেপ্টেম্বর: খুব কম তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। এই সমালোচনা ঠিক যেদিন থেকে তিনি রাজ্য বিজেপির সভাপতিত্বের দায়িত্ব নিয়েছেন সেই দিন থেকেই শুরু হয়েছে। কিন্তু এবার বোধহয় তার জবাব দিলেন সুকান্ত মজুমদার। দেখিয়ে দিলেন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রশ্নে তিনি মোটেই অন্য কারোর চেয়ে কম যান না। বরং দরদ দিয়ে সংগঠন করার উদাহরণও তিনি রেখেছেন। নবান্ন অভিযানের মত একটা বড় কর্মসূচিকে বাস্তবায়ন করার মধ্যে দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করেছেন বালুরঘাটের অধ্যাপক। তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি কর্মীরা পুলিশকে কেমন নাস্তানাবুদ করল তা চাক্ষুস করেছে রাজ্যের মানুষ।

বিজেপির রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তাঁকে নানা সময়ে অভিজ্ঞতা নিয়ে কটাক্ষ শুনতে হয়েছে। রাজনীতিতে তিনি নতুন, এই কথা যেমন দলের ভেতরে তাকে শুনতে হয়েছে একইভাবে তৃণমূল নেতৃত্বও তাঁকে শিশু বলে কটাক্ষ করেছে। কিন্তু নবান্ন অভিযানকে সফল করে শিশু কিভাবে মহীরুহ হয়ে ওঠে তা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। আর তাতেই একটা পাকাপোক্ত জবাব সমালোচকরা পেয়েছেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

রাজ্যের বর্তমান প্রজন্মের সামনে নবান্ন অভিযানের মতো আন্দোলন বেশ কিছু দিক থেকে মনে রাখার মতো। কারণ সাধারণত এই ধরণের অভিযান পুলিশ বাধা দেওয়ার পর খুব জোর হলে আধঘন্টা স্থায়ী হয়। বেশি হলে ৪০ মিনিট পুলিশের সঙ্গে রাজনৈক কর্মীদের লড়াই চলে। কিন্তু সুকান্ত মজুমদারের ডাকে বিজেপি কর্মীরা সেদিন পুলিশের সঙ্গে যেভাবে দীর্ঘস্থায়ী সামনাসামনি লড়াই চালিয়ে গেছেন তা সাম্প্রতিক অতীতে দেখা যায়নি। বিজেপি কর্মীরা টানা সাড়ে চার ঘন্টা ধরে পুলিশকে নাস্তানাবুদ করেছে। কখনো পুলিশের তাড়ায় বিজেপি কর্মীরা পিছু হটেছে, আবার বিজেপি কর্মীদের পাল্টা প্রতিরোধে পুলিশও পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এইভাবে বিজেপি কর্মীরা টানা সাড়ে চার ঘন্টা এই আন্দোলনকে জিইয়ে রেখেছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শেষপর্যন্ত ব্যারাকপুরের লাটবাগান থেকে অতিরিক্ত পুলিশবাহিনী আনতে হয়েছিল।

ছবি: ব্যারিকেড টপকানোর চেষ্টা করছেন সুকান্ত মজুমদার

একেবারে বুক চিতিয়ে সেদিন লড়াই করেছেন সুকান্ত মজুমদার। সামনে থেকে পুলিশের জল কামানের মুখোমুখি হয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। অভিযানের আগের দিন বিকেল থেকেই বিভিন্ন জেলায় বিজেপি কর্মীদের ধরপাকড় করেছে পুলিশ। তাদের কলকাতায় আসতে ট্রেনে উঠতে বাধা দিয়েছে, গ্রেপ্তার করেছে। পরদিন বিভিন্ন জায়গায় সড়কপথে বিজেপি কর্মীদের বাস আটকে দেওয়া হয়েছে, তাদের ট্রেনে উঠতে দেওয়া হয়নি। শুধু প্রধান সড়কেই নয়, রওনা দেওয়ার পরেই বিভিন্ন এলাকায় তাদের বাস আটকানো হয়েছে, মিছিল আটকানো হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গায় ছোটাহাতি থেকেও ১১জন বিজেপি কর্মীকে আটক করা হয়েছিল। তবু সুকান্ত মজুমদারের ডাকে বিজেপি কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে কলকাতায় হাজির হয়েছিল।

গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী তিনটে জায়গায় কমপক্ষে দেড় লক্ষ বিজেপি কর্মী সমর্থকদের জমায়েত হয়েছিল সেদিন। এইসব অকুতোভয় কর্মীরা, সুকান্ত মজুমদারের ডাকে সাড়া দিয়ে কলকাতা মুখি হয়েছিল।

গত বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সন্ত্রাসের কারণে বিজেপি কর্মীরা বলা যায় ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। রাজ্যস্তরের নেতারাও তার পর তেমন কোনও বড় আন্দোলন করতে পারেননি। কর্মীদের অভিযোগ, কোনও নেতাই তখন তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। সেই হতাশা কাটিয়ে কর্মীদের ঘর থেকে বের করে এনে আন্দোলন মুখী করাটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু সুকান্ত মজুমদার সেই কঠিন কাজে সফল।

রাজ্য সভাপতি হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণার পরেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন পুরনোদের যেমন সম্মান দিতে হবে, তেমনি অত্যাচারিত কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নবান্ন অভিযানের দিন ঘোষণার পর থেকে তিনি গোটা রাজ্য চষে বেড়িয়েছেন। মাটি কামড়ে পরে ছিলেন। প্রতিটি জেলায় গিয়ে মিছিল মিটিং করেছেন, ডাক দিয়েছেন ১৩ তারিখ কলকাতার রাজপথে সবার সঙ্গে দেখা হবে। তার কথা রেখেছেন কর্মীরা। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙ্গেছেন পদ্ম কর্মীরা নির্ভয়ে জল কামানের মুখোমুখি হয়েছে।

সুকান্ত অনুমান করেছিলেন, আন্দোলন ব্যর্থ করতে ১৩ তারিখ সকালে তাঁকে হয়তো বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হবে না। কিন্তু সেই পরিকল্পনা তিনি ভেস্তে দেন। ১২ তারিখ রাতেই তিনি চুপিসারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। তারপর হাওড়া স্টেশনের ওয়েটিং রুমে রাত কাটিয়েছেন। ভোর থেকে হাওড়া স্টেশনে যে সমস্ত কর্মীরা এসেছেন তাদের স্বাগত জানিয়েছেন, খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। কর্মীদের সাথে তার একাত্মতা সংগঠনের শক্তি হবে আগামী দিনে।

এরপর সেই কর্মীদের নিয়ে মিছিল করে হাওড়া স্টেশন থেকে হাওড়া ময়দানে গেছেন, সেখানে জনসভা করেছেন। তারপর মিছিল নিয়ে পুলিশের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রথম ব্যারিকেড ভেঙ্গে দ্বিতীয় ব্যারিকেডের সামনে জলকামানের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁকে আটকে দেওয়ায় সেখানেই তিনি ধর্নায় বসেন। বিকেল পর্যন্ত অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে গেছেন। তারপর তাঁকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। দীর্ঘ সময় থানায় আটক থাকার পর তিনি ছাড়া পেলেও গ্রেফতার হওয়া বিজেপি কর্মীদের মুক্তির দাবিতে থানায় বসেই বিক্ষোভ দেখান। আর এই পদক্ষেপগুলোই তাঁকে কর্মীদের প্রিয় “সুকান্ত দা” করে তুলেছে। সেই কারণেই আজ তিনি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে গেলেন জননেতা হবার দৌড়ে।
(ছবি: ওপরে জলকামানের মুখে সুকান্ত মজুমদার)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *