পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর: খড়গপুর আইআইটিতে ছাত্রের দেহ উদ্ধারের ঘটনা অস্বাভাবিক ও খুন বলে দাবি করলেন মৃত ছাত্রের পরিবার। আইআইটি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে সঠিক তদন্ত ও বিচারের জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আর্জি রাখলেন অসমের তিনসুকিয়ার বাসিন্দা তথা মৃত ছাত্রের বাবা সেলিম আহমেদ। শনিবার সন্ধ্যায় মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ছেলের দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বপরিবার, জ্ঞান হারিয়ে অসুস্থ হওয়া এক আত্মীয়কে ভর্তি করতে হয় হাসপাতালে।
শুক্রবার সকালে খড়্গপুর আইআইটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ফয়জাল আহমেদ(২৩) এর মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল আইআইটি ক্যাম্পাসে থাকা লালা লাজপত রায় হোস্টেলের ভেতর থেকে। সে থাকতো পাশের রাজেন্দ্রপ্রসাদ হোস্টেলে৷ দুদিন ধরে তার সহপাঠীরা ফয়জালকে দেখতে পাচ্ছিল না। শুক্রবার সকালে হোস্টেলের একটি বন্ধ ঘর নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় আইআইটি কর্তৃপক্ষকে জানালে সেই ঘরের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে দেহ পড়ে থাকতে দেখতে পান সকলে। দেহটি ফুলে যাওয়ায় মৃত্যু অনেক আগেই হয়েছিল বলে ধারণা হয়। ঘটনার পরই আইআইটি কর্তৃপক্ষ পরিবারকে ফোনে বিষয়টা জানায়।
ফয়জালের বাড়ি অসমের তিনসুকিয়া এলাকায়। মেধাবী এই ছাত্র সারা রাজ্যে নামকরা বলেই জানা গিয়েছে। তাই মৃত্যুর খবর শুনে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা শোক প্রকাশ করেছেন টুইটারে। শনিবার বিকেলের পর মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে হাজির হয় মৃত ছাত্রের পরিবারের একাধিক সদস্যরা। মর্গের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ওই ছাত্রের মা, মাসি ও বাবা সকলেই। এরপর ময়নাতদন্ত শুরুর আগে মর্গে ছেলের দেহ দেখতেই সকলে চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দেন। অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়া দেহ দেখে ফয়জালের বাবা সেলিম আহমেদ ও পরিবারের লোকেরা দাবি করেন এই দেহ তাদের ছেলের নয়। পরক্ষণেই আবার বলেন, এরকম শরীর হওয়ার পেছনে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছিল। কিভাবে এরকম হলো?
সেলিম আহমেদ বলেন, “আমার ছেলে রাজ্যের নামকরা একজন প্রতিভাবান ছাত্র। শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ও মানসিক দিক থেকেও প্রফুল্ল। কোথাও কোনো রকমের চিন্তা মানসিক সমস্যা ওর ছিল না। গত জুলাই মাসে এখানে এসেছে। গত মঙ্গলবার তার সঙ্গে আমাদের শেষ কথা হয়েছে। বুধবার সন্ধে থেকে তার সুইচ অফ ছিল মোবাইলের। আমরা ভেবেছিলাম পড়াশোনার জন্য মোবাইল বন্ধ রেখেছে। বৃহস্পতিবারও তার মোবাইল বন্ধ পেয়েছি। শুক্রবার সকালে আমাদের আইআইটির লোকজন ফোন করে জানায়, ছেলের কিছু হয়েছে বলে। কিন্তু তারপর আমরা বারবার ফোন করে আমাদের পরিচয় দিয়ে আইআইটি’র কাছে জানতে চাইলে ফোন কেটে দিয়েছে, কোনো উত্তর দেয়নি। আমার ছেলে এভাবে মরতে পারে না। এটা আত্মহত্যা নয়। আমরা সঠিক বিচার চাইছি। আইআইটি কর্তৃপক্ষ জবাব দিক। এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দিদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আমরা বিচার চাইছি। এরকম হলে এই রাজ্যে কেউই পড়তে আর আসবে না।”
মর্গে ওই ছাত্রের দেহ দেখতে ওই হোস্টেলে থাকা আরো কয়েকজন সিনিয়র ছাত্র হাজির হয়েছিলেন। তাদের দাবি, “আমাদের রাজেন্দ্র প্রসাদ হল হোস্টেলে ফাইজাল থাকতো। কিন্তু কোনো কারণে পাশের লালা লাজপত রায় হোস্টেলে সে গিয়েছিল। কয়েকদিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তারপরে শুনলাম এই ঘটনা ঘটেছে। কিভাবে এই ঘটনা ঘটলো তা আমরাও বুঝতে পারছি না।”
আইআইটির একটি সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের পড়ার প্রয়োজনে সহপাঠীদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডি করতে নিজেদের মধ্যে রুম পরিবর্তন করে থাকে মাঝে মধ্যেই। রাজেন্দ্র প্রসাদ হল ও লালা লাজপত রায় হলের দূরত্ব দেড়শো মিটারের মতো৷ ফলে বিষয়টি স্বাভাবিক অনেকক্ষেত্রে। পরীক্ষা বা কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে একত্রে আলোচনা করতে এরকম হয়েই থাকে। তাই সে হয়তো নিজের হোস্টেলের রুম পরিবর্তন করে বন্ধুদের হোস্টেল রুমে এসেছিল। তবে এটা সঠিক কারণ নাকি আরো অন্য কিছু কারণ রয়েছে সেটাও খতিয়ে দেখছে আইআইটির কর্তৃপক্ষ।
এদিন আইআইটির পক্ষ থেকে পোস্টমর্টেম এর মর্গে হাজির হয়েছিলেন এগ্রিকালচার এন্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার সোয়াইন। তিনি এই নিয়ে কোন মন্তব্য করতে চাননি। শুধু বলেন, “এটা পুলিশি তদন্তের বিষয়। পুলিশ বিষয়টি দেখবে। আমি কোনো মন্তব্য করব না।”

