প্রদীপ দাস, আমাদের ভারত, অক্টোবর: ব্রাহ্মণদের কেন টার্গেট করা হয়েছে? আসলে মূল টার্গেট হিন্দু। উদ্দেশ্য হিন্দুদের ধর্মবোধ বা ধর্মাচরণ থেকে হিন্দুদের সরিয়ে আনা। আসলে এই ব্রাহ্মণসমাজই হিন্দু ধর্মকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। আচার অনুষ্ঠান করতে ব্রাহ্মণদের ডাক পড়ে। তাই ব্রাহ্মণদের বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে ধীরে ধীরে হিন্দুরা পুজোআচ্চা থেকে সরে আসে। হিন্দুধর্মের ক্ষতি করার জন্য কয়েক’শ বছর ধরে নানাভাবে চেষ্টা চলছে, তারই কৌশল হিসাবে এবার টার্গেট করা হয়েছে ব্রাহ্মণদের।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে একসময় কিছু স্বার্থান্বেষী ব্রাহ্মণ (হতে পারে সেক্ষেত্রেও কোনও বড় চক্রান্ত ছিল, কারণ তাতে ধর্মান্তকারীদের সুবিধা হত) শাস্ত্র বহির্ভূত কিছু সামাজিক বিধি-নিষেধ চালু করতে চেয়েছিল। তারা নিম্নবর্ণের মানুষকে অচ্ছুৎ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল। যদিও তাদের সেই বিধি-নিষেধ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিন্তু এর ফলে নিম্ন সম্প্রদায়ের হিন্দুদের একটা বড় অংশ ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। একসময় শ্রী চৈতন্য দেব আচন্ডালে প্রেমের কথা বলে এই নিম্নবর্ণের হিন্দুদের অন্যধর্মে যাওয়া আটকে দিতে পেরেছিলেন। দলে দলে তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে ঠাকুর হরিচাঁদ গুরুচাঁদও নিম্নবর্ণের মানুষকে কাছে টেনে নিয়ে মতুয়া সম্প্রদায় তৈরি করে ধর্মান্তকরণ রুখে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মুষ্টিমেয় ব্রাহ্মণদের জন্য এখন গোটা ব্রাহ্মণ সমাজকে দায়ী করা যায় না।
বর্তমানে সেই বিধি-নিষেধ বলে আর কিছু নেই। কিন্তু তা সত্বেও অতীতের সেই কিছু নিদর্শন তুলে ধরে ব্রাহ্মণদের হেয় করা হচ্ছে। আসলে ব্রাহ্মণদের প্রতি শ্রদ্ধাভাব নির্মূল করে তাদের প্রতি বিদ্বেষ তৈরির চক্রান্ত শুরু হয়েছে। কারণ এদের মূল লক্ষ্য ধর্মাচরণ থেকে হিন্দুদের সরিয়ে আনা।
আর এই প্রচারের অংশ হিসেবে চক্রান্তকারীরা ব্রাহ্মণের ঘরের ছেলে মেয়েদের টার্গেট করেছে। তাদের রীতিমতো মগজ ধোলাই করে হিন্দু ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি করা হয়েছে। আর সেই বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায় নামধারীরাই সামনে থেকে হিন্দু ধর্ম এবং ব্রাহ্মণদের সমালোচনা শুরু করেছে। তাদের এই প্রচেষ্টা অনেকটাই সফল হয়েছে। শিক্ষিত সমাজের একটা বড় অংশ এখন ধর্মবিমুখ হয়ে পড়েছে। অথচ অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রে শিক্ষিতরা তাদের ধর্মানুষ্ঠানের যোগ দেওয়াকে কর্তব্য বলে মনে করে। আর পশ্চিমবঙ্গে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে শিক্ষিতরা ধর্ম অনুষ্ঠানে যোগ দিলে হীনমন্যতায় ভোগে, তাদের মধ্যে এমন বোধ তৈরি হয়েছে যে ধর্মাচরণ করা মানেই ব্যাক ডেটেড। তবে আশার কথা সমাজের বৃহত্তর অংশে এখনও সেইভাবে প্রভাব পড়েনি।
ব্রাহ্মণরা টিকে আছে হিন্দুসমাজের জন্যই। যুগ যুগ ধরে তারা পুজো করে, গৃহস্থের মঙ্গল কামনা করে পারিশ্রমিক হিসেবে সামান্য ভুর্জি, গোটাকয়েক ফল আর নামমাত্র দক্ষিণা পান। তাই দিয়ে কায়ক্লেশে তাদের সংসার চলতো। গরিব ব্রাহ্মণের ভরসা ছিল ঈশ্বর। ঈশ্বরের আরাধনা এবং তাঁর নামগান করেই চলত। কিন্তু সেই জায়গাতেই আঘাত করা হয়েছে। অতীতের কিছু ব্রাহ্মণের কার্যকলাপ তুলে ধরে এই গরিবব্রাহ্মণদের অত্যাচারকারী শ্রেণির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার ওপর চক্রান্তকারীরা ব্রাহ্মণ সন্তানদের টার্গেট করার ফলে এখন আর কেউ সেভাবে পূজার্চনাকে পেশা হিসাবে বেছে নিচ্ছে না। তারওপর প্রতিনিয়ত অপমান, অসম্মান দেখে পুরোহিতরা তাঁদের ছেলেকে চাকরি বা ব্যবসার কাজে যুক্ত করে দিচ্ছেন। হয়তো একসময় পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছবে যে আগামী দিনে পুজোপাঠ করার জন্য কোনও ব্রাহ্মণ খুঁজে পাওয়া যাবে না এবং সেটাই এই চক্রান্তকারীদের মূল লক্ষ্য।

