রাস উৎসবে জমজমাট শান্তিপুর

স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া, ৮ নভেম্বর: বলা হয় রস থেকে রাস। বৈষ্ণব দর্শনে বলা হয় পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ হলেন মধুর রসের ঘনীভূত আধার। তাঁকে ঘিরে যে উৎসব তাই রাসউৎসব। বৈষ্ণবদের কাছে রাস কথাটি অন্য অর্থ বহন করে। রাস পূর্ণিমার রাতে শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনের যমুনার তীরে গোপীনিদের আহ্বান করেন এবং তাঁদের অহংবর্জিত বিশুদ্ধ ভক্তি ভাবে তুষ্ট হয়ে সঙ্গদান করেন। তাই বৈষ্ণবদের কাছে রাস ভক্তের সঙ্গে ভগবানের মিলন উৎসব। ভজনকুঠিরের নিভৃত কোণে হেমন্তের জ্যোৎস্না ভেজা রাতে ইষ্টের সঙ্গে ভক্তের মিলনেই রাসের সার্থকতা।

সন্ধ্যারতি শেষ হতেই মাঝবয়সি ভক্ত বিগ্রহের দিকে হাতজোড় করে প্রণাম করে তুলে নিলেন আড়বাঁশিটি। তিলক মাটিতে আঁকা রসকলি নাকের তীক্ষ্ণ ডগা থেকে উঠে গিয়েছে প্রশস্ত কপাল পর্যন্ত। গভীর শান্ত চোখ দুটি বুজে আলতো ফুঁয়ে ধরলেন রাগ ‘কেদার’। সেই শান্ত হেমন্ত সন্ধ্যায় বাঁশির সুর ভজনকুটিরের উঠোন ছাড়িয়ে ভেসে যেতে লাগল সুরধনী গঙ্গার দিকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঁদ হয়ে উঠছে রাস পূর্ণিমার রাত। ভিড় বাড়ছে আসরে। এ বার বাঁশির সঙ্গে ‘নিখুঁত কণ্ঠ’ মিলিয়ে বৈষ্ণবী গেয়ে উঠলেন মহাজনপদ— “কাঞ্চন মণিগণ, জনু নিরমাওল, রমণীমণ্ডল সাজ। মাঝহি মাঝ, মহামরকত সম, শ্যামর নটবর রাজ। ধনি ধনি অপরূপ রাসবিহার। থির বিজুরি সঞে, চঞ্চল জলধর, রস বরিখয়ে অনিবার।” জোড়া মৃদঙ্গে বেজে উঠল ‘দশকুশি’। বৈষ্ণব ভজনকুটির বা আখড়াগুলিতে এ ভাবেই পালিত হয় রাস। বৈষ্ণব দর্শন রাসের যে ব্যাখ্যাই করুক। বৈষ্ণব আখড়ায় যে ভাবেই রাস পালিত হোক না কেন। চৈতন্যধাম নবদ্বীপে কিন্তু রাস আসে সম্পূর্ণ অন্য রূপে।

পূর্ণিমার ভরা চাঁদের রাতে বিশুদ্ধ তন্ত্র মতে শতাধিক শক্তিমূর্তির সাড়ম্বর পুজো। সঙ্গে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা উৎসবের এক উচ্চকিত দামাল উদযাপন। রাস পূর্ণিমার রাতে নবদ্বীপে বিচিত্র রূপের শক্তি মূর্তিরই প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। যে জন্য অনেকে নবদ্বীপের রাসকে শাক্তরাস বলে থাকেন। নবদ্বীপের এই অন্যরকম রাসের উৎস ঠিক কবে?

ইতিহাস বলে, নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালে (১৭২৮-৮২) রাসের বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়েছিল। রাজা হওয়ার পর থেকে ১৭৫০ পর্যন্ত কৃষ্ণচন্দ্র নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন। সামলে ওঠার পর তিনি একের পর এক মন্দির স্থাপন, বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা এবং মেলা উৎসবের সূচনা শুরু করেন। ১৭৫৩-৫৬-র মধ্যে তিনি জগদ্ধাত্রীপুজো, বারোদোলের সূচনা করেন। মনে করা হয় ওই একই সময়ে তিনি নবদ্বীপে বৈষ্ণবদের রাস উৎসবের খোলনলচে বদলে দেন। আসলে, কৃষ্ণচন্দ্র নিজে ছিলেন শাক্ত। নদিয়া, অগ্রদ্বীপ, কুশদ্বীপ এবং উলা এই চারটি সমাজের সমাজপতি। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি তাঁর রাজত্বে শক্তিসাধনার প্রচার ও প্রসার হোক তা মনেপ্রাণে চাইতেন। কিন্তু চৈতন্যদেবের পুজো হোক মঠে-মন্দিরে এটা তিনি কোনো ভাবেই মানতে পারেননি। শ্রীচৈতন্যের অবতারত্বে ঘোর অবিশ্বাস ছিল তাঁর। পাশাপাশি চৈতন্য অনুগামীরা বেদবিধি ও ব্রাহ্মণ্যস্মৃতি মানতেন না। এটাও কৃষ্ণচন্দ্রের আপত্তির একটা বড় কারণ ছিল। পরিকল্পিত ভাবেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাসপূর্ণিমার রাতকে। কেননা সেকালের নবদ্বীপের বৈষ্ণবমন্দিরে রাস পূর্ণিমার রাতে পটে আঁকা রাধাকৃষ্ণের ছবির সামনে সাড়ম্বরে রাস উদ্‌যাপন হতো।” তখন স্মৃতি এবং নব্যন্যায়ের তাবড় তাবড় পণ্ডিতের বাস নবদ্বীপে। তাঁদের অনেক ধনী শিষ্য ছিলেন। মহালয়ার সকালে তর্পণ সেরে এই পণ্ডিতরা চলে যেতেন দুর্গাপুজো করতে। মাসখানেক পরে প্রচুর উপার্জন সেরে বাড়ি ফিরে তাঁরা যে যার বাড়িতে গৃহদেবতার বা ইষ্টদেবীর পুজো করতেন। কালী, শবশিবা, মুক্তকেশী প্রভৃতি দেবীর পুজো করতেন তাঁরা। গোটা এলাকার মানুষ নিমন্ত্রিত হতেন সেই পুজোয়। একদিকে বৈষ্ণব মঠে উৎসব আর এক দিকে শহরের ধনী পণ্ডিতদের বাড়ির উৎসব। দুয়ে মিলে সেকালের নবদ্বীপও রাসের সময় জমজমাট হয়ে থাকত। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র উৎসবমুখর নবদ্বীপকেই বেছে নিলেন রাসের চরিত্র বদলানোর জন্য।

তিনি ঘোষণা করেন, যিনি ঘটের বদলে মাটির মূর্তি গড়ে পুজো করবেন তিনি রাজানুগ্রহ পাবেন। তাঁর এই ঘোষণায় প্রথম সাড়া দিলেন ভারতবিখ্যাত নৈয়ায়িক শঙ্করনাথ তর্কবাগীশ। ইনি কৃষ্ণচন্দ্রের সভাপণ্ডিত ছিলেন। নবদ্বীপের দেয়ারাপাড়ায় তিনিই প্রথম আলোকনাথ কালীর মূর্তি নির্মাণ করে পুজো করেন। ‘অ্যালানে কালী’ নামে পরিচিত এই প্রতিমাই নবদ্বীপের শাক্তরাসের প্রথম প্রতিমা। সময়টা ১৭৫২ থেকে ৫৬-র মধ্যবর্তী কোনও বছর। তার পরের বছরেই শিতিকণ্ঠ বাচস্পতি নির্মাণ করেন ‘শবশিবা’ মূর্তি। সেই শুরু। শোনা যায় কিছুদিনের মধ্যেই রাসে মৃন্ময় মূর্তি গড়ে পুজোর চল বাড়তে লাগল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র নিজে পোড়ামাতলায় আসতেন এবং শোভাযাত্রা করে তাঁর সামনে দিয়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হতো। রাজা প্রতিমার শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করে মৃৎশিল্পীদের পুরস্কৃত করতেন। রাসের পরদিন নবদ্বীপের আড়ং সম্ভবত সেই প্রথারই অনুসরণ।
নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হওয়া নবদ্বীপের রাস উৎসবের বয়স আড়াইশো পেরিয়ে তিনশোর দিকে পা বাড়িয়েছে। কালের স্বাভাবিক নিয়মে উৎসবের গা থেকে খসে পড়েছে প্রাচীনত্ব। মূর্তি থেকে মণ্ডপ, আলোকসজ্জা থেকে শোভাযাত্রা সবেতেই লেগেছে সময়ের ছোঁয়া। পূর্ণিমার রাতে নবদ্বীপের সেকালের খ্যাতনামা নৈয়ায়িক পণ্ডিতদের করা শক্তিমূর্তির পুজো ধীরে ধীরে তাঁদের পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে বারোয়ারি তলায়। দ্রুত বেড়েছে পুজোর সংখ্যা, প্রতিমার উচ্চতা। সুউচ্চ প্রতিমা এখন নবদ্বীপের রাসের প্রধান আকর্ষণ। শক্তিমূর্তি দিয়ে নবদ্বীপের রাসের সূচনা হলেও পরবর্তী কালে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, তন্ত্র, মঙ্গলকাব্যের বিষয় অবলম্বনে প্রতিমা তৈরি করে রাসে পুজো করা হয়। যদিও কৃষ্ণচন্দ্রের উৎসাহে রাসে মাটির প্রতিমা করে পুজো শুরুর সময় সেগুলির উচ্চতা ছিল তিন-চার ফুটের মতো। কিন্তু আকাশছোঁয়া প্রতিমা নির্মাণের সূচনা হয়েছিল ১৮২৮-এ। আর সে প্রতিমার সঙ্গে রাসের কোনও সম্পর্ক ছিল না। তৎকালীন নদিয়ারাজ গিরীশচন্দ্রের দেওয়ান হরগোবিন্দ প্রামাণিক চৈত্র মাসের বাসন্তী পুজোর সময় ৩৬ ফুট উঁচু ‘হটহাটিকা’ বা ‘বাসন্তীমূর্তি’ পুজো করেন। তার পরের বছর থেকে রাসে প্রতিমার উচ্চতা বাড়তে শুরু করে।
রাজানুগ্রহে পুষ্ট রাসের মেজাজ প্রথম থেকেই বাঁধা হয়ে গিয়েছিল একটু চড়া সুরে। সময় বদলালেও নবদ্বীপের রাসের সেই মধ্যযুগীয় মেজাজটা যেন থেকেই গিয়েছে, কিছু মূর্তিতে আজও তান্ত্রিক প্রভাব স্পষ্ট। যেমন, ব্যাদরাপাড়ার শবশিবা। দেবীর নীচে মৃত বা অচৈতন্য শিব, তার উপর জীবন্ত শিব। তেমনই রাধাবাজারের রণকালীর মূর্তি। অন্য দিকে কিছু শাক্ত মূর্তিতে রয়েছে বৈষ্ণব প্রভাব। যেমন, চারিচারাপাড়ার ভদ্রকালীর মূর্তিতে মহিষমর্দিনী-সহ লক্ষ্মী-সরস্বতীর নীচে হনুমান, দু’পাশে রাম ও লক্ষ্মণকে দেখা যায়। আবার, রামসীতাপাড়ার কৃষ্ণজননীর মূর্তিতে দেখা যায় দুর্গার কোলে শিশু কৃষ্ণকে। তবে পরবর্তী কালে বহু নতুন পুজো ও মূর্তির প্রচলন হয়েছে। যেমন, অকালবোধন, উমা-মহেশ্বর, ভারতমাতা ইত্যাদি।

এখানে একটা প্রশ্ন উঠেছে তবে নবদ্বীপের শাক্ত রাস কি বৈষ্ণবধর্মের উপর শাক্তধর্মের প্রভাব বিস্তারের জন্যই শুরু হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তরটা জানা গেল মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের উত্তরপুরুষ সৌমীশচন্দ্র রায়ের কাছে। তিনি বললেন, “মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র শাক্ত হলেও বৈষ্ণববিরোধী ছিলেন না। তার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ রাজবাড়ির বারো দোলের মেলা। এ ছাড়া সারা বছর ধরে রাজবাড়িতে হয় নানা বৈষ্ণব পার্বণ। আসল কথাটা হল, সেই সময় শাক্ত-বৈষ্ণব যে বিরোধ ছিল, কৃষ্ণচন্দ্র একই জায়গায় শ্যাম ও শ্যামার পুজোর মাধ্যমে বিরোধটা মেটাতে চেয়েছিলেন। তারই ফলস্বরূপ প্রচলিত হয় নবদ্বীপের রাস।”

অন্যদিনে শান্তিপুরের রাস, শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণ যখন গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলায় মত্ত, রাসের সেই আকর্ষণে স্বয়ং যোগমায়াও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। অবশ্য সেই রাসে অন্য পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। এতে মহাদেবের মনে বিস্ময় জেগেছিল যে কী সেই আকর্ষণ যার টানে তাঁর গৃহিণীও সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। সেই কৌতূহলেই মহাদেব নারীর বেশে রাস অঙ্গনে উপস্থিত হলেন। রাস অঙ্গনে নিমেষেই অন্য পুরুষের উপস্থিতি অনুভব করায় শ্রীকৃষ্ণ সেই স্থান ত্যাগ করেন। ফলে ঘটে গেল রাস ভঙ্গ! যোগমায়া অবশ্য ঘোমটা মাথায়, প্রসূতির ছদ্মবেশে মহাদেবকে চিনতে পেরে ভর্ৎসনা করে সেই স্থান ত্যাগ করতে বলতেই, মহাদেব বলেছিলেন, শ্রীকৃষ্ণের রাস তাঁর দেখা হল না ঠিকই তবে কলিযুগে তিনি বিশ্ববাসীকে এই রাস দর্শন করাবেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, শান্তিপুর বড়গোস্বামী বাড়ির আদিপুরুষ অদ্বৈতাচার্য ছিলেন মহাদেবের অংশ। শোনা যায়, তিনি তাঁর কৃষ্ণ বিগ্রহের রাসপূজা করতেন। অবশ্য সে সময় রাস উৎসবের আকার ধারণ করেনি। প্রায় ৩৫০ বছর আগে বড় গোস্বামীবাড়ির গৃহদেবতা রাধারমণ জিউ এক বার চুরি হয়ে যায়। পরে সেই মূর্তি যখন পাওয়া যায় তখন বাড়ির সকলে ঠিক করেন কৃষ্ণ বিগ্রহের পাশে রাধিকা বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এক রাস পূর্ণিমায় সাড়ম্বরে শ্রীমতী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর রাধারমণ ও রাধিকার বিগ্রহের মিলন উৎসবের মাধ্যমেই শান্তিপুরের রাস উৎসবের সূচনা হয়েছিল। বিবাহের উৎসবে যেমন বধূ পরিচিতির একটা প্রথা আছে, তেমনই এক শোভাযাত্রার মাধ্যমে নগরবাসীর সঙ্গে শ্রীরাধিকার পরিচয় পর্ব সারা হয়েছিল সে যুগে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য গোস্বামীবাড়ির বিগ্রহও এই শোভাযাত্রায় অংশ গ্রহণ করেছিল। এই শোভাযাত্রাই কালের গণ্ডি পেরিয়ে ভাঙা রাসের শোভাযাত্রা নামে পরিচিত হয়।

এই পরিবারের সত্যনারায়ণ গোস্বামী জানালেন, পুরনো ঐতিহ্য মেনে উৎসবের প্রথম দিন অদ্বৈতাচার্য পূজিত বিগ্রহ সীতানাথকে নিয়ে নগর পরিক্রমা হয়। বড় গোস্বামী বাড়ির সব ক’টি কৃষ্ণ বিগ্রহকেই রাস মঞ্চে স্থাপন করে বিশেষ পুজো করা হয়। এই উপলক্ষে ভক্তিগীতি, কীর্তন পরিবেশন করা হয়। ভোগে থাকে নানা ধরনের ফল, মিষ্টি, মেওয়া ফল, ক্ষীর, ননি, মাখন ইত্যাদি। দিনের বেলা বিগ্রহগুলি মন্দিরে থাকে এবং অন্নকূট উৎসবে নানা ধরনের পদ ভোগ দেওয়া হয়। তিন দিন ব্যাপী এই উৎসবে আজও প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়।

তৃতীয় দিনে ভাঙারাসের শোভাযাত্রাটি নানা দিক থেকে আকর্ষণীয়। থাকে ঢাকের নাচ। এতে অংশগ্রহণ করে প্রায় ১০৮টি ঢাক। শোভাযাত্রায় বিশালাকৃতি একটি খাঁচায় দু’জন পুরুষ মহিলার বেশে নৃত্য ও গান করেন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে। একে বলে ময়ূরপঙ্খীর গান। বিবিধ ঘটনাকে অবলম্বন করে থাকে সঙের মিছিল। রাধাকৃষ্ণের বেশে থাকে বালক-বালিকাদের নৃত্য। তবে মূল আকর্ষণ বিশাল হাওদায় সোনার গয়নায় সজ্জিত দেবতার বিগ্রহগুলি। বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার হলেও আজও ব্যবহার হয় বেলোয়ারি ফানুস। আগে বাহকদের কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হলেও বর্তমানে সেগুলি ট্রেলারে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বড় গোস্বামী বাড়ি থেকেই ভাঙা রাসের সূচনা হয়েছিল বলেই আজও এই পরিবারের শোভাযাত্রা বের হয় সবার আগে। তার পরে অন্যান্য গোস্বামী বাড়ির শোভাযাত্রা বের হয়। রাস্তার দু’ধারে দেখা যায় অসংখ্য অপেক্ষারত ভক্ত। পরের দিন হয় কুঞ্জভঙ্গ এবং ঠাকুরনাচ। এ দিন বিগ্রহগুলির ঘরে ফেরার অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান চলে দুপুর দু’টো থেকে সাড়ে চারটে পর্যন্ত। হয় নামসংকীর্তন। পরে বিগ্রহের সব গয়না খুলে স্নান করিয়ে অভিষেক করানো হয়। এ দিন শ্রীকৃষ্ণকে মহিলারা চামর দানের সুযোগ পান। এ ভাবেই সমাপ্তি ঘটে চার দিনের উৎসবের। দেবতাকে এ দিন সবচেয়ে বেশি পদের ভোগ দেওয়া হয়।

শন্তিপুরের অন্যতম প্রাচীন শ্যামচাঁদ মন্দিরের রাস উৎসবও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শ্যামচাঁদ ও রাধিকা ভাঙা রাসের শোভাযাত্রায় বের হন না। মন্দিরের সামনে বিশেষ মঞ্চে তাঁদের অধিষ্ঠান। মন্দিরে তিন দিন ব্যাপী এই উৎসবে অসংখ্য ভক্ত সমাগম হয়। মন্দির প্রাঙ্গণে এক মাস ব্যাপী মেলাও হয়। তেমনই শান্তিপুরের প্রাচীন বিগ্রহ বাড়িগুলির মধ্যে সাবেক বনেদিয়ানা ও আভিজাত্যে অটুট দীনদয়াল বাড়ির রাস উৎসব। এর সূচনা করেছিলেন রামচন্দ্র প্রামাণিক। রাসে পরানো হয় সোনার গয়না। রাস উপলক্ষে এ বাড়ির প্রতিমা শোভাযাত্রায় বের হয় না। বরং ঠাকুরদালান সেজে ওঠে বেলজিয়াম কাচের ঝাড়বাতি আর ফানুসে। বৈদ্যুতিক আলো নয়। আজও ব্যবহৃত হয় মোমবাতি। এই পরিবারের প্রসেনজিৎ প্রামাণিক বলছিলেন, “বায়না দিয়ে তৈরি বিশেষ এই মোমবাতি জ্বলে প্রায় ছ’ঘণ্টা। অন্যান্য জায়গায় নানা ধরনের বৈদ্যুতিক আলো ব্যবহৃত হলেও আমরা অতীতের আমেজ ধরে রাখতে বছরের কয়েকটা দিন মোমবাতি ব্যবহার করি। তা ছাড়া মোমবাতির স্নিগ্ধ আলোয় দর্শনার্থীরা কিছুক্ষণের জন্য অতীতের আমেজে ফিরে যান।”

শান্তিপুরের অন্যান্য বাড়িগুলির মধ্যে মধ্যম গোস্বামী বাড়ি, ছোট গোস্বামী বাড়ি, পাগলা গোস্বামী বাড়ি, মদনগোপাল গোস্বামী বাড়ি, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর বাড়ি, বাঁশবুনিয়া গোস্বামী, আতাবুনিয়া গোস্বামী বাড়ির রাস উৎসব আজও নিষ্ঠা এবং আভিজাত্যে অটুট। অন্যান্য পরিবারগুলির মধ্যে সাহা বাড়ি, খাঁ চৌধুরী বাড়ি, আশানন্দ বাড়ি, বংশীধারী ঠাকুর বাড়ি, মঠ বাড়ি, রায় বাড়ি, গোপীনাথ জিউ ঠাকুর বাড়ির রাসও সমান আকর্ষণীয়। তবে শুধু সাবেক বিগ্রহ-বাড়িই নয়, শান্তিপুরের বারোয়ারি রাসও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে। এদের মধ্যে শ্যামচাঁদ মোড়, লক্ষ্মীতলাপাড়া বারোয়ারি, বড় গোস্বামীপাড়া বারোয়ারি, শান্তিপুর কামারপাড়া, শান্তিপুর শ্যামবাজার, বউবাজার পাড়া উল্লেখ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *