১৮ কোটি টাকার প্রতারণা! ঘাটালে গ্রেফতার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সিনিয়ার ম্যানেজার

জে মাহাতো, মেদিনীপুর, ৯ জুলাই: ঘাটালে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখা থেকে থেকে প্রায় ১৮ কোটি টাকা প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ওই শাখার সিনিয়ার ম্যানেজার গৌতম দত্তকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। ঘাটাল মহকুমা পুলিশ আধিকারিক অগ্নিশ্বর চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতারণা চক্রের মূল পান্ডা রাজিব বক্সী’কে ১৮ মে হুগলি জেলার আরামবাগ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়l এর আগে ওই প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে শ্রীমন্ত দাস নামে ব্যাঙ্কের হাইয়ার ভ্যালু ট্রানজাকশন অফিসারকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে গ্রেপ্তার করা হয়। 

পুলিস জানিয়েছে, রাজীব বকশি এই প্রতারণার ক্ষেত্রে গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় ছদ্মনাম ব্যবহার করে নিজেকে সাইবার ক্রাইম সেলের হায়ার অফিসার হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্টেট ব্যাঙ্কের ঘাটাল শাখা থেকে বেশ কয়েক কোটি টাকা প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ এসেছে। ঘটনাটি জানা যায় এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে। গত আর্থিক বছরের হিসেব-নিকেশ শেষ হওয়ার পর স্টেট ব্যাঙ্কের ওই শাখার মাধ্যমে ওয়ান ৯৭  কমিউনিকেশন (One97 Communications Ltd) তথা পেটিএমের নিউ দিল্লির মেন ব্রাঞ্চের অ্যাকাউন্ট থেকে ৪২ লক্ষ দু’ হাজার ৭০৫টাকা সাত বারে কেটে অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

পেটিএম কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে স্টেট ব্যাঙ্কের দিল্লির ওই শাখা তদন্ত করে জানতে পারে, একটি জাল চক্র ঘাটাল শাখার সঙ্গে যোগসাজশ করে ওই কাজ করেছে। তখনই ওই ব্যাঙ্কের আঞ্চলিক ম্যানেজার(খড়্গপুর আরবিও-৩) জয়ন্ত মণি ঘাটাল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পরে তদন্তে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে ওই ব্যাঙ্কের মাধ্যমে প্রায় ১৮ কোটি টাকার প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ওই প্রতারণার সঙ্গে ব্যাঙ্কের চিফ ম্যানেজার গৌতম দত্তের নামও জড়িয়ে যায়। ফলে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, রাজীব বক্সি  নিজেকে সাইবার ক্রাইম সেলের শিলিগুড়ি শাখার এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক পরিচয় দিয়ে ওই কাজ করেছে। রাজীব নিজের নাম গোপন করে গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় নাম ব্যবহার করত। পুলিশ ও ব্যাঙ্ক সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজীব সাইবার ক্রাইম সেলের আদলে একটি মেলও তৈরি করেছিল। ব্যাঙ্কের ঘাটাল শাখায় সে তিনটি বিভিন্ন ফোন নম্বর থেকে ফোন করে কয়েকটি অ্যাকাউন্ট নির্দিষ্ট করে দিয়ে বলত, অ্যাকাউন্টগুলিতে হ্যাকাররা টাকা ঢুকিয়ে নিয়েছে। ওই টাকাগুলি অ্যকাউন্ট হোল্ডারদের অ্যাকাউন্টে ফিরিয়ে দিতে হবে। যেহেতু সাইবার ক্রাইম সেলের একজন ‘হাইয়ার অফিসার’ মেল ও ফোন করে ওই নির্দেশ দিত তাই ব্যাঙ্কের ম্যানেজার সেই নির্দেশ মতোই কাজ করতেন। তদন্তে জানা যায়, রাজীবকে অফিসিয়াল দিক দিয়ে সহযোগিতা করত  ব্যাঙ্কের অফিসার শ্রীমন্ত দাস। ব্যাঙ্কের ঘাটাল শাখা সূত্রে জানা গিয়েছে, ব্যাঙ্কের সিনিয়ার ম্যানেজারের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে শ্রীমন্ত অনেক সময় সিনিয়ার ম্যানেজারের কোড ব্যবহার করেও বহু লেনদেন করেছে। তাই ব্যাঙ্ক কর্মীদের অনুমান, শ্রীমন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গৌতমবাবুর সরলতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে ফাঁসিয়েছে।

পুলিস রাজীবকে ধরার জন্য দীর্ঘদিন আগেই ফাঁদ পেতে তার গোয়ালতোড়ের বাড়িতে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে কোনওভবেই তার সন্ধান পাওয়া যায়নিl মঙ্গলবার একটি বিশেষ সূত্র থেকে পুলিশ জানতে পারে রাজিব আরামবাগে একটি বাড়িতে আত্মগোপন করে রয়েছে। ঘাটাল মহকুমা পুলিশ আধিকারিক বিশাল পুলিস বাহিনী নিয়ে মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ট্রাক করে  রাত দু’টো নাগাদ রাজীবকে গ্রেপ্তার করে। আটক করা হয় তার গাড়িও।

পুলিস জানিয়েছে,  গোয়ালতোড়ে রাজীবের বিলাসবহুল বাড়িতে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা এবং চারটি বিদেশি কুকুর রয়েছে l বৃহস্পতিবার তাকে ঘাটাল মহকুমা আদালতে তোলা হলে ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। তার পরেই প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ওই শাখার সিনিয়ার ম্যানেজার গৌতম দত্তকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *