অঙ্কের জাদুকর কেসি নাগের জন্মদিনে শ্রদ্ধায় স্মরণ-স্মৃতিচারণ

অশোক সেনগুপ্ত

আমাদের ভারত, ১০ জুলাই: প্রায় ৯০ বছর আগের কথা। দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জে রসা রোডের কাছে কবিশেখর কালিদাস রায়ের বাড়িতে বসত সাহিত্যিকদের আড্ডা।রসচক্র সাহিত্য সংসদ। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, জলধর সেনের মতো দিকপাল সাহিত্যিকরা সেখানে নিয়মিত আসতেন। অঙ্কের প্রবাদপ্রতীম শিক্ষক কেশবচন্দ্র নাগও সেখানে অন্যতম সদস্য হয়ে ওঠেন।

শনিবার অঙ্কের প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক কেশবচন্দ্র নাগের জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করলেন গুণমুগ্ধ ও অনুগামীরা। এই প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কেশবচন্দ্র ও তাঁর অঙ্কের পরিচয় ঘটানোই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। ১৮৯৩ সালের ১০ জুলাই, রথযাত্রার দিন হুগলির গুড়াপের নাগপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন কেশব চন্দ্র নাগ। পিতা রঘুনাথ নাগ ও মাতা ক্ষীরোদাসুন্দরী। শৈশবেই পিতৃহারা হন। কেশববাবুর পাঁচ পুত্রের সকলেই মারা গিয়েছেন। তাঁর অন্যতম পৌত্র ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ত্রিদিবেশ নাগ এই প্রতিবেদককে বলেন, দুপুরের পর প্রায় দু’ঘন্টা হল ওয়েবিনারে এই স্মরণ। দাদুর জন্মদিন উপলক্ষে ওয়েবিনারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান ত্রিদিবেশবাবু।

১৯৪২ সাল নাগাদ ক্যালকাটা বুক হাউসের পরেশচন্দ্র ভাওয়ালের আগ্রহাতিশয্যে কেশবচন্দ্রের বাঁধানো অঙ্কের খাতা প্রকাশিত হয় অঙ্কের সহায়িকা ম্যাট্রিক ম্যাথমেটিক্স নামে। বইটি বিশাল জনপ্রিয় হয়। একে একে আরও অঙ্কের বই প্রকাশিত হয়। ধীরে ধীরে ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি, উর্দু ইত্যাদি ভাষায় অনুদিত হয় তাঁর বই। এর পর কেটে গিয়েছে পাক্কা আট দশক। আজও বঙ্গসন্তানদের মুখে মুখে তাঁর নাম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে তাঁর অঙ্ক কষে। তাঁর পৌত্র ত্রিদিবেশ নাগের মতে, খুব জটিল অঙ্কও জলের মতো সহজ করে বুঝিয়ে দিতে পারতেন কেশবচন্দ্র। তাঁর কথায়, ‘‘অঙ্ক বইয়ের যে কোনও অধ্যায়ের অনুশীলনীর সব ক’টি অঙ্কই দাদু শিখিয়ে দিতেন খুব প্রাঞ্জল ভাবে।’’

মিত্র ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক রাজা দে জানালেন, ‘‘শুনেছি, এক বার তৎকালীন রাজ্যপাল এসেছিলেন আমাদের স্কুলে। এসে স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষকদের সকলের সঙ্গে আলাপ করেন। শুধু বাকি থেকে যান কে সি নাগ। কারণ, তখন কেশবচন্দ্র স্যার অঙ্কের ক্লাস নিচ্ছিলেন। রাজ্যপাল এসেছেন শুনেও তিনি ক্লাস থামাননি। রাজ্যপালও অপেক্ষা করেন তাঁর ক্লাস শেষ হওয়ার জন্য। অঙ্কের প্রতি এতটাই ছিল স্যারের ভালবাসা ও নিষ্ঠা।’’

ওই স্কুলেই ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন কেশবচন্দ্র। তার আগে ৩০ বছর ওই স্কুলেই কাজ করেছেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। রাজাবাবু বললেন, কেশবচন্দ্রের জন্মদিনে তাঁর জীবনী বিষয়ক একটি সিডি-ও প্রকাশ করা হবে বলে জানালেন মিত্র ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক। ওয়েস্ট বেঙ্গল সেন্ট্রাল স্কুল সার্ভিস কমিশনের উপদেষ্টা পার্থ কর্মকারের মতে, “ভীতি দূর করে অঙ্ককে কী ভাবে প্রাঞ্জল করে শেখানো যায়, কেশবচন্দ্র জীবনভর সেটাই শিখিয়েছেন। বর্তমান প্রজন্মকে কেশবচন্দ্রের সেই শিক্ষার সঙ্গেই পরিচয় করাতে চেয়েছিলাম তাঁর ওই ওয়েবিনারের মাধ্যমে।“ পার্থবাবুও নিজের পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে সময় পেলে অঙ্ক শেখান স্কুলপড়ুয়াদের।

কেশববাবু মহাবিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন। ভাস্তাড়া যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে থার্ড মাস্টার হিসাবে কর্মজীবনের শুরু। কিছুদিনের মধ্যেই সংসারের দায়িত্ব সামলেও চাকরি ছেড়ে অঙ্ক ও সংস্কৃত নিয়ে বিএ পাশ করেন। এরপর অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে কিষেণগঞ্জ হাইস্কুল যোগ দিলেন। পরবর্তীতে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলে যোগ দেন। অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে তাঁর সুখ্যাতি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কানে আসলে তিনিই কেশবচন্দ্রকে ভবানীপুরে মিত্র ইনস্টিটিউশনে 
অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে নিয়ে আসেন। প্রথম দিকে রসা রোডে মেসে ভাড়া থাকতেন। পরে ১৯৬৪ সাল থেকে থাকতে শুরু করেন দক্ষিণ কলকাতার গোবিন্দ ঘোষাল লেনে নিজস্ব বাড়িতে। 

মিত্র ইনস্টিটিউশনে কেশবচন্দ্রের সহকর্মী সম্ভবত কবিশেখর কালিদাস রায়ের প্রধান অনুপ্রেরণায় তিরিশের দশকের মাঝামাঝি প্রকাশক ইউ এন ধর অ্যান্ড সন্সের মাধ্যমে ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হল নব পাটীগণিত।কিছুদিনের মধ্যেই পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে পড়ে বইটি। পাঠ্যপুস্তক হিসাবেও স্বীকৃত হয়। এর পরে কেটে গিয়েছে সাত দশক।

বেঁচে থাকলে তিনি হয়তো আজও এমন অঙ্ক কষতে দিতেন, যার সমাধান করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হত গণিত বিশারদদেরও। ত্রিদিবেশবাবু জানালেন, ভয় পেয়ে নয়, অঙ্ককে ভালবেসে কী ভাবে তার সমাধান করা যায়, সেটাই ছোটবেলায় শিখিয়েছিলেন কেশবচন্দ্র। তিনি বলেন, ‘‘দাদুর কাছে অঙ্ক শিখেছি বলে চাপও ছিল। স্কুলে কেউ অঙ্ক না পারলে শিক্ষকরা বলতেন, তুই সমাধান করে দে। তুই তো কে সি নাগের নাতি। এমন একটা ভাব যেন, দাদুর কাছে অঙ্ক করেছি বলে সব অঙ্কই আমি পারব।’’

ত্রিদিবেশবাবু জানালেন, কেশবচন্দ্রের বইগুলির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া অঙ্ক শিখেছে। তাঁর কথায়, ‘‘দাদু যদি এ সময়ে থাকতেন এবং অনলাইনে অঙ্ক শেখাতেন, তা হলে হয়তো সারা বিশ্বের পড়ুয়ারা তাঁর কাছে শিখতে আসত।’’ যাঁরা ওই ওয়েবিনারে অংশ নিতে পারলেন না, তাঁরা পরে ইউটিউবে তা দেখতে পারবেন। কেশবচন্দ্রকে নিয়ে আয়োজিত ওই ওয়েবিনারে আমন্ত্রিতদের মধ্যে ছিলেন কমিশনার অব স্কুল এডুকেশন অনিন্দ্যনারায়ণ বিশ্বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *