অমরজিৎ দে, ঝাড়গ্রাম,১৬ জুলাই: কলকাতার রামমোহন সম্নিলনী পূজা কমিটি তাদের এবারের থিম “জঙ্গল কন্যা”র শনিবার অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উৎসে এসে উৎসর্গিত করা হল জঙ্গলমহলের মানুষজনেদের। রামমোহন সম্নিলনী ক্লাব তাদের ৭৮ তম দুর্গা পুজার থিম এদিন ঝাড়গ্রাম শহরের রবীন্দ্র পার্কে আদিবাসী গুনিজন, কবি, সাহিত্যিকদের সাথে নিয়ে উদ্বোধন করেন। জঙ্গল কন্যা পূজার ব্রান্ড অ্যাম্বেসেটার মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদার হাত ধরে পুজার ভাবনা তথা থিমের উদ্বোধন করা হয়।

এদিনের অনুষ্ঠানের অভিনবত্ব হল সুদূর কলকাতার পুজা হলেও যাদের ঘিরে এই থিম তাদের জায়গা তথা জঙ্গলমহলের প্রাণ কেন্দ্র ঝাড়গ্রামের বুকে তাদের নিয়েই হল উদ্বোধন। ধামসা, মাদলের তালে আদিবাসী নৃত্যের ছন্দে, গানে মুখরিত হল অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রাম। অনুষ্ঠান সঞ্চলনা থেকে সাংস্কৃতিক এই পরিমন্ডল জুড়ে আদিবাসী শিল্পী, গুনি জনেরা। এ যেন উৎসের সন্ধান। এক খন্ড জঙ্গল মহল এবং তার দিন রাত্রির উপাখ্যান তার সাথে রয়েছে দ্রিম দ্রিম মাদলের সুর। তিলোত্তমার বুকে আজ সেই মাদলের সুর। সেই সুর শরাদীয়া দুর্গা পুজায় মাতাবে নাগরিক জীবন।
রামমোহন সম্মিলনীর পূজামণ্ডপে এবার থাকছে জঙ্গল কন্যার জগৎ। জঙ্গলমহলের ঐতিহ্য থেকে সংস্কৃতি জীবন সংগ্রাম থেকে চারুকলা। সেতু বন্ধন দৃঢ় হল জঙ্গলমহল আর কলকাতার। এবার কলকাতার এই পুজা মন্ডপে উঠে আসছে জঙ্গলমহলের মানুষদের আখ্যান। দিন রাত্রির জীবন চর্চায় আদিবাসী নারী, তাদের চারু কলা, তাদের সংগ্রাম আর সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতি। কি না থাকবে এখানে! মাটির নিকানো উঠান, পাহাড়, জঙ্গল সবই।
প্রাক্তন সাংসদ, বিশিষ্ট সাংবাদিক, রামমোহন সম্মিলনীর চেয়ারম্যান কুণাল ঘোষ বলেন, “জঙ্গলমহলের ঐতিহ্য থেকে সংস্কৃতি জীবন সংগ্রাম থেকে চারুকলা সেতু বন্ধন দৃঢ় হোক জঙ্গলমহল আর কলকাতার। যেখানে পুজো হবে আর আজ যেখানে থিমের উদ্বোধন হল তার দূরত্ব ১৮১ কিমি। রামমোহন সম্মিলনীর এতো সদস্য যেখানে আছে তারা এখানে কেন এলেন। এতো দিন থিম বলতে কলকাতায় দেখা যেত বিভিন্ন এলাকা, রীতি অনুযায়ী সাজানো। এই প্রথম ঠিক করেছে যদি জঙ্গল কন্যা থিম হয় জঙ্গলের নারীরা তাদের অধিকারের লড়াই, তাদের শিল্প, হাতের কাজ, সংস্কৃতি, নানা কর্মযজ্ঞ, জীবনধারা। ইট কাঠের শহরের বুকে জঙ্গল কন্যাদের দেশে গিয়ে মায়ের আরাধনার থিম উদ্বোধন করতে আসা। থিম উদ্বোধন উৎস স্থলে হচ্ছে। এধরনের থিম উদ্বোধন কলকাতায় বা অন্য কোথাও কোন পুজোয় হয়নি। যাদের হাত ধরে সমাজের মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে তারা যদি সেদিন যেতে পারেন তাদের আমন্ত্রণ জানানো রইলো। মধ্যবিত্ত বাঙালিদের পাড়া সেখানে পুজোর মূল থিম জঙ্গল কন্যা। থিমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হল। পুজোর উদ্বোধন চতুর্থীর দিন করবেন মন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদা। যারা যেতে চান ঝাড়গ্রামের বিশিষ্ট নাগরিকরা চাইলে যেতে পারেন।”

মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা বলেন, “ধন্যবাদ জানাবো থিম উদ্বোধন জঙ্গলমহলে এসে করার জন্য। বরাবর কলকাতায় থিম উদ্বোধন হয়। শালগাছে মোড়া জঙ্গলমহলে এসে সেই থিম উদ্বোধন হচ্ছে। জঙ্গল কন্যা যেখানে মহিলাদের নিয়ে এবারে থিম হচ্ছে সেখানে মানুষের কাছে এসেছে পুজো উদ্যোক্তারা। বরাবরই আমরা উপেক্ষিত থাকি। আমাদের জানার চেষ্টা হয় না। কুণাল ঘোষ সেখানে জানার চেষ্টা করছেন, জেনে তার উপর থিম করছেন, এরজন্য খুব ভালো লাগছে। আশা করছি ওনাদের পুজো খুব ধুমধাম হবে।”
রামমোহন সম্মিলনীর অন্যতম সদস্য অনির্বান সেনগুপ্ত বলেন, “আমরা আনন্দিত। আমাদের থিম ভবনা যাদের ঘিরে সেই সব মানুষের আমরা পাশে পেয়েছি। তাদের জায়গা তথা ভবনার উৎস স্থলে পৌছে আমরা আপ্লুত।জঙ্গলমহলের মাটি আমরা নিয়ে গেলাম। সেই মাটি দিয়ে গড়া হবে থিমের কাজ।”
মূল অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে থিমের কারিগর তাপসী সাহা চক্রবর্তী ও সন্দীপ সাহার হাতে জঙ্গলমহলের মাটি তুলে দেন মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা। এছাড়াও মন্ত্রী ক্লাব কর্তৃপক্ষের হাতে দুটি চারা গাছ তুলে দেন। এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিনপুরের বিধায়ক দেবনাথ হাঁসদা, ঝাড়গ্রাম পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রেখা সোরেন, বুদ্ধিজীবি পূর্ণ চন্দ্র সোরেন, পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী লোক সংস্কৃতি সংসদের সদস্য শিশ শঙ্কর সোরেন, অধ্যপক শ্যাম চরন হেমরম, অধ্যপক লক্ষীন্দর পালুই, ঝুমুর শিল্পী ইন্দ্রানী মাহাতো, প্রাক্তন বন কর্তা, লেখক সমীর মজুমদার, কুড়মি সংস্কৃতি ও উন্নয়ন পর্ষদের সহ সভাপতি রথীন্দ্রনাথ মাহাতো, লোধা সেলের সদস্য খগেন্দ্রনাথ মান্ডি সহ, ঝাড়গ্রাম জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের চেয়ারম্যান জয়দীপ হোতা সহ প্রমুখ।

