ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
আমাদের ভারত, ১৫ অক্টোবর: রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বালকাশ্রম উচ্চ বিদ্যালয় (উচ্চ মাধ্যমিক)-এর প্রাক্তন সহকারী শিক্ষক শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ (RNG স্যার) গত ১০ ই অক্টোবর কোভিড-পরবর্তী স্বাস্থ্য-জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮২ বৎসর।
১৯৪০ সালের ৩০ শে জানুয়ারি তাঁর জন্ম তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর, গোপালগঞ্জের কমলপুর গ্রামে। পিতা গোপাল চন্দ্র ঘোষ ছিলেন জেলা আদালতের করণিক, মাতা কনকপ্রভা দেবী ধর্মমতি সুগৃহিণী। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে ১৯৫৩ সাল নাগাদ কলকাতার জোড়াবাগানে পিসির বাড়ি চলে আসেন এবং সেখানে থেকেই পড়াশোনা চালান। তাছাড়া সেসময়ের সামাজিক পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানে থাকাটাও নিরাপদ ছিল না। ১৯৬৪ সালে রবীনবাবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম পাশ করেন। পরের বছর রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বালকাশ্রম উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন। তিনি রহড়া বালকাশ্রমের প্রথম সম্পাদক স্বামী পুণ্যানন্দ মহারাজের বিশেষ স্নেহ-সান্নিধ্য লাভ করেছেন।

বিদ্যালয়ে তিনি ভূগোল পড়াতেন। শিক্ষক হিসাবে কঠোরতা দেখালেও প্রতিষ্ঠানের বাইরে ছিলেন নিপাট সদালাপী, সাধারণ জীবন-যাপিত, আদর্শবান, কঠিন সংযমী এক ব্যক্তিত্ব। সৌকর্যে, সুভদ্রতায় আর সজ্জনতায় ছিলেন আপন হস্তাক্ষরের মতই ঝকঝকে ঝর্ণার জল। স্কুলে তাঁকে নানান বিষয়ে পাঠদান করতে দেখা গেছে। এবং ব্যক্তি জীবনেও ছিলেন বহুধর্মী, বহু বিষয়ে উৎসাহী জ্ঞানপিপাসু এক মানুষ। ১৯৬৯ সালে বেলঘরিয়া রথতলা মঙ্গলেশ্বর বিদ্যালয়ে ইতিহাসের শিক্ষিকা ফুলু দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ২০০১ সালে রবীনবাবু বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০০ সাল পর্যন্ত সপরিবারে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের সাঁতরাদিঘি কোয়ার্টারে থাকতেন; এরপর তিনি বেলঘড়িয়া স্টেশন সংলগ্ন একটি ফ্ল্যাট কিনে চলে আসেন।
২০০৪ সালে তিনি সহধর্মিণীকে হারান। এই ফ্ল্যাটেই ৮৫ বছর বয়সে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। মাতা ও পত্নী-বিয়োগের পর স্বাধীনচেতা এই মানুষটি বেলঘড়িয়ার ফ্ল্যাটে একা থাকতেই পছন্দ করতেন, সাধারণভাবে কারও সেবা গ্রহণ করতেন না। অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি নিজের হাতেই সব কাজকর্ম করতেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে কলকাতার আর.জি. কর হাসপাতালে ভর্তি হন। ICU-তে ১৬ দিন চিকিৎসা নেবার পর তাঁর মৃত্যু হয়। কোভিড থেকে মুক্তি পেলেও রক্ত-শর্করা জনিত সমস্যায় তাঁর স্নায়ুতন্ত্র ও যকৃৎ বিকল হয়ে যায়।
তাঁর দুই কন্যা- রূপশ্রী এবং সঙ্ঘমিত্রা, দুজনেই শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত। রূপশ্রী ঘোষ বসু কাঁচড়াপাড়া জোনপুর হাইস্কুলে ভূগোলের শিক্ষিকা। সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ দে ব্যারাকপুর দেবানন্দ মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষিকা। দুই জামাতা- চিরঞ্জীব বসু, এলআইসি-র সোদপুর শাখায় কর্মরত; অনিন্দ্য কান্তি দে, কল্যাণী স্প্রিংডেল স্কুলের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। নাতি-নাতনিরাও মেধায় এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পারদর্শী। দৌহিত্রী চান্দ্রেয়ী বসু বিশ্বভারতী থেকে কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক এবং বর্তমানে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পাঠরতা।

