ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
[পজিটিভ ভাইব্রেশনের সন্ধানে আজ উপস্থিত হয়েছি চৈতন্য স্মৃতিধন্য পুণ্যক্ষেত্র, পানিহাটির ‘রাঘব ভবন’-এ। আপনাদের সকলের জন্য এক ঝলকে পরিবেশিত হল তারই আনন্দরূপ।]
আমাদের ভারত, ১২ সেপ্টেম্বর: মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব কুমারহট্ট থেকে পানিহাটিতে রাঘব পণ্ডিতের গৃহে এলেন। এখানেই তাঁর টোল, গঙ্গার অনতিদূরে তাঁর সাধন-ক্ষেত্র। সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত শ্রীরাঘব। তাঁর আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে শ্রীচৈতন্যদেব এলেন, সঙ্গে ভক্ত পরিকর। ‘হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ’ ধ্বনি তুলে প্রবেশ করলেন তিনি। গৃহে বিগ্রহ সেবা করছিলেন শ্রীরাঘব। শ্রীশ্রী রাধামদনমোহন জীউ, যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাঘবের পিতামহ মহাপণ্ডিত গঙ্গাপ্রসাদ চতুর্বেদী। যার সেবা করছেন, তিনিই তো এসেছেন তাঁর দ্বারে। বিগ্রহের সেবা ছেড়ে জীবন্ত দেবতার চরণে লুটিয়ে পড়লেন৷ চৈতন্য ভাগবতে বর্ণনা আছে —
“কতদিন থাকি প্রভু শ্রীবাসের ঘরে।
তবে গেলা পানিহাটি রাঘব মন্দিরে।।
কৃষ্ণ-কার্যে আছেন শ্রীরাঘব পণ্ডিত।
সম্মুখে শ্রীগৌরচন্দ্র হইলা বিদিত।।
প্রাণনাথ দেখিয়া শ্রীরাঘব পণ্ডিত।
দণ্ডবৎ হইয়া পড়িলা পৃথিবীত।।” (৫/৭৫-৭৭)
পণ্ডিতকে মহাপ্রভু ভূমি থেকে তুললেন, অপরিমিত প্রেমে আলিঙ্গন করলেন। ভক্ত ও ভগবান — দুইজনেই তখন কাঁদছেন, জীবাত্মাকে পরমাত্মা নিজেই টেনে নিয়েছেন প্রেমার্দ্র নয়নে। ভক্ত পরিকর জয়ধ্বনি দিয়ে উঠলেন। শ্রীরাঘব পণ্ডিতের গৃহ ধন্য হল, ধন্য হল পানিহাটি, ধন্য হলেন নগরবাসী। পণ্ডিতের গৃহাগমনে পথের শ্রম দূর হল মহাপ্রভুর। তিনি বললেন, গঙ্গা মজ্জনে যে ফল, রাঘবের ঘরে এসে তিনি তা পেয়েছেন।

কিছুদিন বাদে রাঘবের টোলে এসেছেন নিত্যানন্দ প্রভুও। ভক্তজনকে সঙ্গে নিয়ে কীর্তন করছেন, চারিদিক আনন্দময় হয়ে উঠেছে। একের পর এক ভক্তের সমাগমে রাঘব-ভবন যেন চাঁদের হাট। শ্রীরাঘব প্রভুর অভিষেক কার্যের আয়োজন করেছেন। চন্দনে, পুষ্পে, মাল্যে, দীপে, নৈবেদ্যে সাজো সাজো রব। কলসে কলসে গঙ্গাবারি। প্রভুর শিরে জলের ধারা, চারিদিকে কৃষ্ণ-কোলাহল। নব-বস্ত্রে নিত্যানন্দের দিব্য-শরীর। শ্রীঅঙ্গে চন্দন-কুমকুম। প্রেমময় প্রভুর চক্ষে দিব্য-দৃষ্টিতে ভক্তকূল মোহিত হয়ে রয়েছেন। সহসা আনন্দে আত্মহারা হয়ে কদম ফুলের মালা পড়তে চাইলেন নিত্যানন্দ। তাঁর প্রিয় পুষ্প যে কদম্ব। কিন্তু তখন তো বর্ষাকাল নয়! কদমের সময় নয়! ভক্তেরা কোথায় পাবেন কদম ফুল? নিত্যানন্দ বলছেন, বাগানে গিয়ে দেখো। বাগিচায় এলেন শ্রীরাঘব এবং অবাক হয়ে দেখলেন অপরূপ কদম ফুল ফুটে আছে জম্বীরের গাছে। পণ্ডিত পরমানন্দে তুলে নিলেন সেই ফুল। হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে পরিয়ে দিলেন নিত্যানন্দের গলায়। ভক্তবৃন্দ সুঘ্রাণ পেলেন সেই দমনক পুষ্পের। তারা বিস্ময়ে হতবাক। চৈতন্য ভাগবতে রয়েছে,
“জম্বীরের বৃক্ষে সব কদম্বের ফুল।
ফুটিয়া আছয়ে অতি-পরম-অতুল।” (৫/২৮২)

রহস্যের কথা এবার শোনালেন নিত্যানন্দ। আজকের এই আনন্দ-মণ্ডলে উপস্থিত হয়েছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। নীলাচল থেকেই তিনি দিব্যদেহে উপস্থিত হয়ে এসেছেন আজিকে। যে বৃক্ষকে অবলম্বন করে তিনি প্রকট হয়েছেন, এ তারই শ্রীঅঙ্গের দিব্য সুবাস। প্রভু তোমাদের নৃত্য-কীর্তন অবলোকন করতে এখানে এই মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছেন।
“চৈতন্য গোসাঞি আজি শুনিতে কীর্তন।
নীলাচল হৈতে করিলেন আগমন।।
সর্বাঙ্গে পরিয়া দিব্য দমনক মালা।
এক বৃক্ষে অবলম্বন করিয়া রহিলা।।
সেই শ্রীঅঙ্গের দিব্য দমনক গন্ধে।
চতুর্দিকে পূর্ণ হই আছয়ে আনন্দে।।
তোমা সবাকার নৃত্য-কীর্তন দেখিতে।
আপনে আইলা প্রভু নীলাচল হৈতে।।” (৫/২৯৪-২৯৭)

