রাধাকৃষ্ণময় বসন্ত আর বাসন্তী ফুল

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

আমাদের ভারত, ২৮ মার্চ: আসছে দোল। বসন্ত উৎসব। উৎসব মানেই মধুমালতির হাওয়া, কুঞ্জবনে ফুলের ভারে নম্রনত মাধবী শাখা। বসন্তের কুঞ্জে কুঞ্জে রক্তরাঙা পলাশ কোলাহল করে ওঠে। পথের ধারে কৃষ্ণচূড়া ডাক দিয়ে যায়। বসন্ত বাতাসে বিচলিত হয়ে বাসন্তী ফুল লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তারপর মৃদু বাতাস এসে যূথিকে উচ্ছ্বসিত করে যায়। আম্রবীথিতে চলে উৎসব, শিরীষবনে কিশলয় ছেয়ে যায়, পাওয়া যায় জুঁহিবেলির গন্ধ। তারই অমোচ্য বন্ধনে মিশে যায় শ্রীরাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা। আসে দোলপূর্ণিমা।

বৃন্দাবনের ঋতু-উৎসব কেমন? কিভাবে আসে বসন্ত, বর্ষা, শরৎ, শীত? বৈষ্ণব কবিরা আপন অনুভবে ব্যক্ত করেছেন ঋতু উৎসব। সেই উৎসবে তরুলতা ভরে যায় পুষ্প মঞ্জরীতে। ফুলে-ফুলে, ডালে ডালে, পাতায় পাতায় ছড়িয়ে পড়ে ছন্দ। এই উৎসব মুখরতার বসন্ত বর্ণনা নিয়েই প্রস্তুত নিবন্ধ। বিদ্যাপতি লিখেছেন, ‘আওল ঋতুপতি-রাজা বসন্ত।/ ধাওল অলিকুল মাধবী-পন্থ।।’ মাধবী লতার ফুলেল পথে ধেয়ে গেছে মৌমাছির দল। বসন্তের সমাগমে জাফরান ফুলের গর্ভকেশর হেমদন্ডের মত স্বর্ণাভ হয়ে প্রকাশ পেয়েছে-‘দিনকর-কিরণ ভেল পয়গণ্ড। / কেশর – কুসুম ধয়ল হেমদন্ড॥’ কাঞ্চন বৃক্ষের মাথা ফুলে ফুলে ভরে গেছে, যেন কুসুম-ছত্র — ‘নৃপ-আসন নব পাটল-পাত।/ কাঞ্চন – কুসুম ছত্র ধরু মাথ॥’ আমের মুকুলের গন্ধে ছেয়ে গেছে চারদিক, আর কোকিল গাইছে পঞ্চম স্বরে-‘মৌলি রসাল-মুকুল ভেল তায়। / সমুখহি কোকিল পঞ্চম গায়॥’ জুঁই-বেল, ফুলের পুষ্পবিন্যাস যেন শ্বেত পতাকার অবয়ব নিয়েছে, অশোকের পাপড়ি যেন ধনুকের বাণ আর পাটল ফুল যেন তূণ-‘কুন্দ-বেলী-তরু ধরল নিশান।/ পাটল তূণ, অশোক-দল বাণ’। শীত চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটেছে পলাশ, আইপোমিয়া তরুলতা – ‘কিংশুক লবঙ্গলতা একসঙ্গ।/ হেরি শিশির ঋতু আগে দেল ভঙ্গ॥’ শীত যাবার ফলে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সরোবরের পদ্ম –‘উধারল সরসিজ পাওল প্রাণ।/ নিজ নবদলে করু আসন দান’।।

জ্ঞানদাস শ্রীকৃষ্ণের প্রেমরস প্রকাশ করে জানাচ্ছেন শ্যামের স্নেহ যেন রস সাগরের মধ্যে বিকশিত এক পদ্ম –‘সরোবর-সরসিজ শ্যামের নেহা।’ রঙের উৎসবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৃন্দাবনের যত বৃক্ষলতা লাল বর্ণ ধারণ করেছে — ‘ফাগু খেলাইতে ফাগু উঠিল গগনে। / বৃন্দাবন তরুলতা রাতুল বরণে।।’ বসন্তে লাল ফুল ফোটে পলাশ, শিমূল, আর মান্দার বৃক্ষে। এমনই লাল সেই বর্ণ, যেন ডালে ডালে আগুন জ্বলে (Flame of forest)। পুষ্পপুঞ্জে ঢেকেছে চারদিক, ব্রজবাসীরা তাতে ঢেকেছে আপন তনু। যদুনন্দন দাস লিখেছেন, ‘ফুলবনে দোলয়ে ফুলময় তনু। / ফুলময় আভরণ, করে ফুল ধনু।।/ ফুলময় ক্ষিতিতল, ফুলবন কুঞ্জ।/ ফুলময় সখী বরিখয়ে ফুলপুঞ্জ।।’ ফুল ফুটলে আপনিই আসে ভ্রমর, আর ধেয়ে আসে মৌমাছি।

বৈষ্ণব গীতাঞ্জলির উপাদান-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বারে বারে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে এসেছে নানান ফুল, লতা, গুল্ম, বৃক্ষের কথা। প্রবন্ধে কয়েকটি কৃষ্ণ-তরু ও গুল্ম লতার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হল। ‘কৃষ্ণচূড়া’ নামে বাংলায় যে গাছটি পরিচয় তার ল্যাটিন নাম _Caesalpinia_ _pulcherrima_ । এটি একটি গুল্ম এবং ফ্যাবেসী পরিবার ভুক্ত। এর পাতা ফার্ণের মত এবং ফুলের গোছা সত্যিই কৃষ্ণের চূড়ার মত সজ্জিত। অনেকে অবশ্য গুলমোহরকে কৃষ্ণচূড়া নামে চেনেন। গুলমোহর কিন্তু গুল্ম নয়, বৃহৎ বৃক্ষ, ল্যাটিন নাম _Delonix_ _regia_ । কিন্তু গাছটি কৃষ্ণচূড়ার মতই ফ্যাবেসী পরিবারের অন্তর্গত। গ্রীষ্মকালে গুলমোহরে লাল ফুলে ভরে যায়, তাই এর নাম ‘Flame tree’। একইভাবে ফ্যাবেসী পরিবারের অন্তর্গত একটি বৃহৎবৃক্ষ _Peltophorum_ _pterocarpum_ – কে অনেকে ‘রাধাচূড়া’ বলে থাকেন । ইংরাজিতে এর নাম ‘Yellow Flame tree’। এর ফুল ফোটে গ্রীষ্মে , ফুলের রং হলুদ। রাধাচূড়া কিন্তু কৃষ্ণচূড়ার মতই গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। ফুলের থোকা দেখলে মনে হবে সত্যিই যেন রাধার মাথার চূড়া। ল্যাটিন নাম _Caesalpinia_ _gilliesii_ , ইংরাজিতে কেউ বলেন ‘Bird of Paradise’। অবশ্য এই নামে অনেক ফুল আছে। কৃষ্ণ বট (Krishna Fig, Krishna Butter Cup)নামে একটি বিশেষ ধরণের বটগাছ কৃষ্ণ মিথের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মোরেসী পরিবারের এই গাছটির ল্যাটিন নাম হচ্ছে _Ficus_ _benghalensis _var__ _krishnae_ বা _Ficus_ _krishnae_ । এর পাতার গোড়ায় পকেটের মত খাঁজ চোখে পড়ে। কৃষ্ণ ও অন্যান্য গোপ বালকেরা নাকি এই পাতার পাত্রে (Makhan Katori)করে ক্ষীর ননী চুরি করে এনে খেতেন। বৃন্দাবনবাসিদের বিশ্বাস, সাধারণ বটপাতা মুড়িয়েই ক্ষীর ননী খাওয়া হত। তারপর মোড়ানো পাতা ছুড়ে ফেলতে, তা থেকে জন্ম নিল নতুন বটগাছ। সেই বটগাছের পাতা মোড়ানো আর ক্ষীর-ননী খাওয়াও সহজ। কৃষ্ণ পুরাণ জড়িত থাকায় ল্যাটিন নামে ‘Krishnae’কথাটা সংযুক্ত হয়েছে। কৃষ্ণ নামের সঙ্গে বৃন্দাবনের তমাল গাছ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। কেউ কেউ বলেন তমাল গাছ আসলে তেজপাতা (Indian bay leaf )। কারণ এই উদ্ভিদটির ল্যাটিন নাম _Cinnamomum_ _tamala_ যা লরেসী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আবার কেউ বলেন তমাল হচ্ছে ভেষজ বৃক্ষ _Garcinia_ _xanthochymus_ বা _Garcinia_ _mangostana_ যার ইংরাজি নাম ‘Mangosteen’। এটি একটি চিরহরিৎ, মাঝারি থেকে বৃহৎ বৃক্ষ, ফুলের রং সাদা এবং ফল পাকলে হলদে। বসন্তে ফুল আসে এবং ফল পাকে গ্রীষ্মে। ভারতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থায় এই ফলটি এবং তার বীজ নানাভাবে ব্যবহৃত হয়। মাধবীলতা ( _Hiptage_ _benghalensis_ ) কৃষ্ণকাহিনীতে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। ম্যালপিজিয়েসী পরিবারভুক্ত এই বৃহৎ লতাটি বহুবর্ষজীবী। বহু বৈষ্ণব প্রসিদ্ধ তীর্থ ক্ষেত্র এই লতাটি কে ব্যবহার করে তৈরি করা হয় মালঞ্চের কুঞ্জ। বহু বহু বছরের পুরনো কাষ্ঠল লতাটিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় বিশেষ অবলম্বন (Support) ব্যবহার করে। এর পাতা ভল্লাকার বা ডিম্ব-ভল্লাকার, প্রায় ২০ সেমি লম্বা। বছরের মাঝে মাঝেই ফুল ফোটে, মিষ্টি তার গন্ধ। একটি থোকায় প্রায় ১০ থেকে ৩০টি ফুল ফোটে। ফুলের রং গোলাপী-সাদা, সঙ্গে হলুদের আভা। কিংশুক বা পলাশের প্রসঙ্গ এসেছে বারে বারে। ইংরাজিতে এর নাম ‘Parrot Tree’, ল্যাটিন নাম _Butea_ _monosperma_ ।এটি প্যাপিলওনেসী পরিবারভুক্ত। এছাড়া অশোক( _Saraca_ _indica_ ), আম ( _Mangifera_ _indica_ ), শিরীষ ( _Albizia_ _lebek_ ), চম্পক বা চাঁপা ( _Michelia_ _champaca_ ), ইত্যাদি ফুলের নাম পাওয়া যাচ্ছে। বৈষ্ণব-মহাজন-গীতিকা সাহিত্যের এক মূল্যবান সম্পদ। এই গীতাঞ্জলীর মধ্যে মুক্তি পেয়েছে – প্রেমার্দ্র হৃদয়ের ভাব-অনুভব, আত্মপ্রকাশ করেছে শ্যামল শোভা। বংশীবট, অশোকবন, পলাশকুঞ্জ, মাধবীমঞ্জরি, মধুমালতী, শিরীষ কুসুম, আম্র বীথিকা, জুঁহিবেলি, সরসিজ-সরোবর, কাঞ্চন কুসুম, লবঙ্গলতা, কুন্দলতা প্রভৃতির সৌকর্যে-সৌগন্ধে যেন মাতোয়ারা বৈষ্ণব গীতাঞ্জলীর পুষ্পোদ্যান।

শ্রীরাধিকার প্রেমে পুষ্প সাহচর্যে, পুষ্প-বনে, কুসুম-সুগন্ধে বিকশিত হয়ে প্রাণ আনন্দরূপের সঙ্গে মিলেছে। বৃন্দাবনের কুঞ্জ-লতার শাখায় শাখায়, ফুলে-ফলে-পল্লবে অনুভূত হয় তাই ঋতু-উৎসব এবং কৃষ্ণ-রাধার আত্ম নিবেদন।

‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘জন্মান্তর’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘যদি ননি ছানার গাঁয়ে /কোথাও অশোক-নীপের ছায়ে/আমি কোনো জন্মে পারি হতে/ব্রজের গোপবালক…।’ সেখানে নীল যমুনার কূলে বৃন্দাবনের গোঠে গোঠে গো-ক্ষুর রেণু উড়িয়ে নিত্য ধেনু চরায় ব্রজের রাখাল। তাঁদের গলায় গুঞ্জা ফুলের মালা। বংশীবটের তলে বসে তারা শ্যামের বাঁশি শোনে। তখনই কুঞ্জবনে ময়ূর নাচে পুচ্ছ তুলে – সে এক অপরূপ স্বর্গীয় দৃশ্য। এমন সুযোগ যদি পরজন্মে পাই তবে নিজের ঘরে সভ্যতার আলো নিবিয়ে দেব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *