“রাইগঞ্জ আদি সর্বজনীন দুর্গা মন্দির” এর পুজো সর্বজনীন পুজোর নিরিখে প্রাচীনতম

স্বরূপ দত্ত, আমাদের ভারত, উত্তর দিনাজপুর, ২০ সেপ্টেম্বর: রায়গঞ্জ শহরের সুপ্রাচীন পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম বন্দর আদি দুর্গাবাড়ির পুজো। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মধ্যযুগের শেষের দিকে কুলিক নদীর তীরে একটি বন্দরকে কেন্দ্র করে যে জনপদ গড়ে উঠেছিল তার নাম ছিল ‘রাইগঞ্জ’। কেউ কেউ মনে করেন তৎকালীন বৈষ্ণব পদাবলীর প্রভাবে ওই জনপদের নামকরণ হয়েছিল। আবার কারও মতে সেই সময় ওই এলাকায় প্রচুর রাই বা সরষে উৎপাদিত হতো, সেই রাই কুলিকের বন্দর দিয়ে রপ্তানী করা হতো, তা থেকেই এই জনপদের নাম। যা আজ ধীরে ধীরে রায়গঞ্জ হয়ে গেছে।

রায়গঞ্জ শহরে অনেক দুর্গাপুজো হয়। তবে অনেকেই মনে করেন শহরের বন্দর এলাকার “রাইগঞ্জ আদি সর্বজনীন দুর্গা মন্দির” এর দুর্গা পুজো সর্বজনীন পুজোর নিরিখে প্রাচীনতম পুজো। যেই পুজো আজও নিষ্ঠা ও ভক্তির সাথে করে থাকেন এলাকাবাসীরা। আবার শোনা যায়, আজ থেকে আনুমানিক পাঁচশো বছর আগে বণিকেরা বাণিজ্য করতে এসে তাঁদের নৌকা বা বজরা নোঙর করতেন কুলিক নদীর বন্দর ঘাটে। সেই বণিক সমাজের এক সওদাগর দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে কুলিক নদীর ধারে তৎকালীন রাইগঞ্জের বন্দরে প্রচলন করেছিলেন দুর্গাপুজোর। সেই পুজো আজ রায়গঞ্জ শহরের বন্দর এলাকার বাসিন্দাদের “রাইগঞ্জ আদি সর্বজনীন দুর্গাপুজো” হিসেবে পরিগণিত।

প্রাচীন সেই দুর্গা বেদীকে ঘিরে আজ করা হয়েছে খোলামেলা নাট মন্দিরের মতো এক মন্দির। দেবী দুর্গা, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, অসুর ও বাহন সহ সব মূর্তি তৈরী হয় এক কাঠামোর মধ্যেই। চিরকালীন প্রথা মেনে বন্দর এলাকার নতুন প্রজন্মদের
নিয়ে প্রতিবছর পুজো কমিটি তৈরী করা হলেও এই পুজোতে কোনও বাজেট করা হয় না। এলাকার প্রবীন ব্যক্তিরা নতুন পুজো কমিটিকে বুঝিয়ে দেন আন্তরিকতার সাথে কি কি নিয়ম পালন করতে হবে সেই বিষয়গুলো। পুজোর কয়েকদিন আগে থেকে চাঁদার রসিদ বই নিয়ে টেবিল পেতে মন্দির প্রাঙ্গণে বসে থাকে কমিটির লোকেরা। আর বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষ এসে নিজের ইচ্ছায় চাঁদা দিয়ে যান। সেই চাঁদা দিয়েই সারা হয় পুজো পর্ব। আশ্চর্যজনকভাবে কোনও বছরেই বাজেটে ঘাটতি হওয়ার কথা কেউ কোনোদিন শোনেননি এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। মূর্তির অলঙ্কার ও অস্ত্র সবটাই রুপো এবং সোনার। যা গত বছরের পুজোর বিসর্জনের পর থেকে লকারে গচ্ছিত থাকে। প্রাচীন প্রথা মেনে দশমীতে নয় দ্বাদশীতে হয় প্রতিমা নিরঞ্জন। আগে প্রথা ছিল কাঁধে করে মায়ের প্রতিমা মন্দির প্রাঙ্গনের পাশে থাকা কুলিক নদীর ঘাটে বিসর্জন দেওয়ার৷ কিন্তু কালের নিয়মে কুলিক নদী তার গতিপথ বদলেছে। সেই মরা কুলিকের জল আজ কার্যত ঝিলে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে প্রতিমা বিসর্জন সেই জলে দেওয়া হয় না। প্রতিমা বিসর্জন হয় আরও অন্যান্য দুর্গা প্রতিমার সাথে বন্দর শ্মশান ঘাটে৷ প্রথা আছে এই পুজায় অষ্টমীতে সুসজ্জিতা ও সালঙ্কারা হয়ে আসতে হয় মায়ের দর্শন করতে। রীতি মেনে আজও অষ্টমীতে এলাকার মহিলারা সুসজ্জিত সালঙ্কারা হয়ে মায়ের দর্শন করতে আসেন। সবমিলিয়ে ইতিহাসের গন্ধমাখা আবহে এই মন্দিরে পূজিতা হন দশভূজা।

পূজা কমিটির অন্যতম সদস্য রূপেশ সাহা বলেন, তাদের সাত পূর্বপুরুষও জানাতে পারেননি এই পূজোর বয়স কত। তবে এখানকার দেবী দুর্গা খুবই জাগ্রত। নিয়মনিষ্ঠা করে পুজো করা হয় এখানে। পাঁচশো বছরের পুরোনো সেই একই কাঠামোতে আজও দেবীর প্রতিমা নির্মাণ করা হয়ে থাকে। মহাষ্টমীতে হাজার হাজার ভোগের ডালা পড়ে এই মন্দিরে। পুজোর প্রচলন নিয়ে নানা মত রয়েছে। রাইগঞ্জ আদি সর্বজনীন দুর্গাপুজো নিয়ে রায়গঞ্জ শহর তথা উত্তর দিনাজপুর জেলার মানুষের কাছে একটা আলাদা উন্মাদনা রয়েছে। জাগ্রত বলে বহু দূর দূরান্ত থেকে পূন্যার্থীরা দুর্গাপুজোয় ভোগ আর অঞ্জলি দিতে আসেন। এখানকার দেবীর কাছে মানত করলে তা পূরণ হয়। আর যে কারণে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে রায়গঞ্জ শহরের বন্দরে অবস্থিত এই মন্দিরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *