অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ৪ নভেম্বর: কালী পুজোর এই দিনটায় ভীষণ প্রাসঙ্গিক গ্রামোফোন কণ্ঠশিল্পী মুন্সী মহম্মদ কাসেমওরফে মানু মিয়া। বিস্মৃতির আড়ালে যেন একেবারে হারিয়ে গিয়েছেন। তিনি কে. মল্লিক নামে বেশি পরিচিত। এই নামে গান রেকর্ড করতেন। জন্ম ১২৯৫ বঙ্গাব্দের ১২ জ্যৈষ্ঠ ( ১৮৮৮ খ্রি.) বর্ধমান এর কুসুম গ্রামে।
মুন্সী ইসমাইল ও সানজী বিবির আট পুত্র ও তিন কন্যার মাঝে চতুর্থ কে, মল্লিক। মুন্সী মহম্মদ কাসেমের পূর্ব পুরুষ কুসুম গ্রামের জমিদার ছিলেন। গানের প্রতি আগ্রহ কাসেমের ছোটবেলা থেকেই ছিলো। উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদারী প্রাপ্তি ঘটেছিলো তার চাচাতো ভাই ইব্রাহিমের ভাগ্যে। কে, মল্লিক লেখেন ‘‘ইব্রাহিম সাহেব আমাকে গান বাজনা শিখাইবার জন্য একটি সিতারের মাস্টার রাখা হইল। আমার কণ্ঠ ছোটবেলা হতে খুব মধুর ছিলো। গান-বাজনা আমার খুব ভালো লাগিত। ইব্রাহিমের সাথে ইসমাইল সাহেবের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। ১৩০৬ সালে ইব্রাহিম সাহেব পরলোকগমন করেন। এতে একদিকে গানের চর্চায় ব্যাঘাত ঘটলো অন্য দিকে অর্থ সাহায্য প্রাপ্তি বন্ধ হলো।”
এদিকে ইব্রাহিম সাহেবের ভগ্নীপুত্রকে তবলা শিখানোর জন্য জনৈক সতীশ চক্রবর্তী আসতেন। তাঁকে ধরে মায়ের বাক্স হতে ৮ টাকা চুরি করে কলকাতায় পাড়ি জমালেন কে মল্লিক। এখানে এসে কাপড়ের দোকানে কাজ নিলেন। মাইনে দৈনিক সাড়ে তিন আনা। তারপর চামড়ার যাচনদারী করতেন। বেতন কম বলে জুতা পরতেন না। পেট ভরে খেতে পেতেন না। পরে একই কাজে কানপুরের আনোয়ারগঞ্জে গেলে সেখানে জনৈক সঙ্গীত চর্চাকারী হাকিম আবদুল হাইয়ের শরণাপন্ন হন। গান শেখা ফের শুরু করেন। ভাগ্য ফেরাবার জন্য ফকির-দরবেশের কাছে পর্যন্ত গিয়েছেন। পরে সেখান থেকে ফের কলকাতায়।
কলকাতায় একদিন শুভাাকাঙ্খীদের গান শোনাচ্ছেন দোকানে বসে। কে মল্লিকের গান শুনে রাস্তায় লোক জড়ো হয়ে যানজট তৈরি হয়। এমনকি সেখানে পুলিশ পর্যন্ত হাজির। তৎকালীন গ্রামোফোন কোম্পানীর ম্যানেজার স্বয়ং গান শুনে তাঁকে রেকর্ড ও গান দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। গাড়ি পাঠিয়ে তাঁকে নিয়ে গেলেন। গান রেকর্ড হলো। সে যুগে গাড়ি পাঠিয়ে ডেকে পাঠানো যা তা ব্যাপার ছিল না।
কে মল্লিক লিখেছেন, ‘‘একজন ক্লার্ক আসিয়া বলিলেন, সাহেব আপনাকে ১২ খানি গানে ৩০০ শত টাকা দিলেন আপনি সন্তোষ আছেন তো। আমি তো অবাক হইয়া বলিলাম আপনি শুনতে ভুল করেন নাইতো। বলিল, না মশায়। এ্যাঁ ত্রিশ ৩০ টাকা চোখে দেখি নাই ৩০০ টাকা পাইব! নাম সহি করিয়া ৩০০ টাকা হাতে পাইলাম।’’
তখন তিনি কে, মল্লিক হননি। কে, মল্লিক করে রেকর্ড বের হয় তাঁর অধিকর্তা গোঁরাচাঁদ মল্লিকের পরামর্শে। কাসেম নামটা কে, অক্ষরে লুকায়িত থাকলো হিন্দু-মুসলমান উভয়ের কাছে রেকর্ড বিক্রি হওয়ার জন্য আর মাঝখান দিয়ে গোরাঁচাঁদবাবু নিজের টাইটেলটা লাগিয়ে দিলেন। পরের ইতিহাস আরও উপভোগ্য। রেকর্ড বাজারে বের হলে, প্যাথিফোন কোং, হিজ মাস্টার ভয়েজ (এইচএমভি) সহ বিভিন্ন গ্রামোফোন কোম্পানী কে মল্লিকের গান বের করে। এক লাফে তার গান প্রতি সম্মানী দাঁড়ালো ২৫ টাকা। তখন অন্যান্য শিল্পীরা পেত ৭/৮ টাকা করে। পরে এইচএমভিতে চুক্তিভিত্তিক গান দিয়ে গান প্রতি ৫০/৬০ টাকা পারিশ্রমিক পান। তখন তাঁর মাসিক আয় ছিলো পাঁচ থেকে সাতশ টাকা। তখনও চামড়ার যাচনদারী তিনি ছাড়েননি।
পরে কানপুরে র্যালি ব্রাদার্স কোম্পানিতে চাকরি নেন। কানপুর থাকার সময় তিনি সংগীতজ্ঞ আবদুল হাই হাকিমের কাছে গান শেখেন।
১৯০৯-১৯১০ খ্রি. থেকে ১৯৪০ খ্রি. পর্যন্ত তিনি প্রচুর গান রেকর্ড করেন। তাঁর গান এত জনপ্রিয় ছিল যে, অধিকাংশ গানের রেকর্ড ৩০-৪০ হাজার কপি পর্যন্ত বিক্রি হয়। বিখ্যাত হওয়ার পর আরেকটি বিদেশি রেকর্ড কোম্পানি ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ তাঁর গান রেকর্ড করে। ‘পণ্ডিত শঙ্কর মিশ্র’ নামে হিন্দি গানও রেকর্ড করেন।
কে. মল্লিক নামে রেকর্ডকৃত তাঁর গাওয়া হিন্দু ধর্মীয় সংগীত, বিশেষত শ্যামাসংগীত প্রচুর জনপ্রিয় হয়। বিশ শতকের শুরুর দিক থেকে এদেশে গ্রামোফোন কোম্পানী গানের রেকর্ড বের করা শুরু করে। কে মল্লিক সেই প্রথম যুগের একজন সফল ও জনপ্রিয় শিল্পী। তিনি হিন্দু ভক্তিগীতি, ইসলামী গান-গজল, কাব্যগীতি ইত্যাদি গেয়ে উভয় সম্প্রদায়ের ভক্তি ভাজন হন।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলায় ইসলামি গান লিখতে শুরু করলে তিনিও ইসলামি গান গাইতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদকে অনুরোধ করেন, নজরুলকে তাঁর জন্য ইসলামি গান লিখে দিতে প্ররোচিত করতে। কিন্তু কে. মল্লিক ইসলামি গান রেকর্ড করলে তাঁর শ্যামাসংগীত বিক্রি কমে যাবে আশঙ্কা করে কাজী নজরুল ইসলাম এবং গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল ইনচার্জ ভগবতী ভট্টাচার্য তাতে রাজি হননি। ভগবতীবাবুর মৃত্যুর পর দায়িত্বে আসেন হেমচন্দ্র সোম। তাঁর সম্মতিতে নজরুল শিল্পীর জন্য ইসলামি গান লেখেন। ‘মুন্সী মহাম্মদ কাসেম’ নামেই তা রেকর্ড করা হয়।
মুন্সী মহাম্মদ কাসেম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন প্রমুখের গান, শ্যামাসংগীত, আগমনী গান, ইসলামি গান প্রভৃতি রেকর্ড করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘আমার মাথা নত করে দাও হে’, অতুলপ্রসাদের ‘বঁধু এমন বাদলে তুমি কোথায়’ এবং নজরুলের ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসনে আজি দোল’ গানগুলি রেকর্ড হলে সুধীমহলে প্রচণ্ড আলোড়নের সৃষ্টি হয়।
প্রখ্যাত নজরুলসঙ্গীত শিল্পী আঙ্গুরবালা ছিলেন কে মল্লিকের সমসাময়িক এবং নজরুল ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কে মল্লিক এক সময় ঝরিয়ার রাজবাড়ির সভাগায়ক ছিলেন। ওই সময় কমলা ঝরিয়া তাঁর অনুপ্রেরণায় কলকাতা আসেন এবং কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন।
গায়ক দরিদ্র পরিবারে জন্মান। তাঁর রেকর্ড থেকে গ্রামোফোন কোম্পানি প্রচুর টাকা উপার্জন করলেও তাঁর দারিদ্র্য ঘোচেনি। শেষজীবনে তিনি নিজের গ্রামে ফিরে আসেন। স্থানীয় কৃষকদের সংগীত শিক্ষা দিতেন। ১৩৬৬ বঙ্গাব্দে (১৯৫৯ খ্রি.) তিনি মারা যান।
“অতীতের শিল্পীদের এ যুগের কাছে গ্রহণযোগ্য করানোটাই নাগরিকতা“, তেমনটাই মনে করতেন সুধীর চক্রবর্তী৷ ২০১৩-তে সঙ্গীতশিল্পী কে মল্লিক-এর (১৮৮৮-১৯৬১) একশো পঁচিশ বছর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে লাহাবাড়িতে সূত্রধর প্রকাশনা সংস্থা আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ওই কথা বলেন তিনি৷ অনুষ্ঠানে প্রকাশিত হয় গিরিধারী সরকার রচিত ‘বিস্মৃতির সঙ্গীতশিল্পী কে মল্লিক’ বইটি৷ পুরনো গানের সংগ্রাহক সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় গ্রামাফোন রেকর্ডে বাজিয়ে শোনান কে মল্লিকের গান৷ তার মধ্যে ছিল অন্য সুরে রবিবাবুর গান ‘আমার মাথা নত করে দাও’, কান্তগীতি ‘আমি তো তোমারে চাহিনি’, রেকর্ডে তাঁর প্রথম গান ‘হরি দিবা নিশি ডাকি তাই’ এবং কিছু নজরুলগীতি৷ কে, মল্লিকের কণ্ঠে তিনটি রবীন্দ্র সঙ্গীতের হদিস মেলে। ‘‘আমার মাথা নত করে দাও, আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি, নিশীথ শয়নে ভেবে রাখি মনে। অতুল প্রসাদের ‘‘বধূ এমন বাদলে তুমি কোথা’’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানই তিনি বেশি গেয়েছেন। নজরুলের রেকর্ড গানের আদি শিল্পীদের মাঝে তিনি একজন। বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে দোল এটিই কে, মল্লিকের গাওয়া প্রথম নজরুল গীতি। নজরুলের গানের মাঝে প্রাপ্ত তথ্য মতে ৫০টি কে, মল্লিক নামে ৩৫টি মহম্মদ কাসেম নামে ৪টি মানু মিয়া নমে এবং পাঁচটি গান শংকর মিত্র নামে বের হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগ রেকর্ডই এইচএমভ্রি। এ ছাড়া নজরুলের ১৩টি গানে কে মল্লিক সুরারোপ করেন।
এই কালজয়ী কিংবদন্তী প্রতিভা বাঙালি মুসলমান শিল্পীদের পথ প্রদর্শক। বাংলা ছাড়াও তিনি উর্দু ও হিন্দি গান করেন। তাঁর গানের মধ্যে বেশির ভাগ ছিলো ইসলামী। তখনকার যুগে রেকর্ড সংখ্যার দিক থেকেও কেউ তাঁকে অতিক্রম করতে পারেনি। তার প্রতি রেকর্ড প্রায় ৩০/৪০ হাজার কপি বিক্রি হতো যা তখনকার দিনে এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। রেডিও ও থিয়েটারে গান করেন। সঙ্গীত শিক্ষা দেন। প্রখ্যাত গায়িকা কমলা বারিক তাঁর হাত ধরে উঠে আসেন।
আব্বাস উদ্দিন তাঁর স্মৃতি কথায় লেখেন, “আমার সেদিন রেকর্ড হবে। আলাপ হলো কে মল্লিকের সাথে। আমি মুসলমান একথা জানতে পেরে তিনি প্রথম আত্মীয়তার সুরেই আমাকে বললেন, কি গান রেকর্ড করবে গাও দেখি! একবারটি আমার গান শুনে তিনি বললেন, চমৎকার গলা! কিন্তু ….. বিমলবাবু আজ এর রেকর্ড হতে পারে নাকি? আমি ভড়কে গেলাম। কি ব্যাপার? বলে বিমলদা এগিয়ে এলেন। কে মল্লিক মশায় বললেন, নতুন আর্টিস্ট মশাই, তাতে আবার মুসলমান। দেখুন না গানের উচ্চারণ, আজ থাক। সারাদিনে আমি ওর উচ্চারণগুলো ঠিক করে দিই। কাল রেকর্ড করবেন। প্রাণে এতক্ষণে জোর এলো। বিমলদা বলে উঠলেন হবে না- জাতের টান তো! এ কথার অর্থ আমি বুঝলাম না, জিজ্ঞাসু নয়নে কে, মল্লিক মশায়ের মুখের দিকে তাকালাম। তিনি হেসে বললেন, উনি ঠিকই বলেছেন, আমিও তো মুসলমান। আকাশ থেকে ফেরেশতা নেমে এসে হলফ করে বললেও বিশ্বাস করতাম না। কেমন করে করি? বললাম কিন্তু ছেলেবেলা থেকে তো শুনে আসছি আপনার গান, ঐ শুধু আর কবে দেখা দিবি মা ওমা অন্তে যেন চরণ পাই-এই সব গান। তিনি হেসে বললেন তাতে কি হয়েছে। গান গান, তাতে হরিই কি শ্যামাই বা কি।“
একবার কে মল্লিকের পাড়ার অনুষ্ঠানে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য একঝাঁক শিল্পী নিয়ে গেছেন গান গাইতে। হঠাৎ ধবধবে সাদা চুল-দাড়ির এক বৃদ্ধ এসে সেই দলের মধ্যে কাকে যেন খুঁজছেন। তিনিই বিখ্যাত শ্যামাসঙ্গীত শিল্পী কে মল্লিক। সবাই তাঁকে প্রশ্ন করছেন, কাকে খুঁজছেন তিনি? উত্তরে সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, পান্নালালকে।পান্নালাল ভট্টাচার্যকে তখন তাঁর সামনে দাঁড় করাতেই কে মল্লিক নাকি জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘এমন ভাবে কী করে গান গাস তুই? কী করে এমন করে মাকে ডাকতে পারিস?’ সেদিন সবাই স্তব্ধ হয়ে দেখেছিলেন এক সাধক-গায়ক কীভাবে আরেক সাধক-গায়ককে, তাঁর যোগ্য উত্তরসূরীকে চোখের জলে বরণ করে নিচ্ছেন।
ঋণ— * উইকিপিডিয়া। * ই পত্রিকা ডটকম, ১২ ডিসেম্বর ২০১৫। * এই সময় ডটকম, ২৫ জুন ২০১৩। * এনডিটিভি সম্প্রচার, ২৭ অক্টোবর ২০১৯।

