ধ্বনি ভোটে পাস বহিষ্কারের প্রস্তাব, খারিজ হয়ে গেল মহুয়া মৈত্রের সংসদ পদ

আমাদের ভারত, ৮ ডিসেম্বর: ক্যাশ ফর কোয়েরি বিতর্কে এথিকস কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে সংসদ থেকে বহিষ্কৃত হলেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। ঘুষের বদলে প্রশ্ন কাণ্ডে লোকসভায় মহুয়া মৈত্রের সদস্য পদ খারিজের দাবিতে আজ প্রস্তাব পেশ করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তারপর সেই প্রস্তাবের উপর আধ ঘন্টা আলোচনার অনুমতি দেন স্পিকার ওম বিড়লা। অধ্যক্ষ বলেন, সংসদের মর্যাদা রক্ষার জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। গণতন্ত্রে কখনো এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয় যা দুর্ভাগ্যজনক। সংসদের মর্যাদার সঙ্গে কোনো ভাবেই আপোস নয়।

আলোচনার জন্য বাড়তি সময় দাবি করেছিলেন তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের আর্জি মেনে বাড়তি সময়ও দেন স্পিকার, কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনে মহুয়া মৈত্রকে সংসদে বলার সুযোগ দেননি স্পিকার। সংসদে মহুয়া মৈত্রকে বলতে দেওয়ার দাবিতে জোড়দার সাওয়াল করে তৃণমূল। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে বলতে সুযোগ দেওয়া হোক। তৃণমূলের তরফের দাবি করেন সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।

কিন্তু সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে সংসদে মহুয়া মৈত্রকে বলার অনুমতি দেননি স্পিকার। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সাংসদ এখন আধা বিচারকের ভূমিকায়। আমরা এখানে একজনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে বসেছি। তাই যার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল, তাকে বলতে দেওয়া হোক। একই সঙ্গে হীরানন্দানিকে এথিক্স কমিটির সামনেও হাজিরা দেওয়ার দাবি জানান তিনি। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, হিরানন্দানীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। হিরানন্দানীর হলফনামা নিয়েও প্রশ্ন করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

এদিকে এথিকস কমিটির সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কংগ্রেস তথা বিরোধী দলনেতা অধীর চৌধুরী। তিনি প্রশ্ন করেন, এত তাড়াহুড়ো কেন? এত তাড়াহুড়ো করে রিপোর্ট পড়া কি সম্ভব? আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তকেও, তাহলে মহুয়াকে কেন বলার সময় দেওয়া হবে না? কমিটি সুপারিশ করতে পারে, কিন্তু কী সাজা হবে তা বলতে পারে না। এমন ভাবে সভা পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে সিদ্ধান্ত একমুখী হয়। যা স্বাভাবিক ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। আজ আমাদের সহকর্মীর ভাগ্য নির্ধারণ, বিচার চাইছি আমরা।

এর জবাবে স্পিকার বলেন, এটা আদালত নয় এটা সংসদ। পাল্টায় বিজেপি সাংসদ হীনা গাভিদ প্রস্তাবের সমর্থনে বলেন, ২০০৫ সালে কংগ্রেস সরকার ছিল। সেই সময়ে এই ধরণের ঘটনায় একই দিনে রিপোর্ট পেশ ও ওই দিনেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। মহুয়া নিজেই হিরানন্দানীকে আইডি পাসওয়ার্ড দেন। দুবাই আমেরিকায় বসে মহুয়ার অ্যাকাউন্ট থেকে লগইন হয়। দেশের সুরক্ষার প্রশ্নের নারী, পুরুষ কিছুই হয় না। এই জবাবে বিজেপি সাংসদ আসলে মহুয়ার বস্ত্রহরণ মন্তব্যের পাল্টা দেন।

বিজেপি সাংসদ অপরাজিতা সারেঙ্গী বলেন, এথিকস কমিটি তাকে ডেকে পাঠালে তিনি বৈঠকের মাঝেই ওয়াক আউট করেন। আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেন। সব মিলিয়ে মহুয়া ইস্যুতে তুমুল বিতন্ডা চলে সংসদে।‌ এরপর স্পিকার ভোটাভুটির মাধ্যমে সংসদ থেকে মহুয়ার বহিষ্কারের প্রস্তাব পাশ করেন।

আজ লোকসভা অধিবেশন শুরুর পর থেকেই হই হট্টোগোলে বারবার মুলতবি হয়ে যায় অধিবেশন। প্রথমে বেলা বারোটা পর্যন্ত মুলতবি হয় অধিবেশন, তারপর অধিবেশন শুরু হলে লোকসভায় এথিকস কমিটির রিপোর্ট পেশ করেন এথিকস কমিটি চেয়ারম্যান। তারপর আবার অধিবেশন দুটো পর্যন্ত মুলতবি হয়ে যায়।

আজ মহুয়া ইস্যুতে সংসদে একজোট ছিল ইন্ডিয়া। লোকসভায় ঢোকার সময় দৃঢ়তা ধরা পড়েছিল মহুয়ার মধ্যে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তাকে বলতে শোনা যায়, “লাভলি, দেখবো কী হয়। মা দুর্গা এসে গিয়েছে, এবার দেখবেন। বস্ত্রহরণের খেলা ওরা শুরু করেছে, এবার মহাভারতের যুদ্ধ দেখবে।” কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইন তাকে বলতে শোনা যায়। অসত্যের কাছে কভু নত নাহি কর শির, ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর।

৩১ অক্টোবর মহুয়াকে প্রথম বার ডেকে পাঠিয়েছিল এথিকস কমিটি। কিন্তু সেবার তিনি না গিয়ে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন সংসদে এলাকায় বিজয়া সম্মেলনীতে তিনি রয়েছেন। ৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি ব্যস্ত থাকবেন। ৫ নভেম্বরের পর যে কোনো দিন তাকে ডাকলে কোনো সমস্যা নেই, তিনি হাজিরা দিতে পারবেন। তারপর তাকে চিঠি পাঠিয়ে ২ নভেম্বর ডেকে পাঠানো হয়। যদিও ২ নভেম্বর মাঝপথেই বৈঠক থেকে ওয়াক আউট করেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মহুয়াকে বলতে শোনা যায়, “এটা কী ধরনের বৈঠক? ওরা নোংরা প্রশ্ন করছেন। বাজে প্রশ্ন করছেন।” কমিটিতে মৌখিকভাবে বস্ত্র হরণের অভিযোগ তোলেন মহুয়া।

লোকসভার স্পিকার ওকে চিঠিতে লেখেন যে ভাবে প্রশ্ন করেছেন এথিকস কমিটির চেয়ারম্যান, তা মর্যাদা হানিকর। তিনি আরও দাবি করেন, কমিটির আরও পাঁচ সদস্য আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেননি এথিক্স কমিটির চেয়ারম্যান বিনোদ সোনকার। সূত্রের খবর, এথিকস কমিটির বৈঠকে রাতে কোন হোটেলে ছিলেন? কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন? এই ধরনের ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা হয়েছিল মহুয়াকে, বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মহুয়া ঘনিষ্ঠ মহলে।

2 thoughts on “ধ্বনি ভোটে পাস বহিষ্কারের প্রস্তাব, খারিজ হয়ে গেল মহুয়া মৈত্রের সংসদ পদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *