একজনের অ্যাকাউন্টে অন্য জনের ফোন নম্বর, ভুয়ো অ্যাকাউন্টের খোঁজ করতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ সিবিআইয়ের

আশিস মণ্ডল, সিউড়ি, ৬ জানুয়ারি: সিউড়ি কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট খোলার ফর্মে থাকা মোবাইল নম্বরে ফোন করতেই ভুয়ো অ্যাকাউন্টের বিষয় প্রকাশ্যে আসে। অ্যাকাউন্টে নাম এবং সই থাকা সুন্দরীকে ফোন করতেই জানা যায় মোবাইল নম্বর আদতে হুগলির ধনে খালির বাসিন্দা তৃষা পালের। নম্বর ব্যবহারকারীরা নিজেরাই জানেন না তাদের নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে বীরভূমের সিউড়ি ১ নং ব্লকের পুরন্দরপুর পঞ্চায়েতের হরিপুরের বাসিন্দা বছর ৫৭-র সুন্দরী বাসকির। 

শুক্রবার হরিপুর গ্রামে পৌঁছতেই চোখ কপালে উঠল। সই করা তো দূরের কথা, নিজের নামটাও পড়তে পারছেন না সুন্দরী বসাকি। তার নামে সই করে কে অ্যাকাউন্ট খুললো হতবাক বৃদ্ধা। বৃদ্ধা সুন্দরী অসুস্থতার কারণে আর কাজ করতে পারেন না। তিনি এখন বাড়িতে থাকেন। আর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট? সুন্দরী বলছেন, তাঁর একটাই অ্যাকাউন্ট আছে, তবে সেটা সিউড়ি সমবায় ব্যাঙ্কে  নয়। তিনি বলেন, “আমি টিপ ছাপ দিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলি। যারা এমন দোষ করেছে তাদের শাস্তি চাই। আমি বিপদে পরবো না তো?” তাহলে ব্যাঙ্কে দেওয়া মোবাইল নম্বরটা কার? সুন্দরী হেসে ফেলেন। বলেন, কোনও মোবাইলই নেই আমার।’
তাহলে সিউড়ির ওই ব্যাঙ্কে সুন্দরী বসাকির নামে অ্যাকাউন্ট খুলল কে?

শুধু সুন্দরী নন, হরিহরপুর বা পুরন্দরপুরের মতো গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বড় বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। একটা দুটো নয়, সিউড়ি সমবায় ব্যাঙ্কে ১৭৭ টি অ্যাকাউন্ট বেনামে খোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ। আর সে সব অ্যাকাউন্ট যাঁদের নামে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই দাবি করেছেন, এসব কিছুই জানেন না তাঁরা। সিবিআই সূত্রে খবর, এমন বহু বেনামী অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। যে অ্যাকাউন্ট মাধ্যমে সরাসরি কালো টাকা সাদা করা হয়েছে।

কেলেঙ্কারির তালিকায় নয়া সংযোজন সিউড়ির কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্ক। বৃহস্পতিবারই সেই ব্যাঙ্কের ১৭৭ টি অ্যাকাউন্ট সিল করে দিয়েছে সিবিআই। সব কটি অ্যাকাউন্টে একজনেরই সই আছে বলে দাবি গোয়েন্দাদের। 
সুন্দরী বসাকি বা ভগীরথ ঘোষদের নামে কীভাবে অ্যাকাউন্ট খোলা হল? নথিই বা মিলল কী করে? তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

তবে এই বিষয়ে সুন্দরী বাসকি বলেন, “দুয়ারে সরকার ক্যাম্পে লক্ষ্মীর ভান্ডারের জন্য ফর্ম ও কাগজ পত্র জমা দিযেছিলাম। আজও লক্ষ্মীর ভান্ডার পাইনি।” তা হলে কি দুয়ারে সরকার ক্যাম্প থেকেই নথি চলে গেছে বেনামী ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের জন্য! এই ব্যাঙ্কের প্রাক্তন চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বর্তমানে তৃণমূলের ব্লক সভাপতি। তাঁর ব্লকের অনেক বাসিন্দার সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটেছে। তিনি জানান, অনুব্রতর অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছিল। তাঁরা সবরকমভাবে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে সহযোগিতা করতে চান বলেও জানিয়েছেন।

এদিন সিউড়ি কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন রাজনৈতিক স্বার্থে সিবিআই হানা হয়েছে। এদিন ব্যাঙ্কের প্রাক্তন চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, “রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতেই সিবিআই কোনো কিছু না বলে হঠাৎ হানা দিয়েছে। কি জন্য দিয়েছে তাও পরিস্কার নয়। তবে একটা কথা পরিস্কার অনুব্রত মণ্ডল কোনো দিন এই ব্যাঙ্কে কোনো রকম অন্যায়কে প্রশয় দেননি। তবে ক্যাম্প করে যখন অ্যাকাউন্ট করা হয়েছিল তখন কেওয়াইসি তথ্য সব ঠিক না হতেও পারে। তা আমরা খতিয়ে দেখব।

এদিন সাংবাদিক সম্মেলন করে ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টরদের কমিটি একটি জরুরি বৈঠকে বসে। জানা গেছে, ইতিমধ্যেই ব্যাঙ্ক ও এই নিয়ে একটি আভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত শুরু করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার বেনজির হোসেন বলেন, “গত ছয় মাস ধরেই সিবিআই আমাদের কাছে নানা তথ্য চেয়ে পাঠাচ্ছে আমরা তা সময় মত পৌঁছে দিয়ে সহযোগিতা করছি।” তিনি আরও বলেন, “ফ্যারমারস অ্যাকাউন্টে কোনো ক্যাশ টাকা জমা পড়েনি। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা এসেছে। এনএফটির ম্যাধ্যমে তা গেছে। এখানে কোনো অন্যায় নেই। তবে কেওয়াইসি গলদ থাকলে আমরা তা খতিয়ে দেখবো।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *