মিলন খামারিয়া, আমাদের ভারত, নদিয়া, ২৯ আগস্ট: পুরাণ অনুসারে, মনসা হলেন শিবের স্বীকৃতকন্যা ও জরৎকারু মুনির পত্নী। জরৎকারু মনসাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মনসার মা চণ্ডী (শিবের স্ত্রী পার্বতী) তাঁকে ঘৃণা করতেন কিন্তু পরবর্তীতে মাতা চণ্ডী মনসাকে নিজের মেয়ের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। মনসাকে ভক্তবৎসল বলে বর্ণনা করা হলেও, যিনি তার পূজা করতে অস্বীকার করেন, তার প্রতি তিনি অত্যন্ত নির্দয়। জন্ম-সংক্রান্ত কারণে মনসার পূর্ণ দেবীত্ব প্রথমে অস্বীকার করা হয়েছিল। তাই মনসার উদ্দেশ্য ছিল দেবী হিসেবে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করা এবং একটি একনিষ্ঠ মানব ভক্তমণ্ডলী গড়ে তোলা। তার সাথে মিশরীয় দেবী আইসিসের মিল রয়েছে।
মনসা হলেন একজন লৌকিক হিন্দু দেবী। ‘দেবী ভাগবত’ পুরাণ সহ আরও অনেক পুরাণে দেবী মনসার উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি সর্পদেবী। প্রধানত বাংলা অঞ্চল এবং উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে তার পূজা প্রচলিত আছে। সর্পদংশনের হাত থেকে রক্ষা পেতে, সর্প-দংশনের প্রতিকার পেতে, প্রজনন ও ঐশ্বর্যলাভের উদ্দেশ্যে তাঁর পূজা করা হয়। মনসার ঘট স্থাপন করে বা মূর্তি রেখে তার পুজো করা হয়। মনসা নাগ-রাজ (সর্পরাজ) বাসুকীর ভগিনী এবং ঋষি জরৎকারুর (জগৎকারু) স্ত্রী। মনসা ছাড়া তাঁর অপর নামগুলি হল বিষহরি বা বিষহরা (বিষ ধ্বংসকারিণী), নিত্যা (চিরন্তনী) ও পদ্মাবতী।
তবে মনসা, কেতকা, পদ্মাবতী—এই নামেই মনসাদেবী সমধিক প্রসিদ্ধ। ইনিই মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ কাব্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তাই এই কাব্যকে ‘মনসামঙ্গল’ বা ‘পদ্মাপুরাণ’ বলে। মনসা প্রাক্-পৌরাণিক দেবী। ইনি প্রাচীন পুরাণে স্থান পাননি অথচ লোকব্যবহারে ও লোকসাহিত্যে অর্বাচীন বৈদিককাল থেকে বিভিন্ন রূপ পরিবর্তন করে চলে আসছেন। অবশ্য কোনও কোনও প্রাচীন হিন্দু পুরাণ ও বৌদ্ধ গ্রন্থে সর্প দেবী মনসার বর্ণনা আছে। পদ্মাপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ ও দেবীভাগবতে মনসার উল্লেখ রয়েছে। সংস্কৃত পুরাণ সাহিত্যে মনসা একবার ঈষৎ ধরা দিয়েছিলেন। সেটা মহাভারতের আদিপর্বে জনমেজয়ের সর্পসত্রের পূর্বপ্রসঙ্গক্রমে। কিন্তু প্রাচীন পুরাণ ও মহাভারতে যে সর্প দেবীর উল্লেখ আছে সেখানে তিনি হচ্ছেন জরৎকারুর—আস্তিক তাঁর ছেলে। মহাভারতে মনসা ও তাঁর স্বামীর নাম একই—জরৎকারু। ‘মনসা’ দেবতার ভাবনা ঋগ্ববেদে অজ্ঞাত ছিল না। ঋগ্বেদের একটি শ্লোকে মনসা দেবীর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ত্রী সপ্ত ময়ুর্যঃ সপ্ত স্বসারো অগ্রু বঃ।
তাস্তে বিষং বিজভ্রির উদকং কুম্ভিনীরিব॥
‘তিন সাত ময়ূরী, সাত ভগিনী কুমারী, তাহারা তোমার বিষ তুলিয়া লইতেছে, যেমন কলসীকাঁখে মেয়েরা (কুপ হইতে) জল (লইয়া যায়)।’

পুরাণে তাকে ঋষি কাশ্যপ ও নাগ-জননী কদ্রুর কন্যা বলা হয়েছে। খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ মনসা প্রজনন ও বিবাহের দেবী হিসেবে চিহ্নিত হন এবং শিবের আত্মীয় হিসেবে শৈব দেবমণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত হন। কিংবদন্তি অনুসারে, দেবাদিদেব মহাদেব সমুদ্র মন্থনে উত্থিত বিষ পান করার পর মনসার মধ্যে তা সঞ্চার হয় এবং মনসা ‘বিষহরী’ নামে পরিচিত হন। মনসার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং তা দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে মনসা-কেন্দ্রিক ধর্মীয় গোষ্ঠীটি শৈবধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়। এর ফলে শিবের কন্যা রূপে মনসার জন্মের উপাখ্যানটি রচিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত শৈবধর্মও এই আদিবাসী দেবীকে মূলধারার হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্য ধারার অন্তর্ভুক্ত করে।
মনসার কাহিনী পঞ্চদশ শতাব্দী শেষ হবার আগেই পরিপূর্ণ পাঁচালিরূপ ধারণ করেছিল। এর ইঙ্গিত পাই বিপ্রদাস পিপ্লাইয়ের ‘মনসাবিজয়’ কাব্যে। বিপ্রদাসের কাব্যখানি রচিত হয়েছিল পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে। বাস্তুদেবতার, আরোগ্যের দেবতা অথবা সম্পদের দেবতা—এই বিভিন্ন নামে মনসার পূজা এদেশে বরাবর চলে এসেছে। এখন ইনি বিশেষ করে সাপের দেবতা, তবে নিজে সাপ নন। পদ্মদলে মনসার উৎপত্তি।

মনসার মূর্তিতে তাকে সর্প-পরিবেষ্টিত নারী রূপে দেখা যায়। তিনি একটি হংস বা পদ্মের উপর বসে থাকেন। তার বাহন হাঁস ও সাপ। তাঁর চার হাত। উপরের দুটি হাতে থাকে পদ্ম ও নিচের দুটি হাতে থাকে সাপ। সাতটি সাপের ফনা তাঁর মাথার উপর ছাউনির আকারে বিরাজ করে। কোনো কোনো মূর্তিতে তাঁর কোলে একটি শিশুকে দেখা যায়। এই শিশুটি তাঁর পুত্র আস্তিক। তাকে ‘একচক্ষু-বিশিষ্ট দেবী’ বলা হয়। মনসার মা চণ্ডী ক্রোধের বসে তাঁর একটি চোখ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন।
মানব সমজের গতি অর্থাৎ প্রবহমানতার মাধ্যম হলো সৃষ্টি। তাই ‘মনসার ঘট’ হলো গর্ভবতী নারীর প্রতীক। যেখান থেকে প্রাণ সঞ্চার হয়ে মানব জীবন ক্রম বিবর্তনের মাধ্যমে এগিয়ে চলছে। মনসা ঘট যেমন গর্ভবতী নারীর প্রতীক তেমনই ফসলের উর্বরতারও প্রতীক,যাকে প্রজনন শক্তির প্রতীক হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে।
সাধারণত মনসার মূর্তি পূজা হয় না। সীজ বৃক্ষের শাখায়, ঘটে বা সর্প-অঙ্কিত ঝাঁপিতে মনসার পূজা হয়। তবে কোথাও কোথাও মনসার মূর্তিও পূজিত হয়। বাংলা অঞ্চলেই মনসার পূজা সর্বাধিক জনপ্রিয়। বিজয়গুপ্তের গৈলা-ফুল্লশ্রী(বর্তমান -বাংলাদেশ) গ্রামে এখনো মা মনসার মন্দির আছে। এই অঞ্চলে অনেক মন্দিরে এখনো বিধিপূর্বক মনসার পূজা হয়। বর্ষাকালে যখন সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পায়, তখন মনসার পূজা মহাসমারোহে হয়ে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে পুরো শ্রাবণ মাস জুড়েই মনসা পূজা হয়। পুজো উপলক্ষে হয় পালা গান ‘সয়লা’। এই পালার বিষয় হল— পদ্মপুরাণ বা মনসা মঙ্গল। সারা রাত ধরে গায়ক দোয়ারপি-সহ পালা আকারে ‘সয়লা’ গান গায়। পুরুলিয়ায় মনসা পূজায় হাঁস বলি দেওয়া হয়। রাঢ বাঁকুড়ায় জ্যেষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে দশহরা ব্রত পালন করে মনসা পূজা করা হয়। তখন এখানে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। মনসা পূজার অঙ্গ হল অরন্ধন। রাঢ়ে চৈতন্যদেবের সময়ে মনসাকে মা দূর্গার এক রূপ মনে করা হত। তাই কোনো কোনো জায়গায় পূজায় বলি দেয়া হত। আজো অনেক পূজায় পাঁঠা বলি হয়।
উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে রাজবংশী জাতির কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেবদেবীদের অন্যতম হলেন মনসা। প্রায় প্রত্যেক কৃষক গৃহেই মনসার ‘থান’ বা বেদী দেখা যায়।দক্ষিণ দিনাজপুরের ফুলঘড়ায় শরৎকালে দূর্গাপূজার পরিবর্তে মনসা পূজা হয়। ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে মনসা পূজা হচ্ছে। পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশ) নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যেও মনসাপূজা বিশেষ জনপ্রিয়।
বাংলার বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও মনসাপূজা বিশেষ প্রচলিত। এর কারণ মনসামঙ্গল কাব্যের চাঁদ সদাগর, যিনি প্রথম মনসার পূজা করেছিলেন, তিনি ছিলেন একজন বণিক। এই কাব্যের নায়িকা বেহুলাও সাহা নামক এক শক্তিশালী বণিক সম্প্রদায়ের গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
ভারতের অসম রাজ্যেও মনসাপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই রাজ্যে ওজা-পালি নামে একধরনের সংগীতবহুল যাত্রাপালা সম্পূর্ণ মনসার কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

নাগপঞ্চমী তিথি,শ্রাবণ সংক্রান্তি,ডাক সংক্রান্তি ও অন্য দিনে মনসার বিধিপূর্বক পূজা প্রচলিত। এই উৎসবটি হল একটি সর্পকেন্দ্রিক উৎসব। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে শ্রাবণ (জুলাই-অগস্ট) মাসে এই উৎসব পালিত হয়। বাঙালি মেয়েরা এই দিন উপবাস করে ব্রত পালন করেন এবং সাপের গর্তে দুধ ঢালেন।
তাই দেখা যাচ্ছে,দেবী মনসার মাহাত্ম্য কথা পশ্চিমবঙ্গ তথা সারাদেশ জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে। নদীয়া জেলার রানাঘাট-১ ব্লকের কালীনারায়নপুর-পাহাড়পুর গ্রাম পঞ্চায়েতের জয়পুর গ্রামও তার ব্যতিক্রম নয়। গত চারদিন ধরে এই গ্রামে মনসা পূজার আয়োজন করেছিলেন বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তারা।রীতিমতো প্যান্ডেল খাটিয়ে এই গ্রামে মনসার পূজা হয় মূর্তি তুলে। পাশেপাশের গ্রামের মানুষ মনসা পূজা উপলক্ষ্যে আয়োজিত মেলা দেখতেও আসেন। সর্পদেবী মনসার এতো জাঁকজমকপূর্ণ পূজা সাধারণত বিরল বলা যায়।
এ-বছর গ্রামে মোট দশটি বড়ো পুজো হচ্ছে। তারমধ্যে অন্যতম বড়ো পুজো হল জয়পুর স্পোর্টিং ক্লাব। এই ক্লাবের মনসা পুজো সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ক্লাব সেক্রেটারি ভবতোষ বিশ্বাস জানান যে, “গত একশো বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের গ্রামে মা মনসার পুজো হচ্ছে। তবে জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে হচ্ছে গত ২৪ বছর ধরে।আশেপাশের, হবিবপুর, রানাঘাট, বীরনগর, তাহেরপুর, পায়রাডাঙা প্রভৃতি স্থান থেকে অনেক মানুষ এই পুজো দেখতে আসেন। আমাদের ক্লাবের মাঠে একটি মেলা বসে। অনেক মানুষের রুজিরোজগার হচ্ছে এই পুজো উপলক্ষে। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতি ও দেবী মনসার মাহাত্ম্যও প্রচারিত হচ্ছে। আমরা চাই যে – এই পুজো প্রচারের আলোয় আসুক এবং আরও মানুষের সমাগমের মাধ্যমে আমাদের জয়পুর গ্রামের পুজো এক মহামিলন মেলায় পরিনত হোক।”
মনসা গীতবাদ্যপ্রিয়—গান-বাজনা না হলে তার পূজা হয় না এবং এই গীতনৃত্য করেই বেহুলা তাঁর (মনসার) প্রসাদ লাভ লক্ষ্মীন্দরকে পুনর্জীবিত করতে পেরেছিলেন।
দেবী মনসার মাহাত্ম্য কথা জনসমাজে বহুল প্রচলিত আছে। জয়পুরের পুজো এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে তার প্রমাণ দিয়ে চলেছে। বহু মানুষ এই পুজো উপলক্ষ্যে আয়োজিত ‘ভাসান গান বা মনসার গান’ শুনতেও দূরদূরান্ত থেকে আসেন বলে জানা যায়।

