রুদ্র প্রসন্ন ব্যানার্জি,
গবেষক, আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা
আমাদের ভারত, ১ জুন:
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী,
গতকালকের প্রেস কনফারেন্সে বাংলার জন্য আপনার কাতর আবেদন শুনে বড়ই বিস্মিত হলাম। একুশের নির্বাচন এক পায়ে জয় করার পরের দিনই আপনার দলের সাংসদ আমেরিকার সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসে মোদীবাবুকে তীব্র ভৎর্সনা করে লিখে ফেললেন, মোদিকে কিভাবে হারাতে হবে তা তিনি জানেন – তারপরে আপনি কিনা বলছেন, বাংলার উন্নতির জন্য বহিরাগত মোদীর পায়ে ধরবেন! কিন্তু তার কি সত্যিই কোনও প্রয়োজন আছে?
২০১৬ সাল থেকে আজ অবধি, কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের সরকারকে লজিস্টিক হাব নির্মাণের জন্য কত টাকা দিয়েছে একবার দেখে নেওয়া যাক: গভীর সমুদ্র বন্দর (Deep Sea port)- ৫০,০০০ কোটি টাকা, লুধিয়ানা- কলকাতা পণ্য করিডোর (Ludhiana-Kolkata freight Corridor) – ১৫,০০০ কোটি টাকা, হাওড়া-মুম্বাই পণ্য করিডোর (Howrah-Mumbai freight Corridor) – ১০,০০০ কোটি টাকা , ১০০ কিলোমিটার মেট্রো প্রকল্প (১০০ km Metro projects) – ২৫,০০০ কোটি টাকা, এছাড়াও গত বছরের বাজেটে ইস্ট কোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোর এবং ডানকুনি লুধিয়ানা ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোর এর জন্য ২৫,০০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলি অবিলম্বে চালু না করলে আমাদের রাজ্যের মানুষকে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবেই জীবন কাটাতে হবে l কিন্তু আপনার ভুল জমিনীতি ও অর্থনীতির ফাঁসে সব আটকে আছে, বঞ্চিত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক!
শিল্প আনা তো দূরের কথা, ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেই SEZ বন্ধ করলেন। ফলে রফতানিমূলক শিল্পের রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, সফটওয়্যার, IT, ITES এবং বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প। রাজ্যে কোনও চার লেন রাজ্য সড়ক নেই। জিয়াগঞ্জ–আজিমগঞ্জ সেতু ১০ বছর ধরে এক কাঠা জমির জটে আটকে! ২০১১ সালে আপনি ক্ষমতায় আসার পরে যে জায়গাতে ফিনান্সিয়াল হাব হওয়ার কথা হয়েছিল সেখানে গড়ে উঠেছে একটি মোমের মূর্তির মিউজিয়াম, যে মিউজিয়ামে উত্তম কুমারের মূর্তি দেখে অনেকে সংজ্ঞা হারিয়েছে, বলে শোনা যায়।
তার মানে, না শিল্প, না পরিকাঠামো। ঘটা করে অনেক “মৌ” (Memorandum of Understanding) স্বাক্ষরিত হয়েছে কিন্তু রাজ্যের মানুষের কাছে শিল্পের “মোয়া” (Memorandum of Agreement) এখনো অধরা।যে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে UPA-2 কেন্দ্রীয় সরকার ছেড়েছিলেন, সেই FDI তে এই বছর আমাদের দেশ রেকর্ড তৈরি করেছে, শীর্ষে সেই গুজরাট আর আমাদের কপালে জুটেছে শুধুই আলুর চপ!
এর জন্য কি বহিরাগত মোদী দায়ী? FDI তে আপনার অসুবিধা কি? তাহলে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন কেন? FDI এলে আমরা বোম্বে, দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদের মত ভাল মাইনের চাকরি পেলে আপনার ক্ষতিটা কোথায়? করোনার Second Waive এ উত্তরপ্রদেশে প্রতিদিন টেস্টিং এর সংখ্যা গড়ে প্রায় ৩ লাখের বেশি সেখানে পশ্চিমবঙ্গে কোনও ক্রমে ৭০ হাজার! গত এক সপ্তাহে উত্তরপ্রদেশে Active Percentage মানে প্রতি ১০০ জনের টেস্টিং করালে মোটামুটি ২% পজেটিভ ধরা পড়েছে সেখানে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২০-২৫ % এর ঊর্ধ্বে। নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে তড়িঘড়ি লকডাউন ডাকলেন।
ভোটের আগে ৫ টাকায় ডিমভাত দেওয়ার জন্য মা ক্যান্টিন চালু করেছিলেন, এই লকডাউন এর মধ্যে কটা মা ক্যান্টিন রাজ্যে চলছে একটু বলতে পারবেন? জানুয়ারি মাসে পিএম কেয়ার ফান্ড থেকে আমাদের রাজ্যকে পাঁচটি অক্সিজেন প্লান্ট নির্মাণ করার জন্য টাকা দেওয়া হয় – কতগুলি প্লান্ট আপনি নির্মাণ করেছেন একটু জানাবেন? যে কলকাতা একসময় ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরের অষুধ বানিয়ে মানবজাতিকে রক্ষা করেছিল, সেই কলকাতা এই করোনা অতিমারীতে না আবিষ্কার করলো কোন ভ্যাক্সিন বা অসুধ, না উৎপাদন করলো কোনও কিছু ! শুধু অন্যের ছিদ্র খুঁজে বেড়ানো, আর কত অধঃপতন আমরা দেখবো?
আমাদের পার্শ্ববর্তী রাজ্য উত্তরপ্রদেশ বা অসম এ প্রায় ১ লাখের বেশি শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগ করা হয়েছে সরকারি বিদ্যালয়গুলিতে। আমাদের রাজ্যের ছেলেমেয়েদেরকে ন্যায্য চাকরির দাবিতে অনশনে বসে পুলিশের মার খেতে হয়। দুর্নীতিতে যে সীমাহীন নিয়োগ হয়েছে তা মহামান্য হাইকোর্টের রায় দেখলেই বোঝা যায়। আর আপনি শুধুমাত্র সিভিক কর্মচারী নিয়োগ করে নিজের দলের ক্যাডার বাড়িয়ে গেছেন।
গত ১০ বছরের আপনার শাসনকালে পশ্চিমবঙ্গের ঋণের বোঝা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। রাজ্য শিল্পায়নের কোনো পরিকল্পনা নেই ! কেন্দ্রীয় বঞ্চনা তত্ত্বের যে রাজনীতি জ্যোতিবাবু প্রবর্তন করেছিলেন আপনি সেই পথে হেঁটে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত বর্তমানে এক অনন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আপনি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে থাকবেন কিন্তু আমাদের কি হবে?
দেশ যখন দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সামনে দাঁড়িয়ে সেই সময়ে নেহেরুভিয়ান মিশ্র অর্থনীতি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে দেশের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও। মাত্র একবার জোট সরকার চালানোর সুযোগ পেয়ে অটল বিহারি বাজপেয়ি যে কাজ করে গেছিলেন তার জন্য তিনি আজও স্মরণীয়। ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের নাম আজও মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
জ্যোতিবাবু ২৪ বছর রাজত্ব করে গেছেন ঠিকই কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়েও জ্যোতিবাবু কে মানুষ পশ্চিমবঙ্গ ধ্বংসের কারিগর হিসেবে মনে রেখেছে। ভবিষ্যতে মানুষ আপনাকে কি হিসেবে মনে রাখবে সেই দায়িত্ব আপনারই হাতে রয়েছে। দয়া করে কেন্দ্র বিরোধিতার এই সংকীর্ণ রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে আসুন।
তবে সংকীর্ণ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে আর কি হবে? গত ৪৪ বছরের ক্রমাগত মধ্যমেধায় পরিণত হওয়া রাজ্য তো এই রাজনীতিই চায়। ১৯৬৭ তে আমেরিকা হঠাৎ গম পাঠানো বন্ধ করায় মুখ ফস্কে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও সততার প্রতীক প্রফুল্ল সেন মহাশয় বলে ফেলেছিলেন, তোমরা কাঁচকলা খাও। সেদিনের বাঙালী ফেটে পড়েছিল রাগে, প্রফুল্লবাবু হেরে যান। আজ আপনি যখন সাংবাদিক সম্মেলনে আপনার আমলাদের নির্দেশ দিলেন বাঙালীকে যশ সাইক্লোনে মরে যাওয়া মাছ ভেজে খাইয়ে দিতে, বাঙালী মুখ বুজে সেই বাণী মেনে নিল। সত্যেন বোস, জগদীশ বোস, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহার বাঙালীকে আমাদের মত মেরুদন্ডহীন বাঙালীতে পরিণত করতে আপনার কাজ সোজা করে দেওয়ার জন্য আপনার পূর্বসূরি জ্যোতি বাবুকে কিন্তু একবার ধন্যবাদ দিতেই হবে। উনি শুধু টেস্ট টিউব বেবির আবিস্কর্তা ডঃ সুভাষ মুখার্জিকে শ্রেণিশত্রু বিনাশের তালিকায় রাখেননি, পুরো জাতটাকে গণশক্তির যন্তরমন্তর ঘরে ঢুকিয়ে আপনার কাজ সহজ করে দিয়েছে।
ধন্যবাদান্তে
রুদ্র প্রসন্ন ব্যানার্জী, গবেষক আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা।


মুসলমান ভোট একজায়গায় হয়ে এবং বিভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট ত্রিধাবিভক্ত হয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর মতো একগুঁয়ে মধ্যমেধার নেত্রীকে মুখ্যমন্ত্রী করেছে। আপনি উচ্চশিক্ষিত বলে এগুলো বলছেন। ওনার কাজকারবার ৯০% মেধাহীন বাঙালীকে নিয়ে। এদের শিক্ষার মান এতোই নিম্নমানের, এরা মাসে ২০ হাজার টাকা রোজগারেই আত্মম্ভরিতায় ভোগে। বাকী ১০% মেধাবী বাঙালী যার মধ্যে আপনিও আছেন ওঁরা হয় রাজ্যান্তরী, নাহয় রাজ্যকে ভালোবেসে এখানেই পরে আছেন আর গুমরে মরছেন। এতে এই মধ্যমেধার অদূরদর্শী, নীতিহীন, চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক পার্টিজান মহিলার এবং তাঁর শাগরেদদের কিছুই যায় আসে না। মানবসম্পদের গুনগত মানে পশ্চিমবঙ্গ ভারতে অনেক পেছনের সারিতে। আমরা চিরকালই পরিশ্রম বিমুখ, চা আর কফিহাউসের আড্ডায় তুফান তুলে শ্লাঘাবোধ করি। মুখে কথার ফুলঝুরি, পরে মাড়োয়াড়ি মালিকের গদিতে চাপরাসির কাজ করে তৃপ্ত। আর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে আছে আঁতেল কিছু লোক – হাওয়ামোরগের মতো। আগে বাম, এখন তৃনমূলি, সময় এলে হবে দক্ষিণপন্থী। মেরুদণ্ডহীন স্তাবক, ধান্দাবাজ। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে হারানোর কিছু নেই। কিন্তু আমাদের বোধবুদ্ধির যে সীমা তাতে অনাগত কালকে দেখার এবং নিজেদের শোধরাবার কোন প্রয়াস হবে
বলে মনে হয় না। চোরাবালিতে ডুবতে যাওয়া জাতিকে বাঁচানোর জন্য যে নেতৃত্বের দরকার, দেখা নেই সেই দূরদর্শী নেতৃত্বের। কতগুলো নিম্নমেধার লক্ষ্যহীন, অদূরদর্শী, কুকথনে অভ্যস্থ লোক এখন নেতৃত্বে। হিন্দু বাঙালীর এখন দুঃসময়। আর ভয়ংকর ব্যাপারটা হলো, এদের এটা বোঝার মতো বোধবুদ্ধিটাও নেই।