কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর দিনে প্রাচীন রীতি মেনে সুবর্ণরেখা নদী তীরবর্তী এলাকায় পালিত হল আভড়াপুনেই উৎসব

অমরজিৎ দে, আমাদের ভারত, ঝাড়গ্রাম, ৯ অক্টোবর: কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা মানেই আমরা জানি বাড়িতে বাড়িতে ধন দেবীর আরাধনার বিষয়। কিন্তু ধন দেবীর আরাধনার দিনে দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্ত বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিশেষ করে সুবর্ণরেখা নদীর উভয় তীরে পালিত হয় একটি ভিন্ন ধর্মী উৎসব। যা স্থানীয় ভাষায় “আভড়াপুণেই” বা অব্যূঢ়া পূর্ণিমা হিসাবে পরিচিত।

এটি লিঙ্গবৈষম্য হীন লৌকিক উৎসব অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের জন্য। উৎকল সংস্কৃতি বা ওড়িশার রীতি প্রভাব এই উৎসবে লক্ষ্য করা যায়। ওড়িশার “কুমার পূর্ণিমা”র প্রভাব এই “আভড়াপুণেই” উৎসবে পরিলক্ষিত হয়। এই উৎসবে মা, ঠাকুমা, দিদিমারা অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের মঙ্গল কামনা করেন। তাঁদের অবিবাহিত সন্তানরা যাতে ভবিষ্যতে ভালো জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী পায় সেই কামনা করা হয়। এদিন বাড়িতে পিঠে, পায়েস, লুচি, সুজি, ক্ষীর থেকে শুরু করে নানা নিরামিশ পদ তৈরী হয়। উৎসবের রীতি অনুযায়ী সারাদিন অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের “ভুজা” বা মুড়ি খাওয়া বারণ। মুড়ি খেলে এই ব্রত “বুড়ি যাওয়া” বা ডুবে যাওয়ার ভয় থাকে। এদিন স্নান করে নতুন পোশাক বা নিদেন পক্ষে নতুন রেশম(ঘুনশী) কোমরে পরতে হয়। স্নানের পরে মায়েরা অবিবাহিত সন্তানের মঙ্গলকামনায় কপালে চন্দনের মঙ্গল টীকা পরিরে দেন। অনেক অবিবাহিত ছেলেমেয়েরা যাদের বয়স একটু বেশি তারা অনেক ক্ষেত্রে নিজের ভবিষ্যৎ জীবনে কার্তিকের মতো স্বামী বা লক্ষ্মী প্রতিমার মতো স্ত্রী পাওয়ার লক্ষ্যে সরাদিন উপবাস রেখে ব্রত করেন। আবার কারো কারো মতে চাঁদের মতো সুন্দর জীবন সঙ্গী বা জীবনসঙ্গীনি পাওয়া এই ব্রতর লক্ষ্য। পূর্ণিমার চাঁদ উদয় হওয়ার পর এই ব্রত শেষ হয় তুলসী গাছে জল ঢেলে।

ছেলেমেয়েদের মঙ্গল কামনায় অনেক ক্ষেত্রে মা তুলসী গাছে জল ঢালেন। ব্রত শেষে আজকাল তুলসী গাছে জল ঢালার রীতি প্রায় হারিয়ে গেছে। এই উৎসবে ছেলে মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে সমান। এই নিয়ে আগের দিনে মা-ঠাকুমারা অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের আশীর্বাদ করে বলতেন” “পো মেনেকার নিশ বাঢ়ু” অর্থাৎ ছেলেদের গোঁফ বাড়ুক, আর বলতেন “ঝি মেনেকার আইস বাঢ়ু” অর্থাৎ মেয়েদের আয়ু বাড়ুক। আজকের আধুনিক জীবনের ছোঁয়ায় “আভড়াপুণেই” এর জৌলুষ বা আচার অনেকটা ফিকে। এটাই দুঃখের, হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির শেকড়ের সংঙ্গে যুক্ত এই উৎসব। তবও সুবর্ণরেখা নদী তীরবর্তী গ্রাম গুলোতে আজও খোঁজ নিলে কমবেশি প্রতিটি বাড়িতে এই আভড়াপুনেই পালনের রীতি লক্ষ্য করে যাবে। সেই মতো রবিবার গোপীবল্লভপুর-১ এবং ২ নম্বর ব্লকের আমরদা, জুনশোলা সহ একাধিক গ্রামে দেখা গেল উৎসব পালন করতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *