সাথী দাস, পুরুলিয়া, ৩ মে: শিকার উৎসব নয়, অযোধ্যা পাহাড়ে সমাজের বিচার অধিবেশন হবে বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন। সেখানে সারা ভারতের সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষের সমাবেশ ঘটবে। বৈশাখী পূর্ণিমার পর দিনই সাঁওতাল সমাজের বিভিন্ন মামলার নিষ্পত্তি, আইনের সংযোজন এবং বিয়োজন হবে নায়কি বাবাদের উপস্থিতিতে। ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের পক্ষ থেকে তাঁদের অবস্থান এই ভাষাতেই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁদের সম্প্রদায়ের নামে বিভ্রান্তিকর প্রচার ছড়ানোর তীব্র প্রতিবাদ করা হয়।

ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের পক্ষে রতন লাল হাঁসদা বলেন, “আমরা বন্য প্রাণ হত্যার বিরুদ্ধে তো বটেই, গাছ কাটারও বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। আর অযোধ্যা পাহাড়ে শিকার উৎসব নয়, ওই সময় আমাদের অধিবেশন হয়। যেটা আমাদের সম্প্রদায়ের আগামী দিনের আইনি পথ আরও মসৃণ করে। বিচারালয় অযোধ্যা পাহাড়ে হবে এবারও। আমাদের কলুষিত করতে অসাধু মানুষ শিকার করে, উৎসব করে, যা আমাদের পরিপন্থী।” ফি বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন অযোধ্যা পাহাড়জুড়ে পালিত হয় সাঁওতাল সমাজের সেঁদরা। শিকারোৎসব নামে এই পার্বণ অনেক বেশি পরিচিত। গত কয়েক বছর কোভিডের জন্য সার্বিকভাবে না হলেও এবছর বুদ্ধ পূর্ণিমায় বিপুল সংখ্যক আদিবাসী জনজাতির মানুষ পাহাড়ে আসতে পারেন বলে ধারণা বনদফতরের। চিরাচরিত রীতি মেনে বুদ্ধ পূর্ণিমার রাতে অযোধ্যা পাহাড় জুড়ে শিকার হয়ে থাকে। এবছর যাতে তা না হয়, তার জন্য এক সাথে প্রচারে নেমেছে বন দফতর এবং আদিবাসীদের সংগঠন ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল। ইতিমধ্যেই বনদফতরের পক্ষ থেকে পাহাড়জুড়ে লাগাতার শিকারের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে প্রচার। একই সাথে দেওয়া হচ্ছে পোস্টার এবং হ্যান্ড বিল।
অযোধ্যাপাহাড় রেঞ্জ এলাকার বনকর্তারা জানিয়েছেন, এলাকার তরুণদের নিয়েও চালানো হচ্ছে প্রচার। স্থানীয় মানুষজন ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন বন্যপ্রাণ শিকারে তারা আগ্রহী নন। সাঁওতাল সমাজের রীতি মেনে যে ধর্মীয় আচার আচরণ রয়েছে, সেটুকুই শুধু করতে চান তারা।

অন্যদিকে ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের পক্ষে রতন লাল হাঁসদা, অলোক হেমব্রম এবং শ্যাম সুন্দর মাণ্ডি বলেন, সেঁদরা ও শিকার উৎসবকে গুলিয়ে ফেলেন অনান্য সমাজের মানুষ জন। অযোধ্যাপাহাড় সাঁওতাল সমাজের কাছে এক বিরাট তীর্থ ক্ষেত্র। “বাইশাখ “ তিথিতে তারা অযোধ্যাপাহাড়ের গড় থানে জড় হন। এখানে তারা অনুষ্ঠিত করেন “ল বীর বাইসী”, যা হল তাদের বার্ষিক সভা। এখানে সাঁওতাল সমাজের বিভিন্ন আইন কানুন নিয়ে আলোচনা হয়। সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও করা হয় এখানে। শিকার নয়, আসল উদ্দেশ্য হল পাহাড়ের সুতান তাণ্ডিতে অনুষ্ঠিত এই সভা। অতীতে হিংস্র জন্তুদের থেকে বাঁচার জন্য এখানে আসা মানুষ জন নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসতেন। সেই ঐতিহ্য আজও আছে। এবার তাদের সংগঠনের তরফ থেকে প্রচার করা হয়েছে যে, পাহাড়ের জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণ রক্ষা করা তাদের নিজেদের দায়িত্ব। তীর ধনুক নিয়ে শিকার বাস্তবে হয় না। অনেকে মোটা জাল পেতে জন্তু জানোয়ারদের তাড়িয়ে সেই জালে ফেলে শিকার করেন। এবার অযোধ্যায় তাদের পক্ষ থেকে জাল নিয়ে আসা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এপ্রসঙ্গে পুরুলিয়া বন বিভাগের ডিএফও কার্তিকেয়ন এম বলেন, সব পক্ষকে নিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে। ধর্মীয় নিয়ম পালন হোক, তবে বন্যপ্রাণের ক্ষতি যাতে না হয় তার জন্য সজাগ রয়েছে তার দফতর। বিষয়টি নিয়ে তৎপর পুলিশ এবং রেল কর্তৃপক্ষ।

