অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ১৫ এপ্রিল: “অতিমারীর জন্য গত দু’বছর আমরা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অবকাশ পাইনি। এবছর মঞ্চস্থ করব।“ ১ বৈশাখের কথা জানাতে গিয়ে বললেন পূর্ণিয়ার বরিষ্ঠ আইনজীবী মুকুন্দ দাস (নাটুবাবু)।
তিনি জানান, ”১৯৪০ সালে আমার বাবা বিহারের পূর্ণিয়ায় আসেন। আমার জন্ম ১৯৫০-এ। একসময় এই গোটা অঞ্চলে প্রচুর বাঙালি থাকতেন। ৪ আনা অবাঙালি জমিদার আর ১২ আনা বাঙালি। রমরম করে চলত বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল। এখন পড়ুয়া নেই, পাঠ্যবই নেই। বাংলা ভাষার বানিজ্যিক গুরুত্ব নষ্ট হয়ে গেছে। হয়ত শেষের দিন গুনছে পুর্ণিয়ার বাংলা মাধ্যমের স্কুল। ইন্দুভূষণ পাবলিক লাইব্রেরি টিকে আছে স্মৃতির বোঝা নিয়ে।
গত বছর এখানে বাঙালিদের দোকানে হালখাতা মিষ্টিমুখ করানো হয়েছিল। বিহারের বাঙালিরা ধুতি শাড়ি পরার, মিষ্টিমুখ করানো প্রয়োজন মনে করে। পাড়ায় পাড়ায় বাংলা গান বাজনার রেওয়াজ বজায় আছে। এখনও পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে চরণস্পর্শ করে প্রণাম করার ও আশীর্বাদ নেওয়া, সমবয়সীদের মধ্যে নমস্কার বিনিময় আলিঙ্গন করা হয়। বাঙালিরা বাঙলা ভাষায় কথা অবশ্যই বলে। শিশুদের মা-বাবারা বাঙলা ছড়া, আবৃত্তি শেখায়। দুঃখজনক ব্যাপার হলো বাঙলা ভাষায় পড়াশোনার রেওয়াজ উঠে যাচ্ছে।“
পূর্ণিয়ার ভাট্টাবাজার দুর্গাবাড়ি সমিতির প্রাক্তন সভাপতি এবং বিহার বাঙালি সমিতির প্রাক্তন সম্পাদক মুকুন্দবাবুর কথায়, “বিহারে আমরা মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির জন্যে সম্মিলিত প্রয়াসে ব্রতী।
বিহার বাঙালি সমিতি পূর্ণিয়া শাখার উদ্যোগে ২ ও ৩ রা এপ্রিল বইমেলার আয়োজন করা হয়। শহরে এই প্রথম বাঙলা বই মেলার অনুষ্ঠান। শ্রীভবন ও সংলগ্ন ভাট্টা দুর্গাবাড়ি প্রাঙ্গনে সকাল ১০ টা থেকে রাত ৮.৩০ পর্যন্ত হয় এই মেলা। এই উপলক্ষে বইমেলায় বাংলা বই পত্র পত্রিকা বিক্রী ও প্রদর্শন, আলোচনা সভা, আলপনা প্রতিযোগিতা, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। বই মেলায় ছিল প্রবেশ অবাধ। স্থানীয় ও বহিরাগত লেখক, কবি, সাহিত্যিক, মাতৃভাষা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা আসেন বিভিন্ন অঞ্চলথেকে। পূর্ণিয়া বই মেলায় আমরা বাঙলা বইয়ের কাছে যাই। আমরা মাতৃভাষার ভালোবাসায় থাকি।
এই রকম পরিবেশে বাংলা নববর্ষের আগের ঐতিহ্য কী করে বজায় থাকে? এখানে ভট্টাচার্য দুর্গাবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো হয় ১৯১৬-তে। ১০ বছর আয়োজক-সংগঠনের সভাপতি ছিলাম। প্রতি বছর সমারোহের সঙ্গে বাংলা নববর্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। আগে যেভাবে ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করত, বড়রা আশীর্বাদ করতেন, বড়রা অন্য বয়স্কদের হাত জোর করে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতেন, এখন সেই অনুভবের ভিতটা দুর্বল হয়ে গিয়েছে। ভীষণভাবে কমে গিয়েছে বাঙালিত্বের পারস্পরিক টান। তবু বাংলা নববর্ষ এলে একটা অন্যরকম লাগে।“

