পিন্টু কুন্ডু, বালুরঘাট, ১৩ জানুয়ারি: অবহেলা ও বঞ্চনা! টালির জরাজীর্ণ ঘরেই দিন কাটছে ৯২ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রামীর। জোটে না একটা ত্রিপলও, আক্ষেপ বৃদ্ধ দম্পতির। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জ ব্লকের জন্তীহার গ্রামের।
জানা গেছে, ওই গ্রামের ঠাকুরপাড়ার বাসিন্দা শিবতোষ ভট্টাচার্য। বয়স বর্তমানে ৯২ বছর। স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্যকে নিয়ে ভাঙ্গা টালির জরাজীর্ণ ঘরেই দিনযাপন। এলাকায় দু চারটি বাড়িতে পুজো অর্চনা করেই দিন গুজরান ওই বৃদ্ধ দম্পতির। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে যাদের দিন চলাই দায়, তাদের কাছে পাকা ঘর যেন কিছুটা দিবা স্বপ্ন। কিন্তু দেশকে স্বাধীন করার কারিগরদের কেন এমন দুর্দশা? যদিও সে প্রশ্নের উত্তর কোথাও মেলেনি। বৃদ্ধ স্বাধীনতা সংগ্রামী অবশ্য জানিয়েছেন, সরকারি কর্মচারিরা সাধারণ মানুষের কথা শোনে না। কোনো না কোনো দলের লোকেদের দ্বারাই তারা পরিচালিত হয়। আর সেকারণেই আজ তাদের এমন অবস্থা।
বর্ধমানের বাসিন্দা শিবতোষ ভট্টাচার্য মাত্র ১৪ বছর বয়সেই নিজের এলাকা ছেড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। স্বদেশী আন্দোলন সফল করতে বাড়ি বাড়ি গোপনে চিঠি পৌঁছে দেওয়ায় মূল কাজ ছিল বৃদ্ধ শিবতোষের। দক্ষিণ দিনাজপুরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে বেড়িয়ে দেশের জন্য নিজের যৌবনকে উৎসর্গ করেছিলেন শিবতোষ। দেশ স্বাধীন হবার পর একাধিকবার স্বাধীনতা সংগ্রামীর পরিচয় নেবার জন্য তার কাছে সরকারের তরফে চিঠি এলেও বারংবারই তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। ভেবেছিলেন অতি সহজ ভাবেই নিজের জীবন কাটাবেন। কিন্তু এতটা দুর্দশায় যে পড়বেন তা কখনো ভাবতেই পারেননি ওই বৃদ্ধ দম্পতি।
কুমারগঞ্জের জন্তীহার গ্রামের ঠাকুরপাড়ায় গেলেই দেখা যাবে ভাঙ্গা একটি মাটির ঘর। উপরে কিছু জায়গায় টালি ও কিছু জায়গায় ছেঁড়া ত্রিপল ঝুলছে। বৃষ্টির জল আটকাতে ঘরের ভিতরে ঝুলছে বেশকিছু হাঁড়ি। শুধু তাই নয়, মাটির ঘরের দেওয়ালে এতটাই ফাটলে ভরা যে, যে কোনো সময়েই তা ভেঙ্গে পড়তে পারে। সেই হতদরিদ্র স্বাধীনতা সংগ্রামীর ভাগ্যে আজও জোটেনি একটি সরকারি ত্রিপল। বার্ধক্য ভাতা থেকে পুরোহিত ভাতা, সরকারি রেশন, আবাস যোজনা কোনো কিছুই যেন ছুঁয়ে যায়নি ওই পরিবারটিতে। কারণ জানতে চাইতেই বৃদ্ধর দু’চোখ বেয়ে ঝড়ে পড়লো জল। বললেন, দু একবার পাঁচশো টাকা দিলেও তা বন্ধ করে দিয়েছে। তাই আশপাশে পুজো অর্চনা করেই দিন কাটে তাদের। দেশের সেবা করে জীবন বিপন্ন করা বৃদ্ধর পরিবারের দিকে কেন কেউ আজো ফিরে
তাকায়নি? সে প্রশ্নের উত্তর যেন আজ অনেকের কাছেই অজানা। যদিও বৃদ্ধ দম্পতির জীবনের শেষ আর্জি প্রশাসন যদি মুখ ফিরে তাকায় তবে মারা যাবার আগে একটা পাকা বাড়ি দেখে যেতে পারেন।
শিবতোষ ভট্টাচার্য বলেন, তার জন্ম বর্ধমানে। কিন্তু স্বদেশী আন্দোলন করতে গিয়েই এখানে চলে এসেছিলেন। মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকে গোপনে চিঠি বিলি করেছেন এ জেলায়। জেলার বহু অজানা রাস্তা তার চেনা রয়েছে। জীবনের শেষ লগ্নে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র যেন একটা পাকা ঘর দেখে যেতে পারেন এটাই তার আক্ষেপ।
স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য বলেন, একটা পাকা ঘরে জীবনের শেষটা কাটাতে চান।

