জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৭ জুলাই: একা করোনায় রক্ষা নেই, তার ওপর নাইরোবি ফ্লাই দোসর। পাহাড়ি এলাকায়ও যে হারে নাইরোবি ফ্লাইয়ের ‘জ্বালা বাড়ছে’, তাতে অচিরেই আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সমতলে। বর্তমানে যে পরিবেশ ও আবহাওয়া রয়েছে, তাতে ওই বিষাক্ত মাছির বংশবিস্তারের পক্ষে যথেষ্ট অনুকূল। তার ওপর আবার নতুন করোনার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। আর এই দুইয়ের দাপটে আতঙ্কে সিটিয়ে রাজ্যবাসী। আতঙ্কিত না হয়ে, বরং সতর্ক থাকায় জরুরি বলে পরামর্শ দিয়েছন চিকিৎসক ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি সিকিমে নাইরোবি ফ্লাইয়ের দাপটে কাহিল বেশ কিছু পড়ুয়া। এমনকি এরাজ্যের উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলাতেও আক্রান্তের খোঁজ মিলেছে। যেমন কার্শিয়ংয়ের পাশাপাশি শিলিগুড়িতেও আনাগোনা করছে নাইরোবি ফ্লাই।

প্রশ্ন, কী এই নাইরোবি ফ্লাই? জানা গেছে, মূলত পূর্ব আফ্রিকায় উৎপত্তি নাইরোবি ফ্লাইয়ের। স্থানীয়ভাবে তাকে ‘অ্যাসিড মাছি’ বলা হচ্ছে। নাইরোবিতে এই পোকার প্রতিপত্তি বেশি। এগুলি আকারে প্রায় এক সেন্টিমিটার লম্বা হয়, অর্থাৎ সাধারণ মশা-মাছির তুলনায় বেশ বড়। গুবরে পোকা প্রজাতির। এই পতঙ্গের দুই প্রজাতি রয়েছে। একটি প্রজাতির রং হয় কমলা, অন্যটির কালো। বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় দ্রুত তাদের বংশবিস্তার ঘটে। এই নাইরোবি ফ্লাই কামড়ায় না, হুলও ফোটায় না। তবে গায়ের উপর বসলে ত্বকে জ্বালা ধরায়। ত্বকের উপর নাইরোবি পতঙ্গ বসলে ফ্যাকাসে দাগও হয়ে যায়। তবে এক-দু’সপ্তাহের মধ্যে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায় ত্বক।
এটা মূলত বর্ষার সময় পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা যায়। এ বছর সেটাই দেখা গিয়েছে সিকিম, দার্জিলিং-সহ বেশ কিছু অঞ্চলে। সম্প্রতি এই মাছির প্রকোপ খবর চাউর হতেই আতঙ্কে সিটিয়ে অনেকেই।
প্রশ্ন, কী ক্ষতি করে? পোকাটি ত্বকে বসলে তার শরীর থেকে কিছু রাসায়নিক উপাদান নির্গত হয়। ওই রস ত্বকের ক্ষতি হয়। পতঙ্গবিদরা জানিয়েছেন, নাইরোবি ফ্লাই যখন গায়ে বসে, তাদের শরীরে থাকা অ্যাসিড জাতীয় রস বা উপাদান ত্বকের ওপর বসে যায়। তাতেই জ্বালা করে ত্বক। ত্বকের ওপর লালচে দাগ ও ফুঁসকুড়ি হয়। এরপর সেখান থেকে শরীরের অন্যান্য জায়গাতেও ছড়িয়ে পড়ে ক্ষত, জ্বালা অনুভূত হয়। এই পোকা আলোয় থাকতে পছন্দ করে। তাই সন্ধ্যা হলে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেওয়াই ভাল। পাশাপাশি নাইরোবি ফ্লাই- এর হাত থেকে বাঁচতে মশারি টাঙানো দরকার।
বরিষ্ঠ পরিবেশ বিজ্ঞানী ডঃ আশিস হাজরা বলেন, “এটি পতঙ্গের কলেপেটেরা (coleoptera) বা beetle এর অন্তর্গত। স্ট্যাফিলিন্ডে পরিবারের অন্তর্ভুক্ত( Staphylinidae family)। এরা কামড়ায় বা হুল ফোঁটায় না। কিন্তু আমাদের শরীরের উপরে ঘসে দিলে জ্বালা করে। কখনও ছোট ছোট ফোস্কা দেখা দেয়। বর্ষায় বেশি দেখা যায়। জঙ্গলে বা বাড়ির গাছপালায় দেখা যায়। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।”
পরিবেশ কর্মী ইশমাতারা খাতুন জানান, “বর্ষাকালে মশা মাছির পাশাপাশি নানান ধরনের কিটপতঙ্গের প্রাদুর্ভাব ঘটে। অযথা আতঙ্কিত না হয়ে বরং সতর্ক থাকা জরুরি। বাড়ির আশপাশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা। বদ্ধ জলাশয় না রাখা। নিকাশী নালা পরিস্কার রাখা দরকার। বাড়ির চারপাশে ব্লিচিং বা জীবানুনাশক ছড়ানো দরকার। তাহলে এধরনের পোকা, মশা, মাছির উৎপত্তি ততটা হবে না। আলোতে এধরনের পোকা বাড়িতে ঢোকে। তাই সন্ধের আগে অন্তত জানলা-দরজা বন্ধ রাখালে এধরনের পোকা ঘরে ঢুকবে না। রাতে মশারি টাঙিয়ে শোওয়া জরুরি। তাতে মশা মাছি ও পোকার কামড় থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।”
পশ্চিম বর্ধমান জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শেখ মহঃ ইউনুস জানান, “জেলায় এখনও পর্যন্ত ওই মাছির প্রকোপ ও আক্রান্তের কোনো খবর নেই। অতীতেও এই ধরনের পোকা প্রদুর্ভাব ঘটেছে। হয়তো সেভাবে লক্ষ্য করা যায়নি। বর্ষাকালে এধরনের মাছি দেখা যায়। ইদানীং যেভাবে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, তাতে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। মারাত্মক কিছু নয়। সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যদি পোকা গায়ে বসেছে বুঝতে পারলে ফু দিয়ে উড়িয়ে দিতে হবে। মারার চেষ্টা করলে ক্ষতি হতে পারে। রাতে মশারি টাঙিয়ে শোওয়া ভালো।”

