স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া, ৭ মার্চ:
ক্লেফট রোগ একটা জন্মগত ব্যাধি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপুষ্টিজনিত মায়েদের সন্তানরা এই রোগের স্বীকার হয়। নদিয়া জেলায় প্রতি বছরে ২০০ -২৫০ বাচ্চা এই ক্লেফট রোগ নিয়ে জন্মায়। নদিয়ার কৃষ্ণনগরের হিরামণি মেমোরিয়াল হাসপাতালে এই রোগীদের বিনা খরচে চিকিৎসা করা হয়। প্রায় তিন বছর ধরে এই চিকিৎসা করানো হয়।

কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতালের প্রাক্তন মেডিকেল অফিসার সুধাংশু শেখর জানা বলেন, “হীরামণি হাসপাতালে গত তিন বছরে প্রতি মাসে প্রায় ২৪/২৫ টা করে অপারেশন করা হয়। যাতে করে গত তিন বছরে ৭৩০ জনের অপারেশন করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। এই অপারেশন একবারে হয় না, দু থেকে তিনবার রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে তবেই অপারেশন হয়। এই রোগে মূলত রোগীরা নাকি সুরে কথা বলে, খেতে গেলে খাবার নাক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঠিক সময় অপারেশন না হলে ভবিষ্যতে কথা বলতে পারে না। এই রোগের চিকিৎসা জন্মের পরে হওয়াই বাঞ্চনীয়। যদি বয়স কালে এই রোগের চিকিৎসা হয় তাহলে সেটা পুরোপুরি সুস্থ হয় না, খনখনে ভাবটা থেকেই যায়। এটা অপুষ্টি জনিত রোগ। এই রোগ জিনগত ভাবে আসে না। সংক্রামক নয়। এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল”।

কিন্তু হিরামণি হসপিটাল তাদের নিজের উদ্যোগে বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান লাইট হাউস ক্যান্টন, তাদের সিএসআর প্ল্যাটফর্ম স্প্রেডি স্মাইলসের মাধ্যমে মিশন স্মাইল এর সঙ্গে অংশীদার হয়ে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে একটি কাঠামোবদ্ধ ক্লেফট লিপ ও ক্লেফট প্যালেট সার্জারি কর্মসূচি বাস্তবায়ণ করেছে। হিরামণি মেমোরিয়াল হাসপাতাল কৃষ্ণনগরে একটি মিশন মডেলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত কর্মসূচির জন্য রোগী স্ক্রিনিং শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ এবং সার্জারি শুরু হয় পয়লা মার্চ ২০২৬ থেকে। এই মিশনের সময়কালে প্রায় ৫০টি বিনামূল্যের ক্লেফট সার্জারি সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
কৃষ্ণনগর মিশনটি একটি বৃহত্তম কর্মসূচির অংশ। যার আওতায় মার্চ ২০২৬- এর মধ্যে হায়দ্রাবাদ পশ্চিমবঙ্গে মোট ১০০টি বিনামূল্যের সংশোধন মূলক ক্লেফট সার্জারি সম্পন্ন করা হবে। এই মিশনের মাধ্যমে উপকারভোগীদের কোনো খরচ ছাড়াই চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হবে।
সার্জারি গুলো বহুবিধ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের দ্বারা সম্পন্ন করা হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক সার্জারি, ওরাল ও ম্যাক্সি লোফেসিয়াল সার্জারি, অ্যানেস্থিওলজি, পেডিয়াট্রিক্স, ডেন্টিস্ট্রি এবং নার্সিং- এর বিশেষজ্ঞরা। এই কর্মসূচির আওতায় সহায়তা প্রাপ্ত সকল রোগী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন। যার মধ্যে রয়েছে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, অপারেশনের পূর্ববর্তী পরীক্ষা এবং অপারেশনের পরবর্তী ফলো আপ। প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক পরামর্শ এবং রোগীদের পুষ্টিগত দিক নির্দেশ করা হয়।

কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত মিশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে লাইট হাউস ক্যান্টনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর চিপ মার্কেটিং অফিসার হিমাংশু বড়ুয়া বলেন, “এই কর্মসূচির প্রতিটি সার্জারি কেবল একটি চিকিৎসা প্রক্রিয়া নয়, বরং তাদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কৃষ্ণনগরে অপারেশনের নব উপকার ভোগীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে আমি আমাদের কাজের প্রভাব নিজের চোখে দেখতে পেয়েছি। তাদের খেতে এবং কথা বলতে দেখে আমি গভীরভাবে অভিভূত হয়েছি। যেভাবে তারা সবসময় স্বপ্ন দেখেছিল। মিশন স্মাইল- এর সঙ্গে আমাদের অংশীদারিত্ব এই অঙ্গীকারের প্রতিফলন, যে আর্থিক পরিস্থিতি যেন কখনোই কাউকে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না করে। লাইট হাউস ক্যান্টনে আমরা বিশ্বাস করি, প্রকৃত সমৃদ্ধি কেবল আর্থিক সাফল্যে নয়, বরং আমরা যেসব জীবন পুনর্গঠনে সহায়তা করি সেখানেই তার প্রকৃত মূল্য”।

ড: মণীশ মুকুল ঘোষ বলেন, “হাসপাতালের সকল কর্মীর পূর্ণ নিষ্ঠার জন্য আমি তাদের অনেক ধন্যবাদ জানাই। একটি ছোট জিনিস আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, এটি শুধু নদিয়ার কৃষ্ণনগর নয়, আমাদের সারা দেশ থেকে সার্জন আছেন। তাই এখন আমরা ডিব্রুগড়, ব্যাঙ্গালোর থেকে সার্জনদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যারা এখানে অস্ত্রোপচার শিখতে আসছেন।
শুধু তাই নয়, আমরা দেশের প্রতিটি অংশ থেকে, গুজরাট থেকে ত্রিপুরা, চেন্নাই থেকে ঋষিকেশ পর্যন্ত সার্জনদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এছাড়া বিদেশ থেকে, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশ থেকেও অনেক সার্জন এবং অ্যানেস্থেসিস্টকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তাই এটি কেবল এমন একটি জায়গা নয় যেখানে আমরা শুধুমাত্র অস্ত্রোপচার করি, এটি এমন একটি জায়গা যেখানে আমরা সকল বিশেষজ্ঞ, নার্স, অপারেশন থিয়েটার কর্মীদেরও প্রশিক্ষণ দিই।
তাই এই ক্ষেত্রে মাত্র তিন বছরের অপারেশনে আমরা একটি বিশাল সফলতা অর্জন করতে পেরেছি। এবং এটিকে সফল করার জন্য সহযোগিতার জন্য আমি সকলকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।”

