ছবি: ওপরে, বাগানবাড়িটি ছিল বারীন ঘোষদের পৈত্রিক সম্পত্তি। ঋণ— অরবিন্দ ইন্সটিট্যুট।
অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ৩ মে: “মাণিকতলায় ধরা পড়ে বোমার কারখানা ইংরেজ কাঁপে ভয়ে কাঁপে রাঙা বুকখানা।
ইংরেজ দালাল যত মুখ বুজে থাকে
কথা নাহি বলে কেউ, দরজা বন্ধ রাখে।”
১৯০৮ সালে, মানে ১১৪ বছর আগে মানিকতলায় মুরারীপুকুরে ধরা পড়ে বোমার কারখানা। সে বছর আজকের দিনে, মানে ৩ মে সেখান থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে ঋষি অরবিন্দ-সহ ১৪ জন বিপ্লবীকে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই ঘটনা তুমুল আলোড়ণ জাগিয়েছিল।
‘জ্বলদর্চি’ লিখছে (১৮-৮-২০২০), “ভোররাত থেকে ব্রিটিশ পুলিশের পাতা জালে একের পর এক ধরা পড়তে শুরু করেছে স্বদেশী আন্দোলনের প্রধান প্রধান কুশীলবরা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নড়িয়ে দেওয়া নেতারা। ৩২ নং মুরারীপুকুর রোডের বাগানবাড়ি সহ কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্বদেশীদের গোপন আস্তানাগুলি পুলিশী তান্ডবে লন্ডভন্ড। ব্যাপক খানাতল্লাশীর সুবাদে চিঠিপত্র, পত্র-পত্রিকা, বোমা ও বোমা তৈরির সাজসরঞ্জাম এবং বহু রাজদ্রোহকর কাগজপত্র – যেখানে যা কিছু ছিল, নির্বিচারে সেগুলি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। হেটো-কবির দল তাৎক্ষণিক ছড়া ছাপিয়ে ট্যাবলয়েড আকারে বিলি করছেন পথচলতি মানুষজনের কাছে।“
আজ স্থানীয় ক’জন মনে রেখেছেন ওই ঘটনা, কতটা বদলে গিয়েছে সেই এলাকা তা জানতে গিয়েছিলাম সেখানে। তার আগে আসি মূল ঘটনায়। ১৯০২ সাল। বারীন্দ্র কুমার ঘোষ লন্ডন থেকে কলকাতায় আসেন। কলকাতার এসে তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহের আগুন ছড়াতে থাকেন। কিন্তু বাঙালি ভদ্রলোকরা মোটেই সাড়া দেয়নি। বিফল হয়ে তিনি বরোদায় বড়দাদা অরবিন্দ ঘোষের কাছে যান। বারীন্দ্র বরোদায় বসে বুঝলেন, রাজনীতিকে ধর্মের সঙ্গে একীভূত না করলে কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনে কাজ হবে না। এজন্য তিনি গীতা পাঠের সঙ্গে রাজনীতির পাঠ দেবার উদ্দেশ্যে অনুশীলন সমিতির পরিকল্পনা করেন। উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে থাকেন।

ছবি: বিপ্লবী বারীন ঘোষ। ঋণ— অরবিন্দ ইন্সটিট্যুট।
কলকাতায় আসার পর অরবিন্দের অনুপ্রেরণায় ও তাঁর ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষের নেতৃত্বে ৩২ নম্বর মুরারীপুকুরে তৈরি হয় সশস্ত্র বিপ্লবী অনুশীলন সমিতি (দল)। ৩২ নম্বর মুরারীপুকুর রোডের বাগানবাড়িটি ছিল বারীন ঘোষদের পৈত্রিক সম্পত্তি। শিয়ালদহ থেকে দমদম যাওয়ার পথে রেললাইনের বাঁদিকে কয়েকশ বিঘা জলাজঙ্গল। সেখানেই ছিল সেই বাগানবাড়ি। সশস্ত্র বিপ্লবী নেতা বারীন ঘোষ দলের আখড়া গড়েছিলেন সেখানে। এর মাঝখানে ছিল ছোট ধরনের একটি পাকাবাড়ি। বাড়িটির চারদিকে ছিল গাছপালা।

ছবি: অধুনালুপ্ত ৩২ নং মুরারীপুকুর রোড। ঋণ— অরবিন্দ ইন্সটিট্যুট।
দাদা অরবিন্দ ঘোষ এবং অপর দুই ভাই মনোমোহন ঘোষ ও বিনয় ঘোষ বাগানবাড়িটিতে থাকতেন। অরবিন্দ ঘোষ সে সময় ছিলেন বিপ্লবীদের শ্রদ্ধেয় নেতা ও স্বদেশি কাগজ ‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করেই বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, উপেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, হেমচন্দ্র ঘোষ, অবিনাশ ভট্টাচার্য’র মতো বিপ্লবী নেতৃত্ব দলের নীতি নির্ধারণ করতেন।
৩২ নম্বর মুরারীপুকুরের বাগানবাড়িটি ক্রমে হয়ে ওঠে সশস্ত্র বিপ্লবীদের মূল কেন্দ্র। মানিকতলায় বোমা তৈরির কেন্দ্র গড়ার চেষ্টা চলল। বিপ্লবের এই গোপন আয়োজন আস্তে আস্তে মেদিনীপুর, চন্দননগর, কৃষ্ণনগর, শ্রীহট্ট, বগুড়া, রংপুর, বরিশাল, ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়ল। অনুশীলন সমিতির শক্তিশালী কেন্দ্র গড়ে উঠলো ঢাকায়।
স্বাধীনতা আন্দোলনে এই ৩২ মুরারীপুকুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। বারাকপুরে গান্ধী সংগ্রহশালায় আগেই ওটির ছবি আছে। আলিপুর বোমার মামলাটি মানিকতলা ষড়যন্ত্র নামে ইতিহাসের পাতায় পরিচিত৷ ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল দুই যুবক ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকী বিহারের মুজফ্ফরপুরে লেফটেনান্ট গর্ভনর অ্যান্ড্রু ফ্রেজারকে খুনের পরিকল্পনা নিয়ে অন্ধকারের জন্য ব্যর্থ হন৷ ইংরেজ সরকারের পুলিশ মরিয়া হয়ে ওঠে এই ঘটনায়৷
পুলিশ ৩২ নং মুরারীপুকুর রোডের বাগানবাড়ি থেকে বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, ইন্দুভূষণ রায়, শিশির ঘোষ, পরেশ মৌলিক, বিজয় নাগ, পূর্ণচন্দ্র সেন, বিভূতিভূষণ সরকার, শচীন সেন, কুঞ্জলাল সাহা প্রমুখকে ধরে এবং ৪৮ নং গ্রে স্ট্রিটের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় স্বয়ং অরবিন্দকে। অরবিন্দ তখন স্ত্রী মৃণালিনী সহ দোতলায় ছোট্ট আগোছালো অপরিসর একটি ঘরের মেঝেতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পাশের ঘরে সরোজিনী, অরবিন্দের বোন। রাত তখনও বোধহয় ঘন্টাদুই বাকি। সদর দরজায় ঘা পড়লো এবং সেই সংগে হুংকার : “দরজা খুলুন…শুনতে পাচ্ছেন? দরজা খুলুন…খুলুন বলছি…না হলে কিন্তু ভেঙ্গে ঢুকবো…”। অরবিন্দ ঘোষ ও তাঁর ভাই বারীন্দ্র কুমার ঘোষ -সহ মোট ৩৬ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মামলা দায়ের করা হয়৷
পরবর্তীকালে ওই মুরারীপুকুর রোডের কাছে তৈরি হয়েছে বিধাননগর রোড স্টেশন। এর দক্ষিণ অংশ দিয়ে বেড়িয়ে ৩২ নং মুরারীপুকুর রোডে এলাম। সেই বাগানবাড়ির অস্তিত্ব আর নেই। গোটা অংশটি দখলদারদের কবলে। বসতবাড়ি, ছোট কারখানা, দোকান— সংখ্যায় কত কে জানে? প্রতিটির ঠিকানা ৩২/ /। এই অঞ্চলের সঙ্গে বাগমারি রোডের একটা অংশ এসে মিশেছে।

ছবি: মুরারীপুকুরে ঋষি অরবিন্দের নামে ক্লাব।
অপরিসর রাস্তা, লেন-বাইলেন— যেন এক অন্য কলকাতা। জলেশ্বর মন্দির সংলগ্ন রাস্তা এত সরু, পাশাপাশি দু’জন যেতে পারবেন না। মন্দিরের উল্টোদিকে তৈরি হচ্ছে চারতলা বাড়ি। পুরসভার স্বীকৃত নকশা? এসব প্রশ্ন করবেন না। ২০১৭ সালে তৎকালীন মন্ত্রী সাধন পান্ডে এসে সংস্কারলব্ধ ওই মন্দিরের উদ্বোধন করেন। পাথরের ফলকে লেখা আছে সে কথা।

ছবি: শিশুউদ্যান।
১৯০৮ সালের ২ মে থেকে ১৯১০ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলা আলিপুর বোমা মামলায় ২০৬ জন সাক্ষ্য দেন৷ ১৫৭৫টি নথি জমা পড়ে৷ পুলিশের প্রাক্তন ডিজি তথা প্রাক্তন আইপিএস অফিসার অমিয় সামন্তর লেখা ‘আলিপুর বম্ব ট্রায়াল , ১৯০৮ -১৯১০ ’ বইটি প্রকাশিত হয় ২০১৭-তে৷ তিনি লিখেছেন , হাইকোর্টের বিচারপতি ক্যানড্রফ শুধুমাত্র ক্ষুদিরামের স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করেই দেড় পাতার একটি নির্দেশে ফাঁসির হুকুম দেন৷ পাশাপাশি তদন্তে যে ৩৬ জনকে ধরা হয় , তাঁদের বিরুদ্ধে ১২১, ১২১এ , ১২২-সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হলেও পরবর্তী সময় ইংরেজ সরকার ১২১ ধারার (যেখানে শাস্তি হিসেবে ফাঁসি হতে পারে) অনুমোদন দেয়নি৷ কিন্তু দায়রা বিচারক বার্লে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই ধারাটি যুক্ত করে দেন৷ সেই ঘটনার প্রতিবাদ করে আদালতে জোরালো সওয়াল করেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ৷ মূলত তাঁর সওয়ালের জেরে মাত্র ১৪ জনের শাস্তির আদেশ হয়৷
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ অবাঙালি। একটা অংশ বাংলাদেশ অথবা পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা। অনেককে প্রশ্ন করলাম। তাঁদের অধিকাংশেরই এসব বা আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের কথা অজানা। মুরারীপুকুর রোডে নামকরণ হয়েছে বিপ্লবী বারীণ ঘোষ সরণী। কিছু স্মৃতি ধরা আছে এভাবেই নামকরণের মাধ্যমে। ৩৯/১ বিপ্লবী বারীণ ঘোষ সরণীতে বারীণ ঘোষের নামাঙ্কিত স্পোর্টিং ক্লাব। ঠিক পাশেই ডমরু বাবার মন্দির। অরবিন্দর স্মৃতিবিজরিত দুটি ক্লাবঘর। বিপ্লবী কানাইলাল দত্তর নামে এক চিলতে শিশুউদ্যান। আর আছে ‘বোমার মাঠ’।

ছবি: শ্রীঅরবিন্দর স্মরণে সেবাকেন্দ্র।
তবে এই বোমার মাঠের সঙ্গে কিন্তু বিপ্লবীদের বা বোমা মামলার কোনও সম্পর্ক নেই। এটা আসল ‘বোমার মাঠ’ নয়। এ কথা জানলাম বিমল বারুই নামে স্থানীয় একজনের কাছে। অনেকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাঁর দেখা পেলাম। ভরদুপুরে একটা সরু গলির সিঁড়িতে বসে আছেন। হাতে একটা বাংলা দৈনিক। একমুখ চুলদারি। মলিন বসন। ফলস সিলিংয়ের কাজ করেন। জন্ম নারায়ণগঞ্জে। ১৯৬৪ সালে চলে আসেন এখানে।
সিঁড়ির নিচের ধাপে বিমলবাবুর পায়ের কাছে বসে শুনতে লাগলাম— বললেন, “বিপ্লবীরা এখানে বোমার অনুশীলন করতেন বলে গোটা জায়গাটাকে ‘বোমার মাঠ’ বলত। ওই মাঠ, সংলগ্ন বিরাট পুকুর সব মিলিয়ে একশো বিঘার ওপর জমি দখল হয়ে গিয়েছে। কয়েক দশক আগে সব ছোট ছোট অস্থায়ী ঘর করে দখলদাররা। আর এখন বাড়িগুলো কীরকম হয়েছে! এই তল্লাটে একটা বড় কারখানা ছিল। মালকিনের নাম ছিল যতদূর মনে আছে স্নেহলতা দত্ত। তাঁর ১০-১২ বিঘা জমির একাংশে ছিল প্রায় ৪০ ফুট উঁচু বিরাট কারখানা। পরিত্যক্ত কারখানার যন্ত্র, ছাউনি সব চুরি হয়ে যায়। জমি, অত বড় পুকুর তাও জঞ্জাল-আবর্জনা ফেলে দখল হয়ে যায়। এখন এই অল্প একটু ফাঁকা জায়গা আছে। সেটাকেই বলে ‘বোমার মাঠ’। এভাবেই মুরারীপুকুরের জজবাবু, গীতা নন্দী, এমএল রায় প্রমুখ জমিদারদের ভূ–সম্পত্তি সব দখল হয়ে গিয়েছে।
মুরারীপুকুরে বিপ্লবীদের বোমার কাহিনী ভুলে গিয়েছে মুরারীপুকুর। তার অস্তিত্ব কেবল সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায়।

