অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ১৯ অক্টোবর : ২০২১-এর ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের (জেএম সেন) শতবর্ষী প্রাচীন বাড়ি ভাঙার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় হাইকোর্ট। বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই আদেশ দেওয়া হয়।
এ কথা জানিয়ে বাংলাদেশের ‘সিভয়েস ২৪’ লিখেছে, “মূলত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন জোরদার করার ক্ষেত্রে, স্বাধীনতা সংগ্রামী-স্বাধীনতাকামী জনসাধারণের মত-বিনিময়ের মিলনস্থান এবং শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে জেএম সেন হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। তৎকালীন ব্যারিস্টার ও কলকাতার মেয়র এবং জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট যতীন্দ্রমোহন সেন তাঁর পিতা যাত্রামোহন সেনের, যিনি পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন, স্মৃতিতে এই মিলনায়তনের নামকরণ হয়।
১৮৭৫ সালে, যাত্রামোহন সেন চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েসনের নামে একটি সংগঠন এবং ট্রাস্ট্রি বোর্ড গঠন করেন। এরপর কিছু বছর পর ১৯১৪ সালে মিলনায়তনের জন্য জমি এবং তিন হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা দেন। দু-বছর পর ১৯১৬ সালের ১৯ নভেম্বর শরৎচন্দ্র রায়বাহাদুর সেখানে জেএম সেন হল নামে প্রথম টাউন হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রায়বাহাদুর নবীনচন্দ্র দত্ত এই হলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
এই হলে একটি ক্লাব রয়েছে। এছাড়াও আছে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্য সেন, উপমহাদেশ খ্যাত রাজনীতিবিদ যতীন্দ্রমোহন সেন, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ মহিমচন্দ্র দাশ, চট্টগ্রামের নারী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা নেলি সেনগুপ্তার আবক্ষ মূর্তি।↓
কী অবস্থা ঐতিহ্যের এই স্থানটির? বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (যুদ্ধ) ট্রাইব্যুনালের সভাপতি তথা বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান পরিষদের সাধারণ সম্পাদক, আইনজীবী রাণা দাশগুপ্ত ১৭ অক্টোবর বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রাম স্মৃতি সংস্থার এক সমাবেশে বিশদে জানালেন তাঁর অভিজ্ঞতা।
‘সিভয়েস ২৪’ লিখেছে, “আদালতের আদেশে ভবনটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে কেন ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সচিবসহ মামলার বিবাদীদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এর আগে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মাসুদ আলম চৌধুরী বাদী হয়ে যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি (শিশুবাগ স্কুল ভবন) ভাঙার ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন।
রিটে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়। প্রকাশিত সেসব প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ এলাকার শিশুবাগ স্কুলের ভবন ভাঙা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ৪ জানুয়ারি দুপুরে ভবন ভাঙাকালীন দুই পক্ষকে মুখোমুখি অবস্থান নিতে দেখা যায়। পরে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত ও কাউন্সিলর শৈবাল দাস সুমনসহ বিভিন্ন জনের হস্তক্ষেপে ভবন ভাঙা স্থগিত রাখা হয়। যদিও এর আগেই স্কুলের বেঞ্চ-টেবিলসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি বের করে ভবনের ওপরের একাংশ বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়।“
২০২১-এর ২৫ জানুয়ারি আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, “অবিভক্ত ভারতের কংগ্রেস নেতা যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের চট্টগ্রামের বাড়িটি অধিগ্রহণ করল বাংলাদেশ সরকার। ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতার লড়াই এবং মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর নির্মাণ হবে এখানে। কংগ্রেস নেতা এবং যশস্বী আইনজীবী যাত্রামোহন সেনগুপ্ত চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে এই বাড়িটি করেছিলেন। যতীন্দ্রমোহন তাঁর পুত্র। যতীন্দ্রমোহনের স্ত্রী বিশিষ্ট কংগ্রেস নেত্রী নেলী সেনগুপ্ত ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এই বাড়িতে আসাযাওয়া করেছেন। তার পরে সেটি ‘শত্রু সম্পত্তি’র তালিকায় পড়ে। বেশ কিছু পরিবার জবরদখল করে বাড়িটিতে বসবাস করতে থাকেন। ছোটদের একটি বেসরকারি স্কুলও শুরু হয়েছিল বাড়িটিতে। কয়েক সপ্তাহ আগে এক ব্যবসায়ী বুলডোজার এনে বাড়িটি ভাঙতে শুরু করায় হইচই বেঁধে যায়। আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্তের নেতৃত্বে এলাকার মানুষ প্রতিরোধে নামেন। আদালত বাড়ি ভাঙায় স্থগিতাদেশ জারি করায় ওই ব্যবসায়ী দলবল নিয়ে ফিরে যান। তত ক্ষণে বাড়ির সামনের অনেকটা অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে।“
রানাবাবুর আমাদের জানালেন, “বিশাল জমির ওপর ওই বাড়ি। কত ঐতিহ্য! কত নামী লোকজন নানা সময় এসেছেন! সেটা ভেঙে ফেলার খবর পেয়ে লুঙ্গি পড়া অবস্থায় ২-১টি ছেলে নিয়ে ছুটে গেলাম। বুলডোজারের সামনে বুক পেতে বললাম, ভাঙতে হলে আমার ওপর দিয়ে চালাতে হবে এই বুলডোজার। ওরা বলল, আদালতের পরোয়ানা আছে। আমি তার পরোয়া করলাম না। ক্রমে আমার সমর্থনে কেঊ কেউ এসে জড়ো হলেন। ওদের নেতৃত্বে একে ৪৭ হাতে ছিলেন একজন সাংসদ। বেগতিক দেখে মাইক্রোবাসে চেপে পালালেন তিনি। পরে দেখা গেল ওদের সেই পরোয়ানা জাল। ওখানে তার পর সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।“
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা পীঠস্থান ছিল চট্টগ্রাম। আজ কতটা সংরক্ষিত হয়েছে সেই সংগ্রামীদের স্মৃতি? রানাবাবুর কথায়, “সূর্য সেনের জমিটি শত্রু সম্পত্তি হয়ে আছে। প্রবীন স্বাধীনতা সংগ্রামী অধুনা প্রয়াত বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে সভাপতি এবং সাংসদ হারুনভাইকে সম্পাদক করে সূর্য সেন স্মৃতিরক্ষা কমিটি হয়েছিল। সেখানে তৈরি হয়েছিল স্মৃতিসৌধ। রাতে সেটা ভেঙে ফেলা হয়। কারা ভেঙেছে জানি। ওখানে সামাজিক কাজের জন্য একটা ভবন হয়েছে। মানুষ আছে কিন্তু মানুষ নেই।
ঐতিহাসিক জালালবাদ পাহাড়ে সূর্য সেনের আবক্ষ মূর্তি বসিয়েছিলেন ব্রজেন সেন। কিন্তু জায়গাটা সংরক্ষণ করা যায়নি। প্রীতিলতার মূর্তি বসানোয় সমস্যায় পড়েছিলাম। বাংলাদেশের এসইউসি-সমর্থিত সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সক্রিয় সহযোগিতা করল। তাতেও সময় লাগল। মেয়র মনজুরের হস্তক্ষেপে সেটি বসানো গিয়েছে। চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের স্মৃতিরক্ষা প্রকল্পে পায়ে পায়ে বাধা এসেছে। তথ্যমন্ত্রী হাসান মামুদ আলোচনায় বললেন, ১০ কোটি টাকা যদি জমির জন্য চলে যায়, ভবন তৈরির টাকা আসবে কোথা থেকে? অনেক জমি দখল হয়ে গিয়েছে। আমরা ছোটাছুটি করেছি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস বাদে নির্দেশ দিলেন, পশুশালার জমি আমাদের হাতে দ্রুত তুলে দিতে। কিন্তু সেসবের রূপায়ণ খুব শক্ত।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন আমার বাবার পিসি। ওই বংশের শেষ সূত্র আমি। ট্যাঙাপাড়ায় প্রীতিলতার জন্মস্থানের জমির অনেকটা দখল হয়ে গেছে। আমি নিজে গিয়েছি ওখানে একটা বড় স্মৃতিপ্রকল্প করার জন্য। স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছি। যাঁরা ওখানে আছে, আমাদের অনেক যত্ন করেছে। ডাবের জল পান করিয়ে বলেছে, এই ডাবগাছ তোমার বাপ-ঠাকুর্দাদের লাগানো। আম খাইয়ে বলেছে, এই আম তোমার বাপ-ঠাকুর্দাদের লাগানো গাছের ফল। ওখানকার পুরনো মন্দিরটা সাজিয়ে তোলার অনুরোধ করেছে বাসিন্দারা। ওই মন্দিরের পাশে অনেকটা জমি মুসলমানরা দখল করে রেখেছে। ওই জমিতে বীরকন্যা প্রীতিলতা মনুমেন্ট করতে চাই। পাশে ভোকেশনাল প্রশিক্ষণকেন্দ্র হবে। ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে গিয়ে মাপঝোক করিয়ে এনেছি। দখলদাররা জমি ছাড়ব না বলেনি। কিন্তু জমি না পেলে প্রকল্প হবে কী করে?
পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ঘাঁটি ছিল এই অঞ্চল। পশ্চিমবঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনেকের নামে উদ্যান আছে। বাংলাদেশে একটাও নেই। এটা খুব দুঃখের। আপনারা দেশ ছেড়ে চলে এসেছেন। বিপ্লবীদের পরিবারের লোকেরাও টিঁকতে পারেননি।
(ঋণ—প্রদীপ ঘোষ।)
(ছবি— সিভয়েস।)
***

