পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের স্মৃতি (২৫) ভিটেছাড়ার অসহ যাতনা

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ৭ নভেম্বর:
“ভূষণ পাল গোটা পরিবারটাকে ঝড়ের মতো নাড়া দিলে।
কত দূর দিগন্তের পথ-
এখান থেকে নৌকা ক’রে স্টিমার ঘাট সেখান থেকে রেলষ্টেশন-
কী মজা, আজ প্রথম ট্রেনে চাপাবি,
ট্রেন ক’রে চেকপোষ্ট,
সেখান থেকে পায়ে হেঁটে-পায়ে হেঁটে-পায়ে হেঁটে-
ছোট ছেলেটা ঘুমমোছা চোখে জিজ্ঞেস করলে, সেখান থেকে কোথায় বাবা?
কোথায় আবার! আমাদের নিজের দেশে।

ছায়াঢাকা ডোবার ধারে হিজল গাছে ঘুমভাঙা পাখিরা চেনা গলায় কিচিরমিচির করে উঠল। জানালা দিয়ে বাইরে একবার তাকাল সেই ছোট ছেলে, দেখলে তার কাটা ঘুড়িটা এখনো গাছের মগডালে লটকে আছে, হাওয়ায় ঠোক্কর খাচ্ছে তবুও কিছুতেই ছিঁড়ে পড়ছে না। ঘাটের শান চ’টে গিয়ে যেখানে শ্যাওলা জমেছে সেও করুণ চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করছে, কোথায় যাবে? হিজল গাছের ফুল টুপ টুপ ক’রে এখনো পড়ছে জলের উপর, বলছে, যাবে কোথায়?”

উদ্বাস্তু‘-তে এভাবেই ভিটেছাড়ার অসহ যাতনা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। যে প্রশ্নটা নানা সময় এই ধারাবাহিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, কেন বংশপরম্পরায় বাস করা বাড়িঘর ছেড়ে চলে এসেছেন (পড়ুন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে) পূর্ববঙ্গের কোটি কোটি হিন্দু।

পাহাড়প্রমাণ অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে ভিটে ছাড়ার বর্ণনা পাবেন নারায়ণ বসুর আত্মকথায়। তিনি লিখেছেন, “১৯৫০ সাল। ঠিক করলাম, ওখানে আর একদিনও থাকা ঠিক হবে না। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে আমরা সবাই সকলের অগোচরে একটু দূরে দেউলি গ্রামে আমার দিদির বাড়িতে চলে গেলাম। সেখানে তখনও কোনও গোলমাল শুরু হয়নি। কয়েকদিন ওখানে থেকে ৬ মার্চ ওখান থেকে স্টিমারে বরিশাল চলে এলাম। এর মধ্যে ঠিক করলাম। ওখানে আর থাকব না। কলকাতা চলে আসব। কিন্তু কলকাতা আসতে প্রথমে বরিশাল থেকে স্টিমারে খুলনা আসতে হবে এবং সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা।

এখানে স্টিমার সার্ভিসের জন্য তখন দুটি কোম্পানি ছিল। একটি আর এস এন (রিভার সি নেভিগেশন কোং), অন্যটি আই জি এন (ইন্ডিয়ান জেনারেল নেভিগেশন কোর)। কোম্পানি দুটিই ব্রিটিশ কোম্পানি এবং বরিশালের এজেন্ট ছিলেন এক ব্রিটিশ সাহেব। আমার সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। নামটা আর ঠিক মনে নেই। স্টিমার ঘাটে এসে শুনলাম, খুলনার জন্য কোনও টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। কয়েকদিন চেষ্টা করেও টিকিট না পেয়ে ১১ মার্চ আবার দেউলি গ্রামে ফিরে এলাম। ১৪ মার্চ ছোট বোন বেলা এবং ছোট ভাই দিলীপকে নিয়ে আবার বরিশাল চলে এলাম। এসে স্টিমার কোম্পানির এজেন্টকে ধরে খুলনার তিনখানা টিকিটের ব্যবস্থা করলাম।

১৭ মার্চ টিকিট পেলাম এবং ২০ মার্চ আমরা স্টিমারে খুলনা রওনা হলাম। দুই মাকে দিদির বাড়িতে রেখে আমরা চলে এলাম এক অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশে সারা জীবনের মতো জন্মভূমি ত্যাগ করে। তখন বরিশাল থেকে খুলনা দু’খানা স্টিমার চলত। একটি ‘গারো’ আর একটি ‘ফ্লোরিকান’। কোনটিতে এসেছিলাম এখন আর মনে নেই। পরের দিন ২১ মার্চ সকালে খুলনা এসে পৌঁছলাম। সেখান থেকে ট্রেনে বেনাপোল সীমান্ত স্টেশন। সেখানে ছ’সাত ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখল ট্রেনটিকে। ট্রেনটির নাম ছিল ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’।

নিজের জন্মভূমি এবং চোদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। তখন যে জামাকাপড় পরে এসেছিলাম সেই এক জামা এক কাপড় পরেই ২২ মার্চ বিকেলে ছোট ভাই ও বোনকে নিয়ে শিয়ালদা স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। ট্রেন থেকে নেমে ভাবতে শুরু করলাম কোথায় যাব, কোথায় থাক করব।

র‍্যাডক্লিফ সাহেবের কলমের এক খোঁচায় ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ রাত ১২টায় আমার প্রিয় জন্মভূমি হয়ে গেল পাকিস্তানের একটি অংশ এবং ১৯৫০ সালের ২০ মার্চ সেই জন্মভূমির সঙ্গে সকল সংস্পর্শ ত্যাগ করে কেবলমাত্র প্রাণটি নিয়ে চলে অজানা ভবিষ্যতের সন্ধানে। শুরু হল আমার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।

২২ মার্চ, ১৯৫০। বিকেলে শিয়ালদা স্টেশনে এসে বরিশাল এক্সপ্রেস থেকে যখন নামলাম তখন আমার জন্মভূমি আমার কাছে বিদেশ হয়ে গেল। অবিভক্ত ভারতবর্ষে জন্মেছিলাম বলে জন্মসূত্রে আমি ভারতের নাগরিক। স্বাধীনতার পর দু’বার কলকাতা এসেছিলাম। কিন্তু তখন আমি ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক। কিন্তু আজ স্বাধীন ভারতবর্ষের মাটিতে পা দিয়ে একদিকে যেমন অপরিসীম তৃপ্তি লাভ করলাম, তেমনি অন্যদিকে আবার চিরতরে জন্মভূমি ত্যাগ করে আসার এক ভয়ানক যন্ত্রণা আমাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করতে লাগল। তবু এই ভেবে সান্ত্বনা খুঁজেছি যে, এই দেশ ভাগের জন্য তো আমি দায়ী নই। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য আমরা বলিপ্রদত্ত– আমরা অর্থাৎ, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষরা।

শিয়ালদা স্টেশনে বসে কিছুক্ষণ ভাবলাম। কী করব? কোথায় যাব? ঠিক করলাম, না কোনও আত্মীয়ের বাড়ি যাব না। শিয়ালদা স্টেশনে তখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা হাজার-হাজার ছিন্নমূল পরিবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায় বসে আছেন। এঁদের কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম এই স্বাধীনতা তো আমরা চাইনি, যে স্বাধীনতার ফলে লক্ষ-লক্ষ মানুষ গৃহহারা হবে। সরকারি ভাষায় এঁরা ততক্ষণে উদ্বাস্তু আখ্যা পেয়ে গেছেন।

মনটা বিদ্রোহ করতে চাইল। কিন্তু আমি তখন অসহায়। দেখলাম অসংখ্য মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সামনে টেবিল চেয়ার নিয়ে কয়েকজন সরকারি কর্মচারি অথবা স্বেচ্ছাসেবক তাঁদের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা ইত্যাদি সব লিখছেন। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে, এঁরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে আসা উদ্বাস্তুদের নাম-ঠিকানা ইত্যাদি নথিভুক্ত করছেন এবং ঠিক করে দিচ্ছেন এঁদের কোথায় আশ্রয় দেওয়া হবে। রাতে বিশেষ ট্রেনে করে এঁদের নিয়ে যাওয়া হবে এঁদের জন্য স্থাপিত আশ্রয় শিবিরে। কোনওটা নদীয়া জেলার ধুবুলিয়াতে, কোনওটা রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্পে, আবার কোনওটা চাঁদমারিতে।” (‘আত্মস্মৃতি, নারায়ণ বসু, পৃ ২৬, ২৭)।


সঙ্গের ছবিতে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুলে অবস্থিত নবরত্ন মন্দির। মন্দিরের চূড়ায় এখন কোনো রত্ন নেই। মন্দিরটি ইট চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মিত। পোড়ামাটির চিত্রফলক দ্বারা সজ্জিত ছিল। নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসন আমলে রামনাথ ভাদুড়ি নামের জনৈক তহসিলদার ১৭০৪- ১৭২৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এটি নির্মান করেছিলেন। মধ্যযুগের স্থাপত্যকলার এটি একটি অপূর্ব নিদর্শন। এটি সংরক্ষণ করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়।
ছবি— আশুতোষ সাহার লেখা, ‘সেভ দি হেরিটেজেস অফ বাংলাদেশ গ্রুপ।

‘মনেপ্রাণে হিন্দুত্ববাদী’দের কাছে অনুরোধ। আমাদের সাহায্য করুন। খুব আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে সাড়ে পাঁচ বছর ধরে ২৫ জন রিপোর্টার, বাংলায় একমাত্র আমরাই প্রতিদিন এই ধরণের খবর করছি। 🙏
ব্যাঙ্ক একাউন্ট এবং ফোনপে কোড:
Axis Bank
Pradip Kumar Das
A/c. 917010053734837
IFSC. UTIB0002785
PhonePay. 9433792557
PhonePay code. pradipdas241@ybl

1 thoughts on “পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের স্মৃতি (২৫) ভিটেছাড়ার অসহ যাতনা

  1. Sojasapta2 says:

    তারা যে যন্ত্রনা ফেইস করেছে। সে যন্ত্রনা এখনো আমরা ফেইস করছি। তবে দেশ ত্যাগ করবোনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *