আমাদের ভারত, ৩১ অক্টোবর: ওপার বাংলা থেকে সর্বস্ব খুইয়ে আসা অসংখ্য মানুষ কীভাবে লড়াই করে বেঁচেছে, তার অনেক কাহিনীই আমরা জানিনা। এরকমই একটি ‘দেশভাগে যাদের হারিয়েছি ও অখণ্ড বাংলার ইতিহাস’ ফেসবুক গ্রুপে পৃথ্বী ব্যানার্জির লেখা।
“১৯৭১ সালে ওপার বাংলার বরিশালের ভিটেমাটি ছেড়ে এপারে এসে বারাসতে একটা সদ্য গজিয়ে ওঠা উদ্বাস্তু কলোনীতে আশ্রয় পেয়েছি। আমার তখন প্রায় বাইশ। বোন কুড়ি। বাবা কিডনির অসুখ নিয়েই এসেছিলেন। এখানকার তৎকালীন কলোনী জীবনের শারীরিক ও মানসিক ক্লেশের বিপর্যয়ে দুটো কিডনিই বিকল হতে সময় নিল না। আমাদের মত হাড় হাভাতে পরিবারে ঐ রোগ বেমানান ছিল।
বিনা চিকিৎসায় বাবা ’৭৩ সালে যখন চলে গেলেন মৃতদেহ সৎকার ও শ্রাদ্ধের দিন পাঁচজন ব্রাহ্মণকে ফলার করানোর পর আমার পকেটে বাংলাদেশের ফার্স্ট ক্লাস অনার্সের সার্টিফিকেট ছাড়া আর কোনো সম্বলই ছিল না। দুপুরবেলা মায়ের ঝিগিরি করে আনা পয়সায় ডালভাত খেয়ে পকেটে অচল সার্টিফিকেট নিয়ে অফিস থেকে অফিসে ঘুরতাম। পাজামা লম্বা শার্ট পরণে ,মুখে বাঙাল ভাষা। অফিসগুলোর সাধারণ প্রতিক্রিয়া ছিল, “দরখাস্ত রেখে যেতে পারেন। ভ্যাকান্সি হলে কল পাবেন। তবে বাংলাদেশের কাগজপত্র তো।” বলা বাহুল্য কল আর আসতো না।
দু একটা টিউশন যা করতাম তার টাকায় জল গরম হতো না। এরই মধ্যে যখন চাপাডালির মোড়ে ”পড়ালেখা” দোকানটায় কাজ পেলাম তখন সত্যিই হাতে চাঁদ পেলাম। চালু দোকান। সকাল আটটা থেকে রাত নটা। মাঝে দু ঘন্টা দুপুরের খাওয়া বিশ্রাম। প্রাইভেট টিউশন গেল। তবে খুকু মানে আমার বোন টিউশানগুলো করায় পরিবারে ডালভাত অন্ততঃ নিয়মিত হলো। মাকেও ঝি গিরির গ্লানির হাত থেকে বাঁচানো গেলো।
পাশেই বারাসত কলেজের এক ছাত্রী নিয়মিত দোকানে যাতায়াত করতো। ওর কবিতা টবিতা লেখার বাতিক ছিল। আমারও। মেয়েটি লেখাপড়ায় ভালো ছিল। অনার্স গ্রাজুয়েট হয়েই একটা স্কুল-শিক্ষকের চাকরীতে ঢুকে পড়ে। তিন বছর দুজনের রোমান্স চলার পর সম্পূর্ণার সাথে আমার বিয়ে হয়। তার আগে সম্পূর্ণার অর্থে সম্পূর্ণারই এক সহকর্মী স্কুলশিক্ষকের সাথে খুকুর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের আগে সম্পূর্ণা ভেঙে বলেনি যে ওরা রায়গঞ্জে খুবই অবস্থাপন্ন পরিবার এবং আমার স্ত্রী পাঁচবোন এক ভাইএর সবার কনিষ্ঠ আদরের দুলালী।
এই অসম বিয়ে আমার শ্বশুরবাড়ির কেউই ভালোভাবে মেনে নিতে পারেননি। বিয়ের পরই দ্বিরাগমনে গিয়ে প্রথম আমার বড় শ্যালিকার মুখে একটি বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য ,“সাজানো গোছানো যেমনই হোক,তোমাদের খাওয়ানো দাওয়ানো ভালোই হয়েছিল। বিশেষ করে ঐ ছ্যাঁচড়ামি না ছ্যাঁচড়া কি যেন নাম ঐ আইটেমটার।”
আমার শ্বাশুড়ি আমার হাতে লাল সুতো বাঁধতে বাঁধতে বলেছিলেন,“বাবা শুনেছিলাম তুমি দেখতে ভালো। নাক মুখ চোখ ভালো হলেই কি হয়ে গেল? পুরুষ মানুষ এই সরু রিস্ট। বোঝা যায় ছেলেবেলায় ভালো খাওয়া দাওয়া করো নি, যত্ন পাওনি।” বাকী বোনদের সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত,বড় ঘরের। আমিই ছিলাম ব্যতিক্রম। শ্বশুরমশাই একদিন চিন্তিত মুখে বললেন,“বাবা অত দামী দামী আসবাব দিয়েছি। দেখো তোমাদের ঐ বেড়ার বাড়িতে বৃষ্টির জল,কাঁদা লেগে নষ্ট না হয়।” তবে আমি রায়গঞ্জ থেকে বারাসত ফিরে আসার সময় উনি নাইট বাসের টিকিট কেটে দিতেন। বলতেন,“তুমি দুদিককার টিকিটের দাম দিতে গেলে মেয়ের আমার মাসের শেষে সংসার চালাতে অসুবিধে হবে।”
অন্যান্য জামাইরা মোটর গাড়িতে অভ্যস্ত। তারা শ্বশুরবাড়ি গেলে এদিক সেদিক যাওয়ার জন্য মোটর গাড়ি থাকতো। আমাকে বিশেষ কাজে রায়গঞ্জ থেকে শিলিগুড়ি যেতে হয়েছিল একবার। স্টেট বাসেই যাতায়াত করেছিলাম। এসবে আমার থেকে সম্পূর্ণাই বেশী কষ্ট পেতো।
তিক্ততা চরমে উঠল যেদিন ওদের একটি ঘরোয়া নিমন্ত্রণে আমার শাশুড়ি আমার পাতে খুব ছোট এক টুকরো মাছ দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণা প্রতিবাদ করায় উনি বলেছিলেন,“তুই আমার উপর দিয়ে যাস না। ও রোগাভোগা মানুষ কত মাছ খায় আমি জানি। এরপর অনেকদিন আমরা আর রায়গঞ্জ যাইনি। এর পরের বছর আমার স্ত্রীর প্রেরণায় আমি বইখাতার দোকানের চাকরী ছেড়ে দিয়ে অল ইন্ডিয়া সার্ভিসেস পরীক্ষা দেই এবং প্রথম বছরই কৃতকার্য হয়ে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে সার্ভিসেস ক্লাস ওয়ানে জয়েন করি।
সময় ঢের বিষয়বস্তুর নির্ধারক। শরিকি গন্ডগোলে আমার শ্বশুরবাড়ির অতবড় পারিবারিক ব্যবসা একসময় নষ্ট হয়ে যায়।ইতিমধ্যে আমার মাও মারা গেছেন। আমার মা বাবা না থাকায় আমার শ্বশুর শাশুড়ি একসময় আমার “ডিপেনডেন্ট” হিসাবে ট্রেনের সুপার লাক্সারি কোচে সারা ভারত ভ্রমণও করেন।
কবে যে শ্বাশুড়ির প্রিয়তম জামাই হয়ে উঠলাম কাজের চাপে খেয়ালও করি নি। কবি জীবনানন্দ দাশ নারীর সৌন্দর্যকে অতীতের দানের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। “তোমার সৌন্দর্য নারী অতীতের দানের মত। ———-____—–নারীর অন্যমানে তুমি। কত রাধিকা ফুরলো। ” সে কি সম্পূর্ণার মত নারীর অন্তরের সৌন্দর্য?
সঙ্গে জমিদার বাবু শৈলেন্দ্রনাথ সাহার ভবনের ছবি।
শত্রু সম্পত্তি (পরিত্যাক্ত সম্পত্তি) হিসাবে ‘জনস্বার্থে’ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অধিগ্রহণ করেন।
ঢাকা, কুমারী আলমডাঙা চৌডাঙায়।
সূত্র- ফাউজুল আহসান।
সেভ দি হেরিটেজেস অফ চট্টগ্রাম।
সঙ্কলন— অশোক সেনগুপ্ত।

