পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের স্মৃতি (১৯)

আমাদের ভারত, ৩০ অক্টোবর: নিউইয়র্কবাসী কুলদা রায় গত ২০ জুলাই সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন।
“বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক জাকির তালুকদার মনে করেন, হিন্দু জমিদারগোষ্ঠী বাঙালি মুসলমানদের নিপীড়ণ শোষণ করেছে। রেনেসাঁস আন্দোলনে হিন্দুরা মুসলমানদের ঢুকতে দেয়নি। হিন্দুমেলার মাধ্যমে হিন্দুরা মুসলমান বিদ্বেষ জারি রেখেছে। দেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রশ্নে ইতিহাসের এই সত্যগুলো সামনে আনতে হবে। অর্থাৎ সংখ্যালঘু নির্যাতনের দায় ভিকটিম হিন্দুরাই দায়ী বলে ঘোষণা করেন জাকির তালুকদার।

এই কথাটি জাকির তালুকদার বলছেন কোন সময়ে? বলছেন দেশে যখন ক্রমবর্ধমানভাবে সংখ্যালঘু তথা হিন্দুনিপীড়ন চলছে–এই সময়ে। সময়টাকে মনে রাখুন।

জমিদার হলো ট্যাক্স কালেকটর। মুঘলরা ভারত রাষ্ট্রটি দখল করার পর এই হিন্দুদেরকেই ট্যাক্স কালেকটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। বার্ষিক একটা ট্যাক্স নির্ধারণ করে দিতেন মোগল সম্রাট। প্রজাদের কাছ থেকে সেটা আদায় করতেন জমিদাররা। বৃটিশরা এদেশ দখল করে মোগলদের নিয়োগকৃত জমিদারদেরই ট্যাক্স আদায়ের দায়িত্বে রেখেছিল।

সে সময়ে দেশে হিন্দু মুসলমানদের সংখ্যা কমবেশি আধাআধি ছিল। ধরা যাক কোনো জমিদারি এলাকায় ১০০০০টি পরিবার ছিল। তার মধ্যে ৫০০০ ছিল হিন্দু। তাদের মধ্যে মাত্র ৫% ছিল ব্রাহ্মণ। এদের মধ্যে ছিল ০.৫% ছিল ধনী ব্রাহ্মণ অর্থাৎ একটা জমিদারি এলাকায় ১০০ জনের বেশি ধনী ব্রাহ্মণ থাকার কথা নয়। তাদের মধ্য থেকে ১ জন হতো জমিদার। এই একজন হিন্দু জমিদার ট্যাক্স আদায়ের জন্য প্রজাদেরকে শোষণ, নির্যাতন ও নিপীড়ন করেছেন।

প্রথম কথা হলো ১ জন হিন্দু জমিদারের নিপীড়নের দায় বাকী ৪৯৯৯ জন হিন্দুর উপর চাপানো যায় না।
দ্বিতীয় কথাটি হলো, ঐ হিন্দু জমিদার হিন্দু মুসলমান সবার কাছ থাকেই ট্যাক্স আদায় করতেন। হিন্দু মুসলমান প্রজা উভয়েই তার নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হতো। তাহলে একজন হিন্দু জমিদারের নিপীড়নের দায় সব হিন্দুদের উপর চাপানো কি ঠিক কাজ হবে?

তৃতীয় কথা হলো, সেকালে শুধু হিন্দু নয়–অনেক মুসলমান জমিদারও ছিল। তারা কি ট্যাক্স কালেকশনের জন্য মুসলমান প্রজাদের নিপীড়ন করত না? চতুর্থত, হিন্দুমেলা কোলকাতার উপকণ্ঠে শুধুই হয়েছে ছয় সাতবার। সেখানে মুসলমানরাও অংশ নিয়েছেন। অন্যত্র হয়নি। এই মেলার ইমপ্যাক্ট সারা বাংলায় কোনো প্রভাবই সৃষ্টি করেনি। হিন্দু মেলায় কোনো মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো হয়নি। দেশি হস্ত শিল্প, মৃৎ শিল্প, কৃষি বিষয়ক পণ্যের সম্প্রসারণের জন্য মেলায় সেগুলো হাজির করা হতো।

চতুর্থ কথা হলো সাত চল্লিশের দেশভাগের পর অধিকাংশ হিন্দু জমিদার পশ্চিম বঙ্গে চলে যায়। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে কোনো হিন্দু জমিদার আর প্রজানিপীড়নের সুযোগ পায়নি। কিন্তু দেশে বছরের পর পর হিন্দুদের উপর এক তরফা দাঙ্গা চাপানো হয়েছে। তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের সহায় সম্পদ লুটপাট করা হয়েছে। একাত্তরে পাকিস্তানীদের প্রথম টার্গেটই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়। লক্ষ লক্ষ হিন্দুকে তারা মেরেছে। এক কোটি হিন্দুদেরকে গুলির মুখে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। হিন্দুদের উপর এই হত্যা, নিপীড়ন, লুটপাট, দেশত্যাগে বাধ্যকরা এখনো চলছে আরো ভয়ংকরভাবে। ১০০ বা ২০০ বছর আগের হিন্দু জমিদারদের নিপীড়ণের কথা এখন সামনে টেনে আনার অর্থ কী?

এরা সবাই জমিদার ছিলনা। মুসলমান নিপীড়নকারীও ছিল না। ইতিহাস তো তাই বলে জাকির তালুকদার–নয় কি? তাহলে দেশে ক্রমবর্ধমান হিন্দু নির্যাতনের ঘটনাকালে নির্যাতিত হিন্দুদের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে কেনো নির্যাতকদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন? কেনো তিনি হিন্দু তথা সংখ্যালঘু নির্যাতনকে ন্যায়সঙ্গত মনে করছেন?”

ছবিতে শিরিন আখতার শেরুর তোলা (২৮/১০/২০২২) ইতনা, লোহাগড়া, নড়াইলে ধনঞ্জয় সেনের বাড়ী।
সংগ্রহ ও সঙ্কলন অশোক সেনগুপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *