অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ১৯ অক্টোবর: ভালো নাম অন্নপূর্ণা দাস। এই নামে কেউ না চিনলেও একডাকে চেনা নাম বুড়িমা।
১৯৪৮। দেশভাগ, দাঙ্গায় বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তান। ডাক্তার রোগ ধরতে পারেনি, বাঁচানো যায়নি স্বামীকে। বাচ্চাদের নিয়ে অন্নপূর্ণা পাড়ি দিলেন গঙ্গারামপুর। ঠাঁই হল শিবিরে। গঙ্গারামপুর বাজারে এক জনের কাছ থেকে শিখে নিলেন বিড়ি বাঁধা। ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বিড়ি বাঁধতে লাগলেন। একটু একটু করে, সব হল। বাড়ি, ছেলের পড়াশোনা, মেয়ের বিয়ে— বরানগরে। বেলুড়ে ন’শো টাকায় একটা দোকান কিনলেন। গঙ্গারামপুরের পাট চুকল।
কালীপুজো। বুড়িমার ইচ্ছে দোকানে বাজি তুলবেন। হাতে পয়সা নেই। ধারের টাকায় বাজি কিনলেন, তার পরই সেই ঘটনা। দোকান ভাঙল পুলিশ। এর ক’দিন পরেই এক দুপুরে ছেলেকে চমকে দিলেন, “এই দেখ বাজি বিক্রির লাইসেন্স। আর বাজি তৈরির অনুমতিপত্রও!” লাইসেন্স তো হল। কিন্তু কে শেখাবে বাজি বানানো? বাঁকড়ায় দেখা আকবর আলির সঙ্গে। হাতে ধরে শেখালেন— কাকে বলে সোরা, ব্যাটরা, গন্ধক কী রকম দেখতে। প্রথম মরশুমেই বাজিমাত। সব বিক্রি হয়ে গেল। আকবরের ফর্মুলাতেই তৈরি হল ‘বুড়ীমার চকলেট বোম’।
বাজি-কারখানার জন্য তালবান্দা, ডানকুনি, শিবকালীতে জায়গা কিনলেন। ডানকুনিতে মাটি খুঁড়তে বেরল বিশাল শিবলিঙ্গ। চকলেট বোমের লোগো হল তা। কারখানার জন্য কিনলেও তালবান্দার জমি বিলিয়ে দিলেন গরিবদের। এক সময় যাঁর মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, তিনিই পঞ্চাশটি পরিবারকে বাড়ি বানিয়ে দিলেন। বলতেন, “ব্যবসাটা তুচ্ছ! এসেছি মানুষকে ভালবাসতে।”
১৬/১ পিয়ারীমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বিরাট বাড়ির সর্বত্র বুড়িমা। তাঁর শেষ দিনটা আজও চোখে ভাসে নাতি সুমন দাসের। লোকে ভর্তি বাড়ি, থমথমে। এরই মধ্যে বাইরে কারা ‘বুড়ীমার চকলেট বোম’ ফাটাচ্ছে। শোকের সময় চ্যাংড়ামো! উত্তর এল, ‘‘চ্যাংড়ামো নয়, জয়ধ্বনি। যে চকলেট বোম বানিয়ে গোটা বাজির বাজার জিতে নিয়েছেন, সেটা ফাটিয়েই বুড়িমাকে শ্রদ্ধা জানালাম!”
১৯৯৫ এ মৃত্যু হয় বুড়িমার। ব্যবসা তখন অনেক বড়। মূল হাল ধরলেন বুড়িমার নাতি সুমন। পরিবারের পুরনো কথা জানাতে গিয়ে এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, “ঠাকুরদা (ঈশ্বর) ছিলেন সুরেন্দ্র চন্দ্র দাস। ঠাকুরমার জন্ম ফরিদপুরে, মাদারিপুর মহকুমায়। তাঁর বাবা ছিলেন ডাক হরকরা (রানার)। ছেলেমেয়েরা ছোট থাকতেই মারা যান অন্নপূর্ণা দাসের স্বামী। দেশভাগের পরে তাঁর জায়গা হয় ধলদিঘি সরকারি ক্যাম্পে। তবে এখন আর আমার পূর্বপুরুষদের কথা ছিল জানা নেই। বাবাও মারা গিয়েছেন ১৯৮৮-তে।”
১৯৪৮ -এর দাঙ্গাবিধ্বস্ত অন্নপূর্ণা যখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে এই শহরে আসেন, তখন কোলে তিন সন্তান। শাকসব্জি, ঘটিবাটি যা পারেন, তাই বেচে কোনওরকমে সংসার চালিয়েছেন। অভুক্ত থেকেছেন অধিকাংশ সময়। সন্তানদের রক্ষা করতে অন্নপূর্ণার মতো দশভূজা হয়েই লড়তে হয়েছে তাঁকে। গ্লানি ঝেড়ে ফেলে দারিদ্রের সঙ্গে লড়তে উচ্ছে, ঝিঙে, পটল, মুলো বিক্রি করেছেন বাজারে।
বুড়িমা আসলে সেই দেশভাগের ফলে উদ্বাস্তু হওয়া মেয়েটিরই তিলে তিলে গড়ে তোলা ব্র্যান্ড। বুড়িমার চকলেট বোমা তাই স্রেফ একটা বাজি নয়, এক বাঙালি মেয়ের উত্থানগাথাও বটে। দেশভাগ তাঁকে ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় টেনে আনে। পূর্ববঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে অগণিত পুরনো বাসিন্দার স্মৃতি। ভাঙাচোরা মানুষের সেই মুখের মিছিলে বুড়িমাও একজন।
ঋণ— অময় দেবরায় (অনলাইন আনন্দবাজার, ২২-১০-২০১৭)।


অসংখ্য ধন্যবাদ। বেশি বেশি করে এদের কথা লিখতে অনুরোধ করছি।