মানিক মহম্মদ ১০ জনকে উদ্ধার করেছিলেন, বাকি ১০০ মানুষের প্রাণ বাঁচালেন কারা!

শান্তনু সিংহ (আইনজীবী)
আমাদের ভারত, ৭ অক্টোবর: মহম্মদ আলি জিন্না মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীকে কোনও দিন “বাপুজী” বলে সম্মোধন করেননি। কিংবা “মহাত্মা”। কংগ্রেসে থাকাকালীন অথবা মুসলিম লিগের প্রধান হিসেবে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে মহম্মদ আলি জিন্নাহ “মিস্টার গান্ধী” বলেই সম্মোধন করে গেছেন তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে। কিন্তু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী?

মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী কোনওদিন মহম্মদ আলি জিন্নাকে “মিস্টার জিন্না” বলে সম্মোধন করতে সাহস পাননি। সারা জীবন মহম্মদ আলি জিন্নাকে সম্মোধন করেছেন “কায়েদ-ই-আজম” ব’লে।

জহরলাল নেহেরু লিখেছেন – আমি সংস্কৃতিতে খ্রিস্টান, ধর্মে মুসলমান এবং দুর্ঘটনাজনিত (accidentally) কারনে জন্মে হিন্দু। অথচ আশি শতাংশ হিন্দুর দেশে ওই জহরলাল নেহেরুই প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। দুজন নতুন বন্ধুর সাথে পরিচয় করে দেওয়া হচ্ছে। যিনি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, তিনি হিন্দু। আর যাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, তাদের একজন হিন্দু এবং আরেকজন মুসলমান। পরিচয়টা পর্বটা এরকম – আমার বন্ধু। একসাথে লেখাপড়া করেছি, এক হোস্টেলে থেকেছি, ওর নাম সমর চ্যাটার্জি। অন্যজনের পরিচয়টা পর্বটা আবার এই রকম- একসাথে লেখাপড়া করেছি, হোস্টেলে থেকেছি, ও করিম ভাই। অর্থাৎ হিন্দু বন্ধুকে “ভাই” বলল না। তা বললে সম্পর্কটা যেন বেশি গাঢ় হয়ে যাবে। অন্যদিকে, মুসলমান বন্ধু “ভাই” না হয়ে “বন্ধু” হলে সম্পর্কটা যেন দূরের হয়ে যাবে।

গত গত 1000 বছরের পরাধীনতা ও আমাদের নেতাদের ভূমিকা আমাদের হীনমন্য জনগোষ্ঠীতে পরিনত করেছে। আর এই হীনমন্যতার সাথে যোগ হয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের ঘৃন্য নীতি।

বেশ কয়েকদিন আগে আমি একটা লেখা লিখেছিলাম। ভারতবর্ষে মুসলমানরা কোনও সমস্যা নয়। ওরা সমস্যা তৈরিও করে না, সমস্যা বয়ে নিয়েও বেড়ায় না। সমস্যা হিন্দুদের।

ওই লেখার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সমালোচনা শুনেছিলাম। অনেকে বললেন, আমি নিজের স্বার্থের জন্য আদর্শচ্যুত হয়ে যাচ্ছি, অনেকে আবার অযাচিতভাবে জ্ঞান দিলেন, আমাকে ইতিহাসটা ভালো করে পড়ে দেখবার জন্য। যদিও উত্তর দেবার বা রিয়্যাক্ট করবার প্রয়োজন অনুভব করিনি। কারণ আমি আমাকে চিনি, আমাকে জানি। আর যারা সমালোচনা করেছিলেন তাদেরও মানসিক শক্তি ও মানসিকতা আমি জানি।

তাই সেদিন (দশমীর দিন) তথাকথিত শস্ত্র পূজায় দা, বঁটি ও গাছ কাটার যন্ত্র দেখে বলেছিলাম, স্ক্রু ড্রাইভার আর এগুলোর মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। কারণ, পার্থক্য থাকে মানসিকতায়। মাথায় লাল ফেট্টি বেঁধে, গলায় হলুদ রুমাল লাগিয়ে, হাতে একটা তরোয়াল নিয়ে ফেসবুকে ছবি পোস্ট, তারপর রাত্রিবেলায় ফোন করে, “পুলিশ থেকে বলেছে ছবিটা ডিলিট করে দিতে, কি করা যায়?” তপন ঘোষ’কে এসব কোনওদিন করতে দেখিনি। তবুও ভালো লাগে, অন্তত চেষ্টা করছেন। তাই কেউ জ্ঞান দিতে এলে‌ আর নিতে পারি না ।

যাইহোক, গত বুধবার বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় জলপাইগুড়ির মাল নদীতে ঠাকুর ভাসান দিতে গিয়ে হড়পা বানে অনেক মানুষ ভেসে যায় এবং অনেকেরই মৃত্যু হয়। এর দায় বা দায়িত্ব কার, তার মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু যে বিষয়টা অবশ্য অবশ্যই আমাদের স্বীকার করে নেওয়া উচিত, কিছু অসমসাহসী তরুণ নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ওই ওই হড়পা বানে ভেসে যাওয়া মানুষদের বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তারা কারা? তারা মানুষ। হিন্দু বা মুসলমান নয়, অথবা মুসলমান বা হিন্দু নয়।

এবার আসি সেই বাস্তবতায়। কত মানুষ ভেসে গিয়েছিলেন? হাড় হিম করা সেই দৃশ্য আমরা টিভির পর্দায় দেখেছি। কত মানুষ? দশ জন না শতাধিক? যদি ধরেনিই যে মাত্র শতাধিক মানুষই ওই হড়পা বানে ভেসে গিয়েছিল তাহলে দশ জন বাদ দিয়ে বাকি নব্বই জন মানুষকে উদ্ধার করলেন কারা? কিভাবে? তাহলে আরো অনেক মানুষের যোগদান ছিল সেই উদ্ধারকাজে যাঁরা নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে মানুষ বাঁচানোর কাজে নেমে ছিলেন।

তাহলে ওই মানুষগুলো পরিচয়হীন হয়ে গেল কিভাবে? বা দৃষ্টির আগোচরে রেখে দেওয়া হল কেন? ওপরে তিনটে ছবি দিলাম। তা দেখে কে হিন্দু, কে মুসলমান আর কে মানুষ বলা যাবে কি? বলা যাবে না। কিন্তু ওই যে বললাম, হীনমন্যতা। তাই মানিক মহম্মদ কিভাবে দশ জন মানুষের প্রাণ বাঁচালেন, তার গল্পঃ এখন ঘরে ঘরে। ছবিতে ছবিতে ফেসবুক ছয়লাপ।

কিন্তু সৌমিক ঘোষ ও মনোজ মুন্ডা? বা এরকম আরো অনেকে, যাদের নাম এখনো জানা যায়নি, ছবি এখনো পাওয়া যায়নি। বা জানলে বা পাওয়া গেলেও আমি জানি না বা পাইনি।

আরবের কোনও ইসলাম ধর্মাবলীর নামের আগে বা পরে “মানিক” দেখা যায় না। কিন্তু এখানে “মানিক” মহম্মদের সামনে। কারণ সত্যিই সে “মানিক”। হয়ত কয়েক দশক আগে মানিকের পূর্বপুরুষও আর অন্যান্য বাঙালি মুসলমানের মত হিন্দু বা বাঙালি ছিল। তাই মুসলমান “মানিক” দুর্গা ঠাকুর ভাসানে হিন্দুরা ভেসে যাচ্ছে দেখে নিজের প্রাণের পরোয়া না করে হড়পা বানকে থোরাই কেয়ার করে ঝাঁপ দিয়েছিলেন স্রোত মাতাল মাল নদীতে। মানিকের শরীরে আরবের রক্ত থাকলে মানিক মহম্মদ “হিন্দু” বাঁচানোর এই মহতী কর্মে সামিল হতেন না।

হাদিসে বারবার বর্ণনা করা হয়েছে, কলিজার টুকরা সালাল্লাহু ওয়াসালাম নবী মুহাম্মদ বারবার অভিশাপ ব্যক্ত করেছেন, সমগ্র ইহুদি জাতি যেন প্রবল দুর্ভিক্ষে না খেতে পেয়ে মারা যায়।
(এই বক্তব্য লেখকের নিজস্ব, এরজন্য আমাদের ভারত দায়ি নয়।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *