জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৮ মে: কয়েকদিন আগে মুখ্যমন্ত্রী কাঁকসা ও বুদবুদের ওপর নজর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু নির্দেশই সার। দুই জেলার ওই দুই থানা এলাকা এখনও মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য। দুই থানার ওপর দিয়ে অবাধে চলছে অবৈধ বালি পাচারের রমরমা কারবার। লোকসান হচ্ছে রাজ্যের কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব। বেপরোয়া অবৈধ বালি বোঝাই গাড়ি যাতায়াতে ভেঙ্গে পড়ছে গ্রামের রাস্তা। অতিষ্ট সাধারন পথচলতি মানুষ থেকে স্কুল পড়ুয়া। ক্ষোভ বাড়ছে এলাকায়।
উল্লেখ্য, রাজ্যে তৃতীয়বার তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর অবৈধ বালি, পাথর বোঝাই যান চলাচল বন্ধে উদ্যোগী হয় রাজ্য সরকার। সড়কের ওপর বিভিন্ন জায়গায় শুরু কড়া নাকা চেকিং। শুরু হয় ধরপাকড়। এমনকি নদী তীরবর্তী এলাকায় অবৈধ বালি মজুতের জন্য ধরপাকড় শুরু হয়। মাস কয়েক আগে কাঁকসা, অন্ডাল, লাউদোহা ব্লকে বেশ কয়েকজন অসাধু বালিকারিবারি ধরাও পড়ে। কিন্তু তারপর গত সপ্তাহখানেক ধরে ফের শুরু হয়েছে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন ও বালি পাচার। অজয় ও দামোদর নদে নতুন করে বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে। দামোদর ও অজয় নদের বিভিন্ন ঘাটে পাম্প মেশিন বসানো হয়েছে। অজয় নদের ওপর কাঁকসার সাতকাহানিয়া, শ্মশানঘাট, জঙ্গলঘাট, পেয়ারাবাগান ঘাটে চলছে অবাধে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন। দশ চাকা থেকে ১৬ চাকার লরি ডাম্পার বালি বোঝাই হয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে অবাধে যাতায়াত করছে। আর তার ফলে গ্রামে কংক্রিটের রাস্তার অচিরেই ভেঙে পড়ছে। যাতায়াতের সমস্যায় পড়ছে সাধারন মানুষ থেকে স্কুল পড়ুয়ারা।
একইরকমভাবে দামোদর নদের ওপর কাঁকসার আইমা ও সিলামপুরঘাটে চলছে মেশিন দিয়ে বালি উত্তোলন। বুদবুদের শাঁকুড়ি, শালডাঙা ও মুন্সিপুরঘাটে অবাধে চলছে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন। দিনরাত ওই বালি বোঝাই ট্রাক্টর, ডাম্পার, লরি বেপরোয়া যাতায়াত করছে গ্রামের রাস্তায়। তারপর ওইসব বালি পানাগড় সিলামপুর রোডের পাশে ও ক্যানেলপাড়ে মজুত করা হচ্ছে। আবার গলসীর পারাজে পঞ্চায়েত অফিসের নাকের ডগায় চলছে বালি মজুত করে রমরমা ব্যবসা।

সন্ধ্যার অন্ধকার নামতেই সিলামপুর ঘাট থেকে ওভারলোডিং বালি বোঝাই ডাম্পারের আনাগোনা শুরু হচ্ছে। রাতভর চলছে ওভারলোডিং বালি বোঝাই লরি ডাম্পারের যাতায়াত। সিলামপুর ঘাটে কমবেশী ৩০-৩৫ টি ট্রাক্টার বালি বোঝাই করে পাচার করছে। আবার রাতে কমবেশী ২০০ – ২৫০ ওভার লোডিং বালি বোঝাই ডাম্পার, লরি যাতায়াত করছে। আবার সাতকাহানিয়া এলাকায় দিনভর ৫০ টি ট্রাক্টরে বালি পাচার হচ্ছে।
বুদবুদের শাকুড়ি, শালডাঙা ও মুন্সিপুর ঘাটে মূলত ট্রাক্টরে করে বালি পাচার চলছে। ওই তিনটি ঘাটে ২০-২৫ টি ট্রাক্টর বালি পাচার করছে দিনভর গ্রামের রাস্তায় বেপরোয়া ট্রাক্টর যাতায়াতে ঘুম ছুটেছে এলাকাবাসীর। কয়েকদিন আগে বেপরওয়া বালি বোঝাই ট্রাক্টর যাতায়াতের প্রতিবাদ করে মুন্সিপুর বাউরী পাড়া ও শালডাঙা গ্রামের বাসিন্দারা। আর ওই প্রতিবাদের জেরে পাল্টা বালি মাফিয়াদের রোষানলে পড়ে গ্রামবাসীরা।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্রামের রাস্তায় যেভাবে বালির গাড়ি যাতায়াত করছে, তাতে যেকোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পাড়ার রাস্তায় অনেক সময় ছেলেমেয়ের খেলাধুলা করে। তাতে অসাবধানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বালির গাড়ি যাতায়াতে প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু, বালি মাফিয়ারা বাড়িতে এসে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে গেছে। ফলে চরম আতঙ্কে রয়েছি।
সবক’টি বালি ঘাটের রাস্তার ওপর প্রাইমারি ও হাইস্কুল রয়েছে। গ্রামের একমাত্র সদর রাস্তা। তাই স্কুল পড়ুয়া থেকে সাধারন মানুষের সবসময় যাতায়াত। বেপরোয়া বালির লরি, ডাম্পার যাতায়াতে আতঙ্কিত এলাকাবাসী। আবার ওভার লেডিং বালির গাড়ি যাতায়াতে ভেঙ্গে পড়ছে গ্রামের কংক্রিটের রাস্তা।
কাঁকসা বনকাটি পঞ্চায়েত প্রধান পিন্টু বাগদী জানান, “গ্রামের রাস্তায় বালি বোঝাই লরি, ডাম্পার যাতায়াতে কংক্রিটের রাস্তা ভেঙ্গে পড়ছে। বেহাল হয়ে পড়ছে গ্রামের রাস্তা। সাধারন মানুষ ও স্কুল পড়ুয়াদের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। গোটা বিষয়টি ব্লক প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।”

প্রশ্ন, গ্রামের রাস্তায় কিভাবে ওভারলোডিং ভারি গাড়ি যাতায়াত করে? এছাড়াও জানা গেছে, ওই অবৈধ ঘাটে বালির চালানও দেওয়া হচ্ছে। কাঁকসার কিছু এলাকায় অন্য বালিঘাটের চালান দেওয়া হচ্ছে। আবার কখনও সারাদিনে একটি চালানে দিনভর একাধিক বার বালি বোঝাই করে যাতায়াত করছে। তাতে রাজ্যের কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব লোকসান হচ্ছে। আগামী জুলাই মাসে গ্রিন ট্রাইবুনালের নির্দেশ মত বর্ষায় নদীতে বালি উত্তোলন বন্ধ থাকবে। তার আগে বালি মজুত চলছে রমরমিয়ে। বর্ষায় ওই বালি চড়া দামে বিক্রি হয়।
জানা গেছে, এই বালি মজুতের জন্য জেলা ভূমি রাজস্ব দফতরে মজুত রাখা জমির ছাড়পত্র সহ অনুমতি নিতে হয়। সেই মত মজুত বালির পরিমান অনুযায়ী ১৬৫ টাকা প্রতি ১০০ সিএফটি বালির রয়্যালটি ধার্য হয় এবং সেটা জমা দেওয়ার পর ভূমি রাজস্ব দফতর চালান ইস্যু করে। তবে ওই বালি অবশ্যই বৈধ বালিঘাট থেকে তোলা হতে হবে। তবে যেভাবে বালি মজুত হচ্ছে, আদৌ কি তার অনুমতি রয়েছে?
গত অর্থ বছরে পশ্চিম বর্ধমান জেলাজুড়ে অভিযান চালিয়েছিল জেলা প্রশাসন। তাতে কয়েক লক্ষ সিএফটি মজুত বালি বাজেয়াপ্ত হয়, কাঁকসা, অন্ডাল, দুর্গাপুর-ফরিদপুর ব্লকে। বেশ কয়েকজন বালি কারবারির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। গ্রেফতার হয় বেশ কয়েকজন বালি মাফিয়া। প্রশ্ন তারপরও কিভাবে চলছে অবৈধভাবে বালি পাচার ও বালি মজুত?
ভুমি রাজস্ব দফতরের নজরদারি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

পশ্চিম বর্ধমান জেলা পরিষদের সহ সভাধিপতি সমীর বিশ্বাস জানান, “অবৈধ বালি পাচার কোনওভাবেই বরদাস্ত করা যাবে না। অবৈধ বালি পাচারে সরকারের রাজস্ব লোকসান হয়। তাই সরকারি নিয়ম মেনে বালি তোলা উচিত। অবৈধ বালি পাচার বন্ধে পুলিশ ও ভুমি রাজস্ব দফতরকে আরও সক্রিয় ভুমি রাজস্ব দফতরকে আরও সক্রিয় হতে বলা হবে।” পশ্চিম বর্ধমান জেলাশাসক অরুন প্রসাদ জানান, “বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।”

