ডাঃ রঘুপতি সারেঙ্গী, আমাদের ভারত, ১৪ মার্চ:
“সুখ-দুঃখ দোহে লয়ে জীবনের খেলা ;
যেমন চলার অঙ্গ পা-তোলা, পা-ফেলা।”
…….. এমন ধারা সাধু-বাক্যগুলি আমাদের
মুখে-মুখে ফিরলেও নিজের আসল স্থিতিটা বোঝা যায়… বাড়িতে একটা short-circuit ঘটলে। নিদেনপক্ষে, বাড়ির বাচ্চাটা একটু অসুস্থ হলে। লোকমুখে শুনে, তোতাপাখির মতো আওড়ানো এইসব সত্য ভাষনগুলি তখনই ব্রহ্ম-সত্য হয়ে তর্জন গর্জনে আকাশ কাঁপিয়ে দেয়! কাঁপানোর কথাও …….. । অনুভূতি নেই কিনা! কোনও একটি সংবেদ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে বিচার লাগে। আর, এই বিচারের কাজটি করে মন তার আগের “দর্শন, শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসন” এর মধ্যমে পাওয়া শিক্ষার কল্যাণে।
স্নায়ুচিকিৎসা-বিজ্ঞান জানাচ্ছে, আমরা জীবনের শতকরা ৮০-৮২ ভাগ অভিজ্ঞতা আহরণ করি শুধু দেখার মধ্য দিয়ে। ” 50% of Cerebral cortex devoted to process visual information only”…..বলেছেন Medical Optics এর প্রফেসর Willium G. Allyn । শতকরা ১০-১২ ভাগ অর্জন করি শুনে, আর বাকি মাত্র ৮-১০ ভাগ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি মিলিতভাবে, ঘ্রাণ-স্পর্শ ওস্বাদগ্রহণের মধ্য দিয়ে।
লক্ষনীয়, ✓দৃশ্ + অনট্ প্রত্যয় যোগে গঠিত হয় দর্শন শব্দ, যা’র ইংরেজি ‘Philosophy’। এবার দেখুন, Philosophy শব্দটির etimological meaning……” the art of seeing” মানে, সেই দেখা। কিন্তু, এ শুধু চোখের দেখা নয়, দেখতে ও জানতে হয় কারণ, এর পিছনেও যে একটা শিল্প (art) আছে !
আবহমানকাল ধরেই তো হাজারে-হাজারে আপেল গাছের নীচেই পড়ত! দেখলেন শুধুই নিউটন ! আর, রাতারাতি হয়ে উঠলেন মহামতি।
দত্ত বাড়িতে মহেন্দ্র বা ভূপেন্দ্র–ও তো ছিল, চোখ পড়লো সাধের ‘লরেন’ টার ওপর কেন, শুনি ! ঠাকুরের যে আসলেই দর্শন করার সেই ক্ষমতা ছিল!
‘লাটু’ কে নিয়ে স্বামী গম্ভীরানন্দের “ভক্তমালিকা”র ভূমিকাতে স্বামীজি লিখছেনঃ
“…..আমরা সবাই উচ্চবংশ-জাত, লেখাপড়া শিখে মার্জিত বুদ্ধি নিয়ে ঠাকুরের কাছে এসেছিলাম। লাটু নিরক্ষর। ধ্যান-ধারণা ভালো না লাগলে পড়াশুনা করে মনের সে ভয় দূর করতে পারতাম। লাটু’র কিন্তু অন্য কোনো অবলম্বন ছিল না। …..অতি নিম্ন থেকে অতি উচ্চতম অধ্যাত্মিক সম্পদের অধিকারী হয়েছে। …… এতে তার অন্তর্নিহিত দর্শনশক্তি ও শ্রী শ্রী ঠাকুরের অশেষ কৃপার পরিচয় পাই।”
এখানেও সেই দর্শনের গল্প। নরেন্দ্রনাথ তখন বিশ্বজয় করে সদ্য বেলুড়ের ভক্ত-সমাগমে পা রেখেছেন। লাটু বলে উঠলো, ” লরেন ভাই, তুমি ত সারা পিথিবীটা ঘুরে এলে, কোথাও কী পিথিবী মায়ের পূজা দেখলে? এই ত আমাদের ধরে রেকেছে, শাক- সবজি দিচ্ছে। রান্নার কয়লা দিচ্ছে। মায়ের মতোই আমাদের সেবা করে যায়….।”
স্বামীজি গদগদ কন্ঠে বলে উঠলেন, ” নাঃ, তোকে তো আর লেটো বলা যাবে না। প্লেটো বলেই ডাকবো।” স্বামীজির যে সেই দর্শন- শিল্পটা জানাই ছিল!
প্রশ্ন হোল, কে এই ‘লাটু’ ওরফে ‘লেটো’? এ ছিল বিহারের অখ্যাত ছাপরা জেলার, ছাগল-ভেড়া চরানো এক বালক। ভক্তি-মতি মায়ের বিশ্বাস, শ্রীরামচন্দ্রের কৃপাবলে বসন্ত রোগ থেকে পুনর্জন্ম পেয়েছে। তাই নাম তার ‘রাখতুরাম’। পাঁচ বছরেই মাতৃ-পিতৃ বিয়োগ। মহাজনের আগ্রাসনে সর্বসান্ত নিঃসন্তান কাকা’র হাত ধরে, অন্নের টানে তাই কলকাতায় আগমন। পারিবারিক বন্ধু, আর্দালি ফুলচাঁদ এর কৃপায় রামকৃষ্ণ দেবের ভক্ত রামচন্দ্র দত্তের বাড়ির বিশ্বাসী গৃহ-ভৃত্য। এবার বিহারী ‘রাখতুরাম এর আদুরে বাঙালি নাম হোল ‘লালটু’।
একদিন মনিবের সাথে লালটু’র পরম-পুরুষের দর্শন হল। ঠাকুরের মুখেই লালটু থেকে ‘লাটু’ বা কখনো সখনো ‘লেটো’ আর তাঁরই দর্শনে, শেষে ……..ইনিই পরম প্রণম্য অদ্ভুতানন্দ মহারাজ!
না । আমাদের আলোচ্য কিন্তু কোনো সামান্য ব্যাক্তি বিশেষের অসামান্য হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে নয়। আলোচনা আজ শুধু দর্শনকে ঘিরেই। Realisation typically through Observation.
আগেও বলেছি, দর্শন করতেও শিখতে হয়। দর্শন কোনো কল্পনার বস্তু নয়। রূঢ় এক বাস্তব।
এই প্রসঙ্গে আর একটি ছোটো ঘটনা মনে পড়ছে। ভারতের একসময়ের সেই স্বনামধন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মাননীয় তিরুনেল্লাই নারায়ণল্যের শেসন (সংক্ষেপে, টি. এন. সেশন্) এর আত্মজীবনীতে লেখা ঘটনা। সস্ত্রীক সেশন সেদিন রওনা দিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের এক গ্রামে। সবার সাথে চড়ুই-ভাতিতে অংশ নেওয়াই উদ্দেশ্য। তাল-সারি’র তলা দিয়ে মেঠো পথ। গাড়ির ভিতর থেকেই তাল-গাছে ঝুলন্ত বাবুই পাখি’র বাসাগুলো চোখে পড়তেই থেমে গেলেন। দু-একটা অদ্ভুত এই স্মৃতিকে সঙ্গে নেওয়ার তীব্র বাসনা। এসকর্টের লোককে দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মোষ-চরানো বালককে ডেকে, গাছ থেকে ২-১ টি বাসা পেড়ে দিতে বারবার অনুরোধ করলেন তিনি। কিন্তু বালকটি কোনোমতে রাজি না হওয়ায় ওর পকেটে ১০ টি টাকা গুঁজে দিতে চাইলেন। অভাবি বালকটি তখনও নিষ্কম্প, নির্বিকার, অনড়। এবার সেশন একগাল হেসে বললেন, “নে নে ৫০ টাকা….তবু পেড়ে দে।”
” সাহেব, এই প্রত্যকটি বাসায় একটি করে পাখি’র ছানা আছে। মা-পাখিটা যখন খাবার-মুখে এসে তার বাচ্চাটিকে পাবে না….. সে কান্না আমি সহ্য করতে পারবো না। আমাকে মাফ করে দিবেন।”
দুঁদে আই. এ.এস অফিসার, শেসন লিখছেনঃ
“সেই মুহূর্তেই সেদিন মনে হয়েছিল, আমার সমস্ত বিদ্যাবুদ্ধি, উচ্চ পদমর্যাদা এ সব কিছুই রাখাল ছেলেটির কাছে এক দানা শস্যেরও সমতুল্য নয়। যে বিদ্যা জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত(দর্শন) করে না, বিবেক জাগ্রত করে না তা অন্তঃসারশূন্য এক বোঝা মাত্র।”
আচ্ছা বলুন তো, ঐ রাখাল ছেলেটির এই মানবিক ব্যবহারটাই তো তার দর্শন, নাকি অন্যকিছু?
আসলে জীবন মানেই এক দর্শন–যা’র কাছে তার মতো হোলেও। কিন্ত Eutopia’র ভাবাবেগে তাড়িত হয়ে সে যেন নিজেকে অবাস্তব, অলীক কিছু না ভাবে। বিপদ টা ঠিক এখানেই হয়তো–বা।

