কল্যাণ গৌতম
আমাদের ভারত, ১৩ এপ্রিল: চৈত্র শুক্ল প্রতিপদ তিথিতে ভারতীয় নববর্ষ পালনের মধ্যে দীর্ঘ পারম্পরা এবং সনাতনী-ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট রয়েছে। পক্ষান্তরে বঙ্গাব্দে বছর শুরুর দিনটা কেবলই আর্থিক এবং ব্যবসা ভিত্তিক, তাকে আর যাইহোক, জাতীয় উৎসব বলা চলে না, তাতে আমজনতার স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ নেই। জাতীয় উৎসবে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও আবেগ যুক্ত থাকে, তা ধর্ম আধারিত হয়।
পয়লা বৈশাখ পালিত হচ্ছে, হবেও –একদম ঠিক কথা, কিন্তু কোথাও মনে হয়, দিনটি দখল করে ভারতীয় ঐতিহ্য ও পরাম্পরার প্রতি সমানে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে গেছে। রাজ্যের সেকুলার বুদ্ধিজীবীর দল এবং তাদের সঙ্গে হাওয়া দিয়েছে বাংলাদেশের মুসলমান-সমাজ। তারা বহু বছর ধরেই দিনটিকে মোঘল-আকবরী ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ করে কার্যসিদ্ধি করে চলেছে। তাদের মতে, বাংলা ক্যালেণ্ডার বা বঙ্গাব্দের সূত্রপাত আকবর প্রবর্তিত ইলাহি সৌর ক্যালেণ্ডার থেকেই। বঙ্গাব্দের প্রথমদিনের সঙ্গে কোনো বিশিষ্ট ধর্মীয় যোগাযোগ না থাকায় তাদের কাজ করতেও সুবিধা হয়েছে। আদতে দিনটি দখল নিয়ে হিন্দু নববর্ষের প্রতিস্পর্ধী হতে চায় সেকুলার বাঙালি। তাই ভারতীয় সংস্কৃতির সাহচর্যে বাঙালিও নববর্ষ পালন করুক চৈত্র শুক্ল প্রতিপদ তিথিতেই। এই দিনেই ভারতবোধ-সঞ্জাত যাবতীয় ধর্মীয় আচার পালিত হোক বাঙালির ঘরে ঘরে। পূজার্চনা, যাগযজ্ঞ আলপনা, ধূপদীপ প্রদান সব কিছুই হোক। হিন্দু ব্যবসায়ীরাও চাইলে এই দিনটি বিশেষ মর্যাদায় পালন করতে পারেন, শুরু করতে পারেন খেরোখাতা।
আজ ১৩ই এপ্রিল, মঙ্গলবার ২০২১ খ্রিস্টাব্দ; ৫১২৩ যুগাব্দ এবং ২০৭৮ বিক্রম সংবৎ। আজ হিন্দু সম্বৎসরের প্রথম দিন। এই দিন আপামর ভারতবাসীর সঙ্গে বাঙালি হিন্দুদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। বিশিষ্ট বাঙালি সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতে, “বছর শুরুর এই দিনটা আমার মনে হয় শুধু আর্থিক। যেন ব্যবসা সম্পর্কিত মানুষজনের দিনই হল ১ বৈশাখ। তাই এই দিনটিতে উৎসব বলতে আমার আপত্তি আছে। ১ বৈশাখ উৎসব হবে কী করে৷ কতজন মানুষ এই দিনটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত? শুধু ব্যবসায়ী আর বুদ্ধিজীবীরা তো আর সমগ্র জাতি নয়। একটা জাতির কত ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ তারা। এখনও পর্যন্ত তাই ১ বৈশাখ দিনটি সমগ্র জাতির উৎসব বলে চিহ্নিত হয়নি। বোধহয় হবেও না। যেমন দোল, দুর্গোৎসব, দেওয়ালি সমগ্র জাতির কাছে বর্ণ শ্রেণি নির্বিশেষে উৎসব। জাতীয় উৎসব। কোনও না কোনওভাবে সমগ্র জাতির প্রতিটি ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে উৎসবগুলো জড়িয়ে আছে। দোল, দুর্গোৎসব, দেওয়ালির মত ১ বৈশাখ তো আর সবার মুখে হাসি ফোটায় না। রঙও ধরায় না। লোকে যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নববর্ষের উৎসবে যোগদান করতে নাই পারে তা হলে শুধুমাত্র অফিস-আদালত বন্ধ করে সে উৎসবের আমেজ আনা যাবে না। সাধারণত এদিনটায় যেহেতু ছুটি থাকে তাই দেখি বাবুরা সব দল বেধে বন্ধুবান্ধব-স্ত্রীপুত্র নিয়ে মোটর হাঁকিয়ে চললেন দীঘা নয়তো ডায়মন্ডহারবার।”
ঠিকই বলেছেন অন্নদাশঙ্করবাবু। বাঙালি বাঙালি করে চেঁচিয়ে ভারতবর্ষীয় মূলস্রোত থেকে বাঙালিকে বিছিন্ন করার মানসেই পয়লা বৈশাখের বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রমরমা। আপনিই বলুন, পয়লা বৈশাখের কী প্রাচীন ঐতিহ্য আছে, যা চৈত্র শুক্ল প্রতিপদ তিথিতে পাওয়া যায়? হিন্দু বিশ্বাস, চৈত্র শুক্ল প্রতিপদ তিথি হচ্ছে জগৎ সংসার সৃষ্টির প্রারম্ভ-দিবস। এদিন মহর্ষি গৌতমের জন্মতিথি। এদিন বিক্রম সংবৎ–সহ অন্যান্য বহু সংবৎ-এর শুভারম্ভ। এদিনেই সূচনা নবরাত্রি উৎসবের। এদিনেই মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের রাজ্যাভিষেক তিথি। আবার এদিনেই আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. হেডগেওয়ারের জন্মতিথি।

কিন্তু সেকুলার বাঙালির মাথায় একটিই মূলসূত্র ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হল বঙ্গাব্দের সঙ্গে হিজরির হিসেবনিকেশ। আকবরের ইলাহি ক্যালেণ্ডারের শুরু হিজরি ৯৬৩ সালে, অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। বর্তমানে ২০২১ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ ইলাহি শুরুর পর ২০২১-১৫৫৬=৪৬৫ বছর এগিয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই ৪৬৫-র সঙ্গে হিজরি ৯৬৩ যোগ করলে দাঁড়ায় (৯৬৩+৪৬৫=১৪২৮) বঙ্গাব্দের হিসাব। এবার ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। যেহেতু মোগল উত্তরাধিকার নিয়ে চলতেই বেশি পছন্দ সেকুলার বাঙালির, সেজন্যই হিন্দু বর্ষ প্রতিপদ পালনে তাদের প্রবল অনীহা। বাঙালি হিন্দু তা বুঝবে কবে?


মোগলাই নববর্ষ বলে কিছু হয় না।