Krishna Gopal, Kolkata, ‘স্বদেশী বলিদান দিবস’-এ ভারতীয় বোধে জাগরিত হবার বার্তা দিলেন কৃষ্ণ গোপাল

আমাদের ভারত, কলকাতা, ১৪ ডিসেম্বর: গত ১২ ডিসেম্বর কলকাতার আলিপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরির ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ভাষা ভবন অডিটোরিয়াম-এ, স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ ও স্বদেশী রিসার্চ ইন্সটিটিউট-এর উদ্যোগে এবং ন্যাশনাল লাইব্রেরির সহযোগিতায় ও বড়োবাজার লাইব্রেরির সাপোর্টে পালিত হলো ‘স্বদেশী বলিদান দিবস’।

এই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সহ-সর কার্যবাহ ড: কৃষ্ণ গোপালজী এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সি.ভি. আনন্দ বোস। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ধনপত রাম আগরওয়াল (ন্যাশনাল কো-কনভেনার, স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ এবং ডিরেক্টর- স্বদেশী রিসার্চ ইন্সটিটিউট) ও শ্রী ঠাকুর সমীর ব্রহ্মচারী মহারাজ (প্রেসিডেন্ট, বিশ্ব সেবাশ্রম সঙ্ঘ) মহোদয় দ্বয় এবং ন্যাশনাল লাইব্রেরির ডিরেক্টর ড: অজয় প্রতাপ সিং।

প্রতি বছর স্বদেশী বলিদান দিবস পালন করা হয় হুতাত্মা বাবু গেণুর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে। যিনি স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণ ও বিদেশি পণ্য বর্জন করার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে মাত্র ২২ বছর বয়সে, ১৯৩০ সালের ১২ ডিসেম্বর নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেন। বিদেশী কাপড় আমদানির বিরুদ্ধে ভারতীয় স্বাধীনতা কর্মীদের দ্বারা আয়োজিত বিক্ষোভে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন।

১৯৩০ সালের ১২ ডিসেম্বর, ভারতের ম্যানচেস্টারের একজন কাপড় ব্যবসায়ী জর্জ ফ্রেজিয়ার, ফোর্ট অঞ্চলের পুরাতন হনুমান গলিতে অবস্থিত তার দোকান থেকে ট্রাকে করে মুম্বাই বন্দরে বিদেশী তৈরি কাপড় পরিবহন করছিলেন। তার অনুরোধ অনুসারে তাকে পুলিশ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। কর্মীরা ট্রাকটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশ বিক্ষোভকারীদের জোর করে সরিয়ে দেয় এবং ট্রাকটি সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। কালবাদেবী রোডের ভাংওয়াড়ির কাছে, বাবু গেনু ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে মহাত্মা গান্ধীর প্রশংসা করতে করতে চিৎকার করে ওঠেন। পুলিশ চালককে বাবু গেনুর উপর দিয়ে ট্রাকটি চালানোর নির্দেশ দেয়, কিন্তু চালক তা প্রত্যাখ্যান করে বলে, “আমি ভারতীয় এবং সেও ভারতীয়, তাই, আমরা দু’জনেই একে অপরের ভাই, তাহলে আমি কীভাবে আমার ভাইকে হত্যা করতে পারি?” এরপর, পুলিশ বাবু গেনুর উপর দিয়ে ট্রাকটি চালিয়ে তাকে পিষে দেয়। এর ফলে মুম্বাই জুড়ে বিক্ষোভের এক বিশাল ঢেউ ওঠে। সেই থেকে পালিত হয় এই দিনটি।

এই অনুষ্ঠানে ঠাকুর সমীর ব্রহ্মচারী মহারাজ বলেন, আমাদের ঋষি-মনীষীরা বেদ-উপনিষদে বলেছেন, নৈতিক ভাবে জীবন যাপন করতে হবে। শুধুই ভৌতিকবাদী উন্নয়ন করলে হবে না, ভৌতিকবাদী ও আধ্যাত্মিক – দুইয়ের মিলনে জীবন যাপন করতে হবে, তার জন্য স্বদেশীকে গ্রহণ করতে হবে।

অজয় প্রতাপ বলেন, স্বদেশী দ্রব্য আমরা ব্যবহার করব, কিন্তু তার গুণগত মান বিচার করে গ্রহণ করব। স্বদেশী রিসার্চ সেন্টারের মাধ্যমে গুণগত মান পরীক্ষা করতে হবে। স্থানীয় ভাবে সবাইকে স্বদেশী দ্রব্য ক্রয় করতে হবে এবং বিদেশি পণ্য বয়কট করতে হবে।

ড: কৃষ্ণ গোপালজী বলেন, ইংরেজ আসার আগে আমাদের দেশ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু তারা আসার পর আমাদের দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সভ্যতা কীভাবে ধ্বংস করা যায় সেই চেষ্টা করেছে। তারা বই লিখেছে যে – ভারতে আইন, আদালত, শিক্ষা, শিল্প, চিকিৎসা ইত্যাদি কিছুই ছিল না; আর তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়েছে। ভারত এক বর্বর দেশ ছিল এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে তারা। কিন্তু তারা ভুলে গেছে যে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসত। সেখানে শিক্ষা অবৈতনিক ছিল। সমাজ তার দায়িত্ব নিত। আজ আমরা সব কিছুতেই সরকার করে দেবে এই ভাবনায় মশগুল হয়ে বসে আছি, এই ভাবনা যথাযথ নয়। সমাজের সবাই মিলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করলে তবেই সমাজ ভালো হবে। এটাই ভারতীয় ভাবনা। এক নয়, সবার সাথে মিলে মিশে সামাজিক কাঠামোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাহলে সমাজের সব ব্যবস্থা ভালো চলবে। স্ব- বোধ তৈরি করতে হবে আমাদের। স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ ও রিসার্চ ইন্সটিটিউট সেই কাজই করছে। আমাদের ব্রেন থেকে বিদেশি ভাবনাকে ত্যাগ করতে হবে আগে। মানসিকতা বিদেশি থাকলে আমরা ভারতীয় হয়ে উঠতে পারব না। তাই আসুন আগে নিজেদের মনকে ভারতীয় করি, তাহলে সব কিছুই স্বদেশী হয়ে যাবে।

ড: ধনপত রাম বলেন, উনবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক ভাবে যে পুঁজিবাদ সৃষ্টি হলো তার পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিজম বা মার্কসবাদও তৈরি হয়। এই দুটোর মারফতে সারা পৃথিবীতে আমরা দেখি যে – দারিদ্র্য বেড়েছে, আর্থিক বৈষম্য বেড়েছে। সারা বিশ্বে পর্যাবরণের সমস্যা বেড়েছে। উপভোক্তাবাদ ও বাজারবাদের কারণে প্রতিটি মানুষ ঋণে জর্জরিত হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এখান থেকে বের হবার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের দেখানো পথে চলতে হবে। পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়, দত্তপন্থ বাপুরাও ঠেংরির দেখানো পথে চলতে হবে। স্বদেশীকে আধার করে জীবন সহজে কীভাবে কাটানো যায় সেই পথ তারা তাদের দর্শনে ব্যক্ত করেছেন। প্রকৃতিকে শোষণ করে নয়, তাকে পোষণ করে আমাদের জীবন অতিবাহিত করার পথ দেখিয়েছেন তারা। মানুষ শুধুই ভোগ নয়, তারা ত্যাগের মাধ্যমে এই সমাজকেও গড়বে – তা হবে স্বদেশী সমাজ। এই ভাবনা নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা – ‘স্বদেশী সমগ্র উন্নয়নের মন্ত্র’।

রাজ্যপাল বোস বলেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষে অর্জুন ভাবছেন- আমি যুদ্ধ জিতেছি, কৃষ্ণ কে? সে আমার সারথী মাত্র। তখন হঠাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের রথ থেকে নেমে দাঁড়ালেন। সাথে সাথে রথ ধ্বংস হয়ে গেল। অর্জুন প্রশ্ন করলেন, এমন কেন হলো সারথী? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দিলেন- এতোক্ষণ এই রথের উপর এতো বীরেরা তাদের ধ্বংসাত্মক বাণ নিক্ষেপ করেছেন কিন্তু তবুও এই রথের কিছু হয়নি কেন জানো? কারণ আমি এর সারথী ছিলাম, স্বয়ং ভগবান তোমার রথকে রক্ষা করেছেন। আমি নেমে যাবার সাথে সাথে এই রথের বিনাশ হয়ে গেল।

তেমনি ভারতের বিশ্ব গুরু হবার রথ চালনা করছেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী। তাই শত আঘাত সত্ত্বেও তার কিছুই হচ্ছে না। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে স্বদেশী জাগরণ ও স্বদেশী পণ্যের বিশ্ব বাণিজ্য চলছে। আমাদের তার সাথ দেওয়া উচিত।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করা হয় বাবু গেনু, পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়, দত্তপন্থ বাপুরাও ঠেংরি ও ভারত মাতার প্রতিকৃতিতে। তারপর অতিথিরা প্রদীপ প্রজ্বলন করেন। উপস্থিত সবাইকে উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রতিমা মণ্ডল। দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন করেন শর্মিষ্ঠা রায়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অম্লান কুসুম ঘোষ। দেশের মাটি কল্যাণ মন্দির-এর পক্ষ থেকে মিলন খামারিয়া অস্মিতা চক্রবর্তী সম্পাদিত, ড: কল্যাণ চক্রবর্তীর প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘কৃষি-কল্যাণ কথা’ তুলে দেন রাজ্যপাল সি.ভি. আনন্দ বোস, সমীর ব্রহ্মচারী মহারাজ ও ধনপত রামজীর হাতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *