*পুরভোট আসছে। ভাড়াটিয়া সমস্যা কলকাতার বাজারের বিকাশের একটা বড় অন্তরায়। গৃহমালিক সমিতির কর্তা সুকুমার রক্ষিতের মতামত জানলেন অশোক সেনগুপ্ত।*
আমাদের ভারত, ১১ ডিসেম্বর: বাড়ি ও বাজার দুইয়ের প্রয়োজন সবার। বাড়ি বসতের জন্য, বাজার জীবনধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সেবা বাণিজ্যিক ভাবে উপলব্ধ হওয়ার জন্য। চাহিদা থাকলেই যোগান আসে। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর কলকাতায় ব্যবসা, বাণিজ্য ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের জন্য বাজারের পত্তন ও বিনিয়োগ ছিল প্রয়োজনীয়, নিরাপদ ও লাভজনক।
রানি রাসমনি মন্দির ও ঘাট নির্মাণের মতন, জনস্বার্থে কলকাতার ভবানীপুরেও বাজার পত্তন করে দান করেন দৌহিত্র যদুনাথ চৌধুরীকে। ইংরেজদের প্রয়োজনে তৎকালীন কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশন ১৮৭৪-এ ম্যাকিনটোশ বার্ন-কে দিয়ে তৈরি করেছিল প্রথম পৌর বাজার হগ মার্কেট, যা আজ নিউ মার্কেট। এরও অনেক আগে, ১৭৮৮-তে এডওয়ার্ড টিরেট্টা-র পত্তন করা বাজার আজ ‘টেরেটি বাজার’। পরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পত্তন হয়েছে অনেক বাজার— ছাতুবাবু, হরি শাহ, মানিকতলা ইত্যাদি। বাজারগুলোর বর্তমান জীর্ণ দশা ও হকার- সমস্যার সমাধানে এদের সম্ভাব্য ভূমিকা আজও উপেক্ষিত।
শ্যামবাজারে ‘অমিয়বাবুর বাজার’-এর বর্তমান কর্ণধার সুজয় দে জানালেন, “তখন স্টল ভাড়ার চুক্তি ও মূল্যবৃদ্ধি-জনিত ভাড়া-বৃদ্ধি হ’ত সৌজন্যমূলক আলোচনার মাধ্যমে। ১৯৫৬-তে ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রেমিসেস টেনান্সি অ্যাক্ট -এর আওতায় এ’লো বাজারগুলো। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তিত হয়ে এল নতুন মূল্যবোধ। নতুন নীতিতে মূল্যবৃদ্ধি না-থামলেও ভাড়া রইল থেমে।
হুকুম বা আইনে অর্থনীতির নিয়ম আদৌ নিয়ন্ত্রিত হয় না। ফলে যা হবার তাই হ’ল, ‘বাজার’-এর অর্থনীতি হারাল উদ্যম, দিশা ও স্বাস্থ্য। চঞ্চলা বিনিয়োগ একে ব্রাত্য করে চলল মল ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের দিকে। আইনী ঝামেলা এড়াতে, ব্যক্তিগত-উদ্যোগে তৈরি বাজারে দোকান পাওয়া যেত বিক্রির শর্তে বা ১০,০০০ টাকার বেশি ভাড়ায়।”
লোকসংখ্যা বৃদ্ধি ও উপার্জনের আশায় গ্ৰাম শহরমুখী হতেই চাহিদা বাড়ল বাজার-স্টলের।
সুজয়বাবু তাঁর ক্ষোভ জানালেন, “লাভ ওঠাতে, অনেকেই টাকা নিয়ে সাব টেনান্ট বসালেন। বিবাদকে মীমাংসার বদলে নিয়ে যাওয়া হ’তে থাকল ‘রেন্ট কন্ট্রোলে’। চুক্তি প্রথার সময় এই সমস্যা ছিল না! ভাড়া না-পেয়ে মালিকদের অর্থনীতি বিপন্ন। কী ভাবে তারা কর দেবে ও বাজারের রক্ষনাবেক্ষন করবে তার বিচারের দায় কার?”
যত্রতত্র বাজার বসছে, নেই বাজারের জন্য আলাদা বাড়ি। বাজার তখনই হয়েছে যখন কেআইটি, কেএমডিএ ইত্যাদি সরকারি সংস্থার উন্নয়নমূলক কাজে জমি বা বাস্তু অধিগ্ৰহণের ফলে বাসিন্দারা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এঁদের পুনর্বাসনের জন্য তৈরি ফ্ল্যাটের নীচে বসানো হয়েছে বাজার। ওপরে বাস, নীচে বাণিজ্য— আদৌ সুস্থ পরিবেশ নয়।
প্রত্যেক বাজারে উপছে উঠছে বিক্রেতার ঢল, স্টল পেরিয়ে তারা নেমেছে মাটিতে ও দু’ধারে! রাস্তায় ও পাড়াতেও প্রসারিত হচ্ছে বাজার। মল-এর চেয়ে ভাড়ায়-প্রাপ্ত দোকান/স্টল এর বাজার বেশি জরুরী। এতে বাড়বে কর্মসংস্থান; শহর হবে হকার-মুক্ত ও থাকবে পরিষ্কার। ৩/৪- তলা বাজার-বাড়ি হোক, চওড়া র্যাম্প-সহ। রোদে পোড়া, জলে ভেজা, মালপত্র বাজেয়াপ্ত, উচ্ছেদ,
বাধ্যতামূলক ‘চাঁদা’ ও ‘ ব্রিগেড’, ‘মিছিল’ থেকে রেহাই পেয়ে তারা নিশ্চিন্ত ও সম্মানিত বোধ করে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবে। ১৮১৭ সালে লটারি কমিটি কলকাতার উন্নয়ন করত লটারির টিকিট বিক্রির আয় থেকে। চালু হোক না আবার এই পদ্ধতি!
হকার সমস্যার সমাধান অত্যন্ত জরুরী। যে কোনও সময়ে জোরালো দাবি উঠবে ২০১৪ সালের ষ্ট্রিট ভেন্ডার অ্যাক্ট চালু করার। কলকাতার রাস্তার অপ্রতুলতার কারণে, ওই আইন পালিত হ’লে প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াও নাগরিক জীবনে আসবে চরম বিশৃঙ্খলা, যা অনেকটা এড়ানো যাবে আরও অনেক বাজার তৈরি করে। হোক লটারি, আসুক বাজার, শহর হোক পরিষ্কার। নতুন প্রশাসকের কাছে এই আমাদের দরবার।

