জয় লাহা, দুর্গাপুর, ১৫ জুন: লকডাউনের জেরে অনেকটাই কমছিল পরিবেশ দূষণ। তার মধ্যে অন্যদিকে তখন মদ কারখানার বর্জ্য জলে বিপন্ন ঐতিহাসিক খড়ি নদী। নষ্ট হচ্ছে সেচ ক্যানেল ও চাষজমি। দূষিত হচ্ছে জলাশয়। সেচ ক্যানেলে চাষের জলের বদলে বইছে দূষিত জল। দুর্গন্ধে ওষ্ঠাগত প্রাণ গ্রামবাসীদের। এমনই নজিরবিহীন দূষিত জলে আক্রান্ত বুদবুদের মাড়ো, ভিড়সিন সহ একাধিক গ্রামের বাসিন্দারা। অভিযোগ জানিয়েও সুরাহা না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে গ্রামবাসীরা।

উল্লেখ্য, পানাগড় শিল্পতালুকে রয়েছে বেসরকারি মদ তৈরীর কারখানা। বছর ছয়েক ধরে ওই কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে। উৎপাদন শুরু হতে মাত্রারিক্ত দূষণে জেরবার আশপাশের কোটা, চন্ডীপুর, নতুনগ্রাম, মাড়ো সহ ১০ টির বেশি গ্রামের বাসিন্দারা। কারখানার মদ তৈরীর সময় পচা দুর্গন্ধে অতিষ্ট এলাকাবাসীরা। তবে বেশি আক্রান্ত মাড়ো গ্রামের বাসিন্দারা। কারখানার বর্জ্য জল মিশছে পার্শবর্তী খড়ি নদী ও এমসি-৩ সেচ ক্যানেলে। আর ওই সেচ ক্যানেল মাড়ো গ্রামের একাধিক পুকুরে মিশছে। শুধু তাই নয় আশপাশের চাষজমিতে ওই নোংরা জল পড়ে জমির উর্বরতা নষ্ট করছে। দু- বছর আগে গ্রামবাসীদের ক্ষোভের মুখে দূষিত জল ছাড়া বন্ধ হয়েছিল। বছর ঘুরতেই আবারও কারখানার বর্জ্য নোংরা জল ছাড়া শুরু হয়েছে। তাও আবার সেচ ক্যানেলে। আর ওই সেচ ক্যানেল থেকে খড়ি নদীতে দূষিত জল মিশছে। একই সঙ্গে আশপাশের চাষজমি, পুকুর, জলাশয়ে।
উল্লেখ্য, খড়ি নদী পূর্ব বর্ধমানের মাড়ো গ্রামের উত্তর দিক হতে নির্গত হয়ে বুদবুদ, গলসীর মধ্যে দিয়ে ভাতার থানার কর্জনা-আড়া হয়ে মন্তেশ্বর এলাকায় ঢুকেছে। মন্তেশ্বরের দেনুড় ছুঁয়ে কাটোয়ার শ্রীবাটি সিঙ্গি ঘুরে পূর্বস্থলীর নিমদহ দিয়ে ঢুকে নাদনঘাট হয়ে হাতিপোতা গ্রামের কাছে ভাগীরথীতে মিশেছে। মাড়ো গ্রামের খড়ি নদীর উৎপত্তি স্থলে রয়েছে খড়্গেশ্বরী মায়ের মন্দির। প্রতি পৌষ সংক্রান্তিতে পুজো, নাম কীর্তন ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়। একইরকম মেলা অনুষ্ঠান হয় খামারগ্রামে। পৌষমেলায় নামকীর্তনের পাশাপাশি কবিগান, বাউলগান, টুসুগান ইত্যাদি হয়, নদীতে ভাসানো হত ফুলমালা সাজিয়ে নতুন হোলা। বর্তমানে মদ কারখানার বর্জ্য জলে বিপন্ন খড়ি নদী। ওই দূষিত বর্জ্য জলে এখন আর কেউ স্নান করতে পারে না। পচা দুর্গন্ধে অতিষ্ট নদী তিরবর্তী গ্রামবাসীরা।

ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা জানান, “গত একবছর ধরে কারখানার নোংরা জল খড়ি নদী, সেচ ক্যানেল ও চাষজমি, জলাশয়ে মিশে দুষিত করছে। জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। আবার পুকুর জলাশয়ে মেশা কালো দূষিত জল পান করলেই গবাদি পশু অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় দু’শ একরের বেশী দুই ফসলি চাষজমি নষ্ট হওয়ার পথে।”
বাসিন্দারা জানান, “গ্রামের মাঝে সেচ ক্যানেল। আর ওই ক্যানেল দিয়ে কারখানার দুষিত জল বয়ছে। দুর্গন্ধে অতিষ্ট। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই ওই দুষিত জল বাড়ীতে ঢুকবে। করোনার মাঝে দুষিত জল নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে এলাকায়।” পানাগড় শিল্পতালুকে নতুন শিল্পে মাথায় হাত পড়েছে এলাকাবাসীর। প্রশ্ন, কারখানার বর্জ্য দুষিত জল সেচ ক্যানেলে কেন ফেলা হচ্ছে? এরকম একটি দুষণ সৃষ্টিকারী সংস্থাকে কৃষিপ্রধান এলাকায় কারখানার তৈরীর ছাড়পত্র কিভাবে দেওয়া হল? কেনই বা দুষন দফতর নজরদারি করছে না?
মানকর পঞ্চায়েত প্রধান তথা মাড়ো গ্রামের বাসিন্দা মঙ্গলা রুইদাস জানান,” ওই কারখানা দুষিত জলে গোটা গ্রাম আতঙ্কে। বহুবার কারখানা কর্তৃপক্ষকে প্ররিশ্রুত না করে দূষিত জল ফেলা বন্ধ করার জন্য নোটিশ করেছি। কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি।” যদিও এসব বিষয়ে কোনোরকম মুখ খুলতে চায়নি অভিযোগ ওঠা কারখানা কর্তৃপক্ষ।” দুর্গাপুর আঞ্চলিক দুষণ দফতর জানিয়েছি। এরকম কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্গাপুর সেচ দফতরের আধিকারিক সঞ্জয় সিং বলেন, “সেচ ক্যানেল কিম্বা নদীতে দুষিত জল ফেলা যায় না। সেরকম কোন অনুমতি নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।”

