আমাদের ভারত, বর্ধমান, ৪ আগস্ট: রমজান আলি শেখ। বয়স বছর আটত্রিশ। সবাই তাকে চেনে ডেকরেটার্স ব্যবসায়ী হিসেবেই। একটু বদমেজাজি হওয়ায় পারতপক্ষে কেউ তার সঙ্গে খোশগল্প করতে যায় না। সেই সঙ্গে সে আবার নিজেকে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে দাবি করে। পান থেকে চুন খসলেই তৃণমূল কংগ্রেসের নাম করে মানুষকে ভয় দেখাতো। তাই কাজের বাইরে কেউ তার সঙ্গে সেভাবে মেলামেশা করতো না। কিন্তু ডেকরেটার্সের ব্যবসার নামে রমজান আলি যে বাড়িতে অস্ত্র কারখানা গড়ে তুলেছিল সেটা ভেবে উঠতেই শিউরে উঠছেন গ্রামবাসীরা।
পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া থানার লোহাপোতা গ্রাম। ওই গ্রামের পূর্ব পাড়াতেই বাড়ি রমজান আলি শেখের। মাটির বাড়ি। বাড়িটা কিছুটা নির্জন এলাকায়। সেই বাড়িতে বসেই চলছিল বিভিন্ন অস্ত্র তৈরি। গোপন সূত্রে সেই খবর পেয়ে কাটোয়া থানার পুলিশ রমজানের বাড়িতে অভিযান চালায়। বাড়িতে ঢুকে পুলিশ ‘থ’ বনে যায়। একদম বিহারের মুঙ্গেরের স্টাইলে চলছে অস্ত্র তৈরি। পুলিশ সেই ঘর থেকে একটা দেশি পাইপগান, একটা একনলা বন্দুক, ১৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। এছাড়া অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম হিসেবে উদ্ধার করে ড্রিল মেসিন, স্প্রিং, লেদ মেসিন, বন্দুক তৈরি করার জন্য বিভিন্ন সাইজের বাঁট, গ্যাস সিলিন্ডার, স্টেবিলাইজার, লোহার বড়ো বড়ো স্প্রিং সহ অন্যান্য সামগ্রী।

কিন্তু পুলিশ আসার আগেই রমজান পালিয়ে যায়। দিন কয়েক আগে তার স্ত্রী ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়িতে গেছে। পুলিশ রমজানের বাবা ও মায়ের সঙ্গে কথা বলে।
রমজানের মা সামিয়ানা বিবির দাবি, তারা পাশের ঘরে থাকেন। তাই ছেলের ঘরে কী হয় তাদের জানা নেই। তবে তার ছেলে অস্ত্র বানাতে পারে সেকথা স্বীকার করতে চাননি তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যেহেতু রমজানের বাড়ি গ্রামের একটা প্রান্তে। কিছুটা ফাঁকা জায়গায় তাই বাড়িতে কী কাজ চলতো সেটা তারা বুঝতে পারেনি। তবে রাতের দিকে ওই বাড়িতে লোকজন যাতায়াত করতো বলে তারা দেখেছেন। একটু চাষের কাজ ছাড়াও মূলত সে ডেকরেটার্সের জিনিসপত্র ভাড়া দিত। এদিকে যেহেতু রমজান ছিল বদমেজাজি ও তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে কথায় কথায় মানুষকে শাসাতো তাই গ্রামের মানুষ খুব একটা তার সঙ্গে মেলামেশা করতো না।
পুলিশ জানতে পেরেছে, রাতের দিকে রমজানের বাড়ি থেকে প্রায় দিন জোরে বক্স বাজানোর আওয়াজ পাওয়া যেত। যাতে লেদ মেসিনের আওয়াজ কোনভাবেই নিশুতি রাতে আশেপাশের মানুষজন শুনতে না পায়।
কিন্তু পুলিশকে দু একটা বিষয় ভাবাতে শুরু করেছে?
যে অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম পুলিশ উদ্ধার করেছে তা খতিয়ে দেখে পুলিশের অনুমান বিহারের মুঙ্গেরের কায়দায় দেশীয় প্রযুক্তিতে এই অস্ত্র তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেই অস্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ রমজান আলি কীভাবে পেল তা ভাবাচ্ছে পুলিশকে?
এই অস্ত্র তৈরি করার পরে সেই অস্ত্র কোথায় যায়, কারা নিয়ে যায়, তারা কোথা থেকে আসে সেই বিষয়গুলিও পুলিশ খতিয়ে দেখছে। এছাড়া এই অস্ত্র তৈরি রমজান শুধুমাত্র একাই তৈরি করতো নাকি আরো কোন কারিগর ছিল সেই খোঁজও পুলিশ নিচ্ছে।
পূর্ব বর্ধমান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গ্রামীণ) ধ্রুব দাস বলেন, প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান ওই ঘরে অস্ত্র তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছিল। সেখান থেকে বেশ কিছু অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম পুলিশ উদ্ধার করেছে। রমজান আলির খোঁজ চলছে।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, রমজান আলি কোনও দিনই তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী ছিল না। সে আগে সিপিএম করতো। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে। দোষী ধরা পড়লে শাস্তি পাবে।

