আমাদের ভারত, কলকাতা, ১ জুলাই: করোনার ধাক্কা কি শেষ পর্যন্ত কাটিয়ে ওঠা যাবে? এই দোলাচলেই অবশেষে দু’বছর পর ফের সেজে উঠেছে বাংলার যাত্রাপাড়া চিৎপুর। রথের শুভ দিনে শিল্পী, প্রযোজক ও ইউনিয়নদের সংগঠন এক সঙ্গে মিলে, যাত্রা অ্যাকাডেমির সাহায্যে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেয় প্রতি বছর। থাকে বেশ কিছু কর্মসূচি। এ দিন মুক্তি পায় নতুন যাত্রার পোস্টার। তাই দিনভর ব্যস্ততা।

উত্তর কলকাতার গড়ানহাটা এলাকায় সারি সারি যাত্রার অফিস। রথের দিন গোটা তল্লাটে থাকে একটু অন্য রকম ছবি। ব্যস্ত অপেরা-কর্ণধার রাজু মাইতি। বয়স ৩১। তবে বাবা মুকুন্দ মাইতির সঙ্গে থেকে আশৈশব দেখেছেন, শিখেছেন যাত্রার অআকখ। শুক্রবার এই প্রতিবেদককে বলেন, “এদিন থেকে আমাদের বুকিং শুরু হয়। সব নতুন পালা। আমার তিনটে অপেরা। গত বছর ‘প্রভাস অপেরা’ আর ‘রাজদীপ অপেরা’ যথাক্রমে ৮৭ ও ৫৬টি যাত্রার বরাত পেয়েছিল। ‘রাজেশ্বরী অপেরা’-র পালা এখনই নামাচ্ছি না। তবে গতবারের চেয়ে বাজার ভাল হবে বলে আশা করছি।”
বিভিন্ন যাত্রার বুকিং করেন যাঁরা, তাঁদের বলে ‘নায়েক’। এখন ‘কমিটি’ও বলা হয়। তাঁরাও এ দিন গায়ে আতর লাগিয়ে এসেছেন যাত্রাপাড়ায়। গত দু’বছর, অর্থাৎ ২০২০ ও ২০২১ সাল, বাংলার যাত্রাজগতের কাছে সময়টা ভাল ছিল না। করোনার কারণে থমকে ছিল যাত্রা। দীর্ঘ সময় পর পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হয়েছে। ফলে, রথের দিন আবার কিছুটা হলেও সেজে উঠেছে চিৎপুর।

রীতি মেনে এবারও নতুন শিল্পীদের জন্য ১৫ দিনের কর্মশালা শুরু হবে আজ। এখানে যাত্রা শেখাবেন যাত্রার প্রথিতযশা শিল্পীরা। প্রকাশিত হল ‘যাত্রা দর্পণ’ নামের একটি বই। যাতে আছে কলকাতার ৫০-৬০টি যাত্রা দলের নাম ও শিল্পীদের তালিকা। আছে পোস্টারও। এই পোস্টার দেখেই নায়েকরা অগ্রিম বুকিং করবেন। হবে নতুন লগ্নি।
এবারের নতুন সংযোজন ‘বাদামকাকু’ ভুবন বাদ্যকার। তাঁকে দেখা যাবে যাত্রার মঞ্চেও। রথের আগেই যাত্রায় যুক্ত হওয়ার অফার পেয়েছেন ভুবন। যাত্রাপালার নাম ‘খোকাবাবুর খোলাঘর’। ‘শ্রী দুর্গা অপেরা’র এই যাত্রার জন্য রিহার্সাল শুরু করবেন তিনি। ‘বাদামকাকু’ আগেই বলেছেন, “যাত্রা পালায় আমি পিতাজির (পড়ুন বাবা) চরিত্রে অভিনয় করছি।” এরপর অত্যন্ত সরল ভঙ্গিতে ভুবন জিজ্ঞেস করেন, “যাত্রায় অভিনয় করতে কি কোনও বাধা আছে?” বলেন, “আমি কোনও দিনও কোনও যাত্রাপালায় অভিনয় করিনি। ওঁদের ভাল লাগছে আমার অভিনয়। আমি মনে করি, মানুষ হয়ে জন্মেছি যখন, আমাকে সব কিছু শিখতে হবে। মানবজন্মের উদ্দেশ্যই হল সব কর্ম করো। কোনও কাজকেই ছোট কিংবা বড় ভাবি না। আপনাদের, বাবা-মায়ের ও ঈশ্বরের আশীর্বাদ থাকলে সবকিছুই আমি করতে পারব।”
দীর্ঘ দু’বছর পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে যাত্রা জগৎ। পুরোদমে শুরু হবে নতুন যাত্রার মহড়া। সেজে উঠবে মঞ্চ। ফের ভিড় জমবে খোলা ময়দানে, এই আশাতেই আপাতত বুক বাঁধছে চিৎপুর। এ বিষয়ে ‘সংগ্রামী যাত্রা প্রহরী’-র সচিব ও অভিনেতা অনুভব দত্ত বলেন, “এবছর আবার নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সব দল নতুনভাবে জেগে উঠেছে। গ্রাম বাংলাতে যাত্রার উন্মাদনা এখন তুঙ্গে।”
যাত্রার দর্শক বেশি জেলায়, গ্রামে। শহুরে বাবুদের আগ্রহ তুলনায় কম। এই প্রতিবেদক অপেরা’-র কর্ণধার রাজু মাইতিকে প্রশ্ন করে জানলেন, এক একটা পালা হয় পৌনে তিন ঘন্টা থেকে সওয়া তিন ঘন্টা। ‘প্রভাস অপেরা’-র জন্য নিই ৭০ হাজার টাকা। আর রাজদীপের জন্য ৯০ হাজার টাকা। আগে লাভের যে মুখ দেখা যেত, এখন তা যায় না। কুশীলব কারা? রাজুবাবু জানান, “প্রেমজিৎ, অভিজিৎ, অয়ন্তিকা, তিস্তা, রাহি— এঁরা সকলেই টলিউডের বা ছোট পর্দার পরিচিত মুখ।”
যাত্রা জগতের ‘সুচিত্রা সেন’ কাকলি চৌধুরী বলেছেন, “যাত্রা দেখার জন্য মানুষ অপেক্ষা করছেন। এই দু’বছরে মানুষের যাত্রা দেখার খিদে আরও বেড়ে গিয়েছে। আমাকে দুটো পোস্টারে দেখা যাবে। আমিই নায়িকা। আমাদের কোম্পানি দুটো যাত্রাপালা করছে এ বছর।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যাত্রা অ্যাকাডেমির সভাপতি অরূপ বিশ্বাস। ছিল রথের মাঙ্গলিক পুজোর আয়োজনও। যাত্রা জগতের কল্যাণে এই পুজো করা হয়।
বেলা যত গড়িয়েছে, বেড়েছে যাত্রাপাড়ার ব্যস্ততা। কলকাতায় আছে নানা ধরণের গোটা ৫০ অপেরা। বেশ কয়েকশো পরিবারের রুজি জড়িয়ে এই যাত্রাশিল্পের সঙ্গে। শুক্রবার ওঁদের অনেকেই ছিলেন চিৎপুরের সমাবেশে। মেঘ-রোদ্দুরের খেলায় কতটা আশার বার্তা পেলেন ওঁরা, কতটা চওড়া হল ওঁদের হাসি— একমাত্র সময়ই তার উত্তর দেবে।

