জগদ্ধাত্রী পুজোর উৎপত্তিস্থল শান্তিপুরের ব্রহ্মশাসন হলেও শান্তিপুরবাসী তা ধরে রাখতে পারেনি

স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া, ৩১ অক্টোবর: নগর শহর শান্তিপুরের অনতি দূরে ব্রহ্মশাসন। যা এক সময় নদীবন্দর ভাগীরথীর ধারেই গড়ে উঠেছিল। নদীকে কেন্দ্র করে হরিপুর ছাড়িয়ে ব্রহ্মশাসন ১০৮ ঘর ব্রাহ্মণ ও ঘোষ সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। সেই সময় নদিয়ার রাজা ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পিতা রঘু রায়। তারপর কৃষ্ণচন্দ্র রাজা হলে তিনি রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সহায়তা না করে মিরজাফর’কে সাহায্য করেন। যার ফলে তিনি নদিয়া রাজ উপাধি পান। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভ মিরজাফরকে সরিয়ে মীরকাশিম’কে সিংহাসনে বসানোর পর সমগ্র নদিয়ায় বকেয়া কর নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্রের বিবাদ বাধে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ নেওয়ার জন্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কর দিতে অস্বীকার করলে মীরকাশিম কৃষ্ণচন্দ্রকে আটক করে বিহারের মুঙ্গেরের জেলে বন্দি করেন। কারণ ক্ষমতা পাওয়ার পরই মীরকাশিম তার রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে সরিয়ে মুঙ্গেরে স্থাপন করেছিলেন।

১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে পাটনায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মীরকাশিমের যুদ্ধ বাধলে এক রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। বিচক্ষণ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মুঙ্গের থেকে পলায়ন করেন। জলপথে ফেরার সময় ধুবুলিয়া অঞ্চলের রুকুনপুর অঞ্চলে তিনি দেখেন দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জনের দৃশ্য। তার প্রিয় আরাধ্যা দেবী দুর্গা রাজরাজেশ্বরীর পূজা না করতে পারার কারণে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র খুব ব্যথিত হন। সেই রাতেই রাজা স্বপ্নাদেশ পান দেবীর। দেবী আদেশ দেন আগামী কার্তিকী শুক্লা তিথিতে তিন দিনের জন্য পূজার ব্যবস্থা করতে। সেই পূজা হবে সম্পূর্ণ দুর্গা মন্ত্রেই। দেবীর নাম হবে জগতের ধাত্রী জগদ্ধাত্রী নামেই।দেবীর কোনো রূপ পাওয়া যায় না। দেবী ঘটেই পূজিতা হন।

এদিকে ব্রহ্মশাসনের ব্রাহ্মণ পণ্ডিত চন্দ্রচুড় তর্করত্ন পঞ্চানন মায়ের স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে দেবী বলেন, তুই আমার পূজা কর। ঘুম থেকে উঠে দেখবি তোর ঘরের দেওয়ালে রবির প্রভা বিকশিত হবে। ঐটিই হবে আমার রঙ। আমি সিংহ বাহিনী। স্বপ্নাদেশ পালন করে চন্দ্রচূড় জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন ব্রহ্ম শাসনে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে এই খবর যায় যে চন্দ্রচূড় নামে এক সাধু শান্তিপুরের হরিপুরে তারই আরাধ্যা দেবীর পূজা করছে। তার কাছে খবর গেলে তিনি চন্দ্রচূড় তর্করত্ন পঞ্চাননকে ডেকে পাঠান। কিন্তু চন্দ্রচূড় নদিয়াধিপতি কৃষ্ণচন্দ্র রাজার আদেশ অমান্য করেন। কৃষ্ণচন্দ্র তখন ভীষণ অপমানে ক্রোধে পেয়াদা নিয়ে নিজেই চন্দ্রচূড়কে বন্দি করে রাজ দরবারে নিয়ে আসার জন্য উপস্থিত হন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি চন্দ্রচূড়ের পাণ্ডিত্য দেখে ভীষণ অবাক হন। বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়ার পর রাজা কৃষ্ণচন্দ্র চন্দ্রচূড় তর্করত্ন’কে তার রাজসভায় থাকার অনুরোধ করেন। কিন্তু চন্দ্রচূড় আপত্তি জানান। তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র জগদ্ধাত্রী মায়ের পাটা রাজ দরবারে নিয়ে যাবার জন্য তাকে জোরাজুরি করেন। তিনি চন্দ্রচূড়কে জানান যে তিনি এই মায়ের ছবিই স্বপ্নে দেখেছেন। তিনি রাজদরবারে মাকে প্রতিষ্ঠা করবেন। চন্দ্রচূড় রাজার এই প্রস্তাবে কোনরকম আপত্তি না করে তাকে মায়ের পাটা, ঘট, ওখানকার মাটি নিয়ে যাবার জন্য বলেন। এরপর রাজবাড়িতে পূজিতদেবী জগদ্ধাত্রী খুব অল্প সময় পরিচিতি লাভ করেন। উপহার হিসেবে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র খুশি হয়ে ওই এলাকার ১০৮ ঘর ব্রাহ্মণের শাসনভার তার ওপরেই ছেড়ে দেন। ১০৮ ঘর ব্রাহ্মণের নামানুসারে ওই এলাকার নাম হয় ব্রহ্মশাসন। যেহেতু তৎকালীন সময়ে চন্দ্রচূড় তর্করত্ন ওই এলাকার শাসনভারের দায়িত্ব ছিলেন তাই তখন থেকেই এলাকার নাম ব্রহ্মশাসন নামে পরিচিত।

এরপর ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পৌত্র গিরিশচন্দ্র রায় যখন নদিয়ার অধিপতি হন তখন তার রাজসভায় সভাপন্ডিতের পদ অলঙ্কৃত করতেন শান্তিপুরের পশ্চিম হরিপুর অঞ্চলের চন্দ্রচূড় তর্ক চূড়ামণি। ১০৮ ঘর ব্রাহ্মণদের মধ্যে তিনিই ছিলেন অন্যতম। গিরিশচন্দ্রই চন্দ্রচূড়’কে অনুরোধ করেন সাধনার মাধ্যমে দেবী জগদ্ধাত্রীর রূপের সন্ধান এবং পুজোর জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি এবং মন্ত্রের অন্বেষণের। রাজার অনুরোধেই চন্দ্রচূড় তন্ত্র সাধনায় বসেন। আর সাধনায় বসে একদিন ব্রাহ্ম মুহূর্তের দেবীর অপূর্ব মৃন্ময়ী রূপের দর্শন পান তিনি। সেই দেবীর গাত্রবর্ণ ছিল ব্রহ্ম মুহূর্তের রং অর্থাৎ ঊষাকালে সূর্যের রঙ। তিনি ছিলেন সিংহবাহিনী চতুর্ভূজা। কথিত আছে সেই সাধনাতেই পুজোর পদ্ধতি এবং মন্ত্রের হদিশ পান চন্দ্রচূড়। স্বয়ং মা জগদ্ধাত্রী, তার পূজার পদ্ধতি ও মন্ত্র চন্দ্রচূড় তর্করত্ন পঞ্চাননকে বলেন। এরপরে সেই পদ্ধতি মেনেই দেবীর ঊষা বর্ণা মৃন্ময়ী রূপ সৃষ্টি করে তিনি সর্বপ্রথম মন্ত্র দ্বারা মূর্তি পূজার শুরু করেন ব্রহ্ম শাসনে। সম্ভবত ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকেই কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে মহা ধুমধামের সাথে এই পুজো শুরু হয়।

পরবর্তীকালে সেই নিয়ম মেনেই রাজবাড়ি সহ বিভিন্ন অঞ্চলে আজও মা জগদ্ধাত্রী পূজিত হয়ে আসছেন। কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির নাট মন্দির থেকে শুরু করে পরবর্তীতে এই পুজো ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে শান্তিপুর, চন্দননগর সহ সারা বাংলায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় শান্তিপুরের ব্রহ্মশাসনে এখনো এই পূজা চললেও এখন সেখানে লোক বসবাস করে না বললেই চলে। তাই হয়তো বাংলার সর্বপ্রথম জগদ্ধাত্রী পূজার স্থান হয়েও আজ লোকসমাজের সেই ভাবে জায়গা করে উঠতে পারেনি শান্তিপুর। যে পুজো আজ চন্দননগরের শ্রেষ্ঠ পুজো, ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় তার উৎপত্তিস্থল শান্তিপুর থেকেই। এটা শান্তিপুরের সর্বস্তরের মানুষের ব্যর্থতা যে জগদ্ধাত্রী পূজার উৎপত্তি শান্তিপুর থেকে হলেও শান্তিপুরবাসী তা ধরে রাখতে পারেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *