ভারতের বিজ্ঞান ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে চায় যাদবপুরের আইএসিএস

অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ২৯ মার্চ: ভারতের বিজ্ঞান ঐতিহ্য তুলে ধরার জন্য একটি সংগ্রহশালা তৈরি করতে চায় যাদবপুরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট ফর দি কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স। এর জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও মডেল সংগ্রহের কাজও শুরু হয়েছে।

প্রায় ১৪৬ বছর আগে কলকাতার ১০ নম্বর বৌবাজার স্ট্রিটে গড়ে তোলা হয় এই প্রতিষ্ঠান। এটি প্রতিষ্ঠায় মহেন্দ্রলালের পাশাপাশি সক্রিয় অবদান রেখেছিলেন
সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের রেক্টর এবং বিজ্ঞানের অধ্যাপক ফাদার ইউজিন লাফোঁ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র ২০ বছর পর এ ধরনের উদ্যোগ সমগ্র ভারতে বিরল এবং অনন্য ছিল। মহেন্দ্রলাল সরকার তাঁর মৃত্যু অবধি এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁরই পুত্র ডাঃ অমৃতলাল সরকার।

প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা আইআইটি কানপুরের প্রাক্তন অধ্যাপক ডঃ তাপস চক্রবর্তী ২০০৬ সালে যাদবপুরের এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “যাদবপুরে নিজের জমিতে প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরিত হয় ১৯৫০-এ। এর পর পুরনো স্মৃতি সংরক্ষণে কে, কতটা উদ্যোগী হয়েছেন জানিনা। তবে, পুরনো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির খোঁজে আমি নিজেও বৌবাজার স্ট্রিটে গিয়েছিলাম। ওখানে আর কিছু নেই। প্রয়োজনীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করে আমাদের গ্রন্থাগারে একটা মহাফেজখানা তৈরি হয়েছে। যাদবপুরে সদ্য নির্মিত ভবনে একটি ঘরে এটি স্থানান্তর করা সম্ভব। এটিকে আরও সমৃদ্ধ করে বারুইপুরে আমাদের সেকেন্ড ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করার ইচ্ছে আছে।”

১৮৭৬ সালেই এই প্রতিষ্ঠার পরিচালনার জন্য একটি বলিষ্ঠ পরিচালক সমিতি গঠিত হয়। এই সমিতিতে যোগ দিয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ দেশ হিতৈষীরা। এছাড়া নিয়মিত পরামর্শ দান করে চলতেন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র,  সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা পদ চালু করা হলে প্রথম অধিকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্যারিমোহন মুখোপাধ্যায়। তার পর পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন চিকিৎসক 
নীলরতন সরকার, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও এই প্রতিষ্ঠানের মৌলিক গবেষণা কাজ শুরু হয় ১৯০৭ সালের দিকে। এই বছরই স্বল্প বয়স্ক বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শিক্ষকতার অবসরে তিনি এখানে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যেতেন। এখানে গবেষণা করেই তিনি রমন ক্রিয়া আবিষ্কার করেন যা তাঁকে নোবেল পুরস্কার এনে দেয়।

১৯৩৩ সাল পর্যন্ত রমন এখানে কর্মরত ছিলেন। এ বছর কলকাতা ছেড়ে তিনি বেঙ্গালুরু চলে যান। এছাড়া ১৯২৮ সালের গ্রীষ্মে নোবেল বিজয়ী জ্যোতিঃ পদার্থ বিজ্ঞানী  সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখর এই প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন জানার আগ্রহে। তাঁর কাকা রমন তাকে আসতে সাহায্য করেছিলেন। আইএসিএস-এ তিনি তৎকালীন প্রথিতযশা বিজ্ঞানীদের সাথে পরিচিত হন যার মধ্যে ছিলেন মেঘনাদ সাহা, শ্রীনিবাস কৃষ্ণণ প্রমুখ। এখানে এসেই তিনি তারার অভ্যন্তরীন ঘটনাবলী এবং জীবনচক্র নিয়ে তিনি চিন্তা করতে শুরু করেন এবং জীবনের প্রথম গবেষণামূলক প্রবন্ধ তথা গবেষণাপত্র লিখেন।

এত ঐতিহ্যের এই প্রতিষ্ঠানে বারুইপুরে সম্প্রসারণের কাজ কিন্তু চলছে ঢিমেতালে। সেখানে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয় প্রায় দেড় দশক আগে। কিন্তু প্রায় ৩২ একর নিচু ও জলা জমি ভরাট করতে সময় লেগেছে। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে তৎকালীন কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হর্ষবর্ধন বারুইপুরে সেকেন্ড ক্যাম্পাসের শিলান্যাস করলেও এখন পর্যন্ত প্রাচীর ছাড়া কিছু হয়নি। অধিকর্তা বলেন, “অর্থের সংস্থান একটা বড় বিষয়। আমরা নানাভাবে এই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *