প্রদীপ দাস, আমাদের ভারত, ২৫ এপ্রিল: আরও দুই দফা ভোট বাকি আছে, কিন্তু তার আগেই কি খেলা শেষ হয়ে গেল, নাকি এখনো বাকি আছে? বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ষষ্ঠ দফা নির্বাচনের পরেই খেলা শেষের বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছেন। তিনি খেলার ফলাফলও জানিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তিন দফা নির্বাচনের পরেই বলেছিলেন “দিদির খেলা শেষ”। আর অমিত শাহও ষষ্ঠ দফা নির্বাচনের দিন বলেছিলেন, বিজেপি-কে ক্ষমতায় আসা থেকে কেউ রুখতে পারবে না। আর সবশেষে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, ভোটের পর তিনি সুপ্রিম কোর্টে যাবেন। তাহলে কি তিনিও খেলা শেষের ইঙ্গিত দিলেন?
নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তৃণমূল জানিয়ে দিয়েছিল, এবার ভোটে খেলা হবে। ধীরে ধীরে সব নেতার মুখেই শোনা গেল খেলা হবে, খেলা হবে। এমনকি এই স্লোগান একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখেও শোনা গেল। এই রাজ্যে একজন মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এই রকম খেলা হবে স্লোগান শুনে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। তৃণমূল এই খেলা হবে প্রচার তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। গান রচনা করে ব্যাপক প্রচার করেছে। প্রথম থেকেই অনেকে এর ভেতরে একটা প্রচ্ছন্ন হুমকির সুর অনুভব করছিলেন। হুমকির সুরের পাশাপাশি কিছু কলা-কৌশলেরও ইঙ্গিত ছিল। মদন মিত্র, অনুব্রত মণ্ডল সেই কলাকৌশলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। খেলার মালমশলা সরবরাহ করার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু তিন দফা নির্বাচনের পর থেকেই খেলা হবে এই শ্লোগান আর তেমনভাবে শোনা যাচ্ছে না। জোরের সঙ্গে খেলা হবে স্লোগান তাদের মুখে আর উচ্চারিত হচ্ছে না। তার পরিবর্তে উন্নয়, আর বিজেপি এলে কী বিপদ হতে পারে তার প্রচার শুরু করেছিলেন।
তৃতীয় দফা নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দিদির খেলা শেষ। সত্যিই কি তিন দফা নির্বাচনের পর দিদির খেলা শেষ করে দিয়েছিল বিজেপি? কি ছিল সেই খেলার কৌশল যা বিজেপি জানতে পরে শেষ করে দিয়েছে? তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জানা গেছে, এই খেলার প্রধান উপকরণ ছিল বাম জমনার ভোট কৌশল। একসময় সিপিএম প্রতি বুথে বুথে ফলস ভোট দিত বলে বহু আলোচিত বিষয়। তাঁদের সেই কৌশলকে বিশিষ্ট সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্ত সায়েন্টিফিক রিগিং নাম দিয়েছিলেন। সিপিএম বিধানসভা অনুযায়ী হিসাব করে নিত, জিততে গেলে তাদের কত ভোট লাগবে। এরপর সেইমতো বাছাই করা ক্যাডারদের দিয়ে বুথ পিছু দশটা বা পনেরোটা করে ভোট দিত। এইভাবে তারা কৌশলে বিরোধীদের পরাস্ত করত। এবার নাকি তৃণমূল সেই খেলাই খেলতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথম দুই দফাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি, বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি এবং তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ সেই অস্ত্র ভোঁতা করে দিয়েছে। ছাপ্পা ভোটের কৌশল প্রথম দেখাতেই শেষ। সেই কৌশল দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দফাতেও কজ করেনি বলে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠমহল থেকে জানা গেছে। অনেকেরই বক্তব্য, তৃণমূলের এই কৌশলের কথা বিজেপি আগেই জেনেগিয়েছিল। তাই প্রধানমন্ত্রী তৃতীয় দফার পর জনসভা থেকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, “দিদির খেলা শেষ। ছাপ্পাভোট আটকানোয় দিদির ঘুম উবে গেছে।”
খেলার দ্বিতীয় কৌশল হিসেবে ছিল ভোটারদের ভয় দেখিয়ে আটকে রাখা। কিন্তু সেটাও ব্যর্থ হয়েছে। বাম জমানায় এরকম ক্ষেত্রে ভোটাররা বুথ মুখো হওয়া তো দূরের কথা, ভয়ে মুখ খুলতেন না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে, মানুষ এবার তার প্রতিবাদ করেছে। এই প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল ২০১৯– লোকসভার নির্বাচনে কোচবিহার থেকে। সেদিন মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বেরিয়ে এসে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এবার এই প্রতিবাদ আরও ব্যাপকভাবে বিভিন্ন জায়গায় দেখা গিয়েছে। ফলস্বরূপ বহু জায়গাতেই কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোটারদের ভোট দানের ব্যবস্থা করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিজেপি প্রার্থীরা নিজে এলাকায় গিয়ে মানুষদের ভোটদান কেন্দ্রের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন।
এইভাবে তিন দফা চার দফাতেই তৃণমূলের সমস্ত খেলার অস্ত্র ভোঁতা করে দিতে পেরেছে বলে বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে। এরপরেও কি তৃণমূলের আর কোনও অস্ত্র আছে? কিন্তু থাকলেও তা যে আর কোনও কাজে লাগবে না ষষ্ঠ দফা নির্বাচনের দিন পুর্ব বর্ধমানের এক জনসভা থেকে অমিত শাহ তা জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “কোই মা’ইকে লাল” নেই যে বিজেপিকে ক্ষমতায় আসা থেকে আটকাতে পারে।
ষষ্ঠ দফা নির্বাচনের পর তৃণমূল নেতাদের সুরও পালটে গেছে। যে তৃণমূল নেতারা বলছিলেন তারা দু’শোর বেশি আসন পাবেন, কেউ কেউ তো আড়াইশো এবং ২৭০ পর্যন্ত উঠেছিলেন, তাঁদের সেই দাবি আর শোনা যাচ্ছে। শুধু তারাই নয় এলাকার ছোটমাপের নেতারাও বুঝে গিয়েছেন খেলায় তারা হেরে গিয়েছেন। তাই ষষ্ঠ দফার নির্বাচনের দিন তৃণমূল ছোটমাপের নেতাদের পাল্টি খাওয়া দেখা গেছে। পঞ্চম দফা পর্যন্ত যাঁরা তৃণমূলের হয়ে মাঠে ময়দানে প্রচার করেছেন সেদিন তাদের অনেককেই দেখা গেছে বিজেপির ক্যাম্প অফিসে। দলের নিচুতলা থেকে ওপর পর্যন্ত সকলের হাবভাবেই খেলা শেষের ইঙ্গিত।
সেই ইঙ্গিতই মনে হয় গতকাল দিয়ে দিলেন দলের প্রধান খেলোয়াড় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বলে মনে করছে রাজনৈতিক সচেতন মানুষ। তাঁর দলের প্রধান খেলোয়াড় যিনি এই খেলা হবে স্লোগান আমদানি করেছিলেন বাংলাদেশ থেকে সেই অনুব্রত মণ্ডলকে নির্বাচন কমিশন যদি গৃহবন্দী করে তাহলে তিনি আদালতে যাবেন বলে জানিয়েছেন। তার থেকেও বড় কথা ভোট পর্ব মিটে যাওয়ার পরেই তিনি স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে সুপ্রিমকোর্টে মামলা করবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে, তাহলে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজয় মেনে নিলেন? তৃতীয়বার ক্ষমতায় এলে তো সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই? তিনি কি পরাজয় মেনে নিয়েই মামলা করার কথা বললেন?
রাজনৈতিক সচেতন মানুষের অনেকেরই বক্তব্য খেলা শেষ হলেও তৃণমূল সুপ্রিমো সহজে মাঠ ছাড়বেন না। সেই জন্যই তিনি আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। আদালতে মামলা ঝুলিয়ে রেখে নবনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার এটাই তাঁর শেষ পরিকল্পনা।

