সোমনাথ বরাট, আমাদের ভারত, বাঁকুড়া, ২০ জুলাই: আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা প্রত্যন্ত গ্ৰামে পৌঁছে গেলেও কু-সংস্কার এখনও বিদ্যমান। তারই প্রমাণ মিলল আজ মেজিয়ার রামচন্দ্রপুরের বাউরি পাড়ায়। সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ভূতে ধরেছে বলে দাবি তুলে তার উপর ওঝা গুনিনের অকথ্য অত্যাচার চলল বুধবার সকাল থেকে। বাধা দিতে গিয়ে ওঝা, গুনিন ও পরিবারের বাধার মুখে পড়ল বিজ্ঞান মঞ্চের খোদ সভাপতি।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল এক মহিলা গুনিন যজ্ঞ কুন্ড সাজিয়ে তাতে মোটা মোটা কাঠ জ্বালানি হিসাবে আগুনে দিয়েছেন। কেজি দুয়েক শুকনো লঙ্কা পাশে নামানো। এক পুরোহিত উচ্চস্বরে তার ইষ্ট দেবতার উদ্দেশ্যে মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছেন। পাশে বছর ১৪’র এক কিশোরীকে জোর জবরদস্তি বসিয়ে রাখা হয়েছে। গুনিনের কথায় ওই কিশোরীকে ভূতে ধরেছে। সহজে ভূত ছেড়ে চলে গেলে ভালো। না হলে জ্বলন্ত জুমড়া কাঠ (আধ পোড়া কাঠ) কিশোরীর মুখে ছ্যাঁকা দিয়ে লঙ্কার ধোঁয়া দিয়ে তাড়াতে হবে। এই অমানবিক দৃশ্য দেখছেন গ্রামের কয়েকশো মানুষ।
বাসিন্দাদের কাছে জানা গেল, কয়েকদিন ধরেই ওই কিশোরী অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। পরিবারের লোকজন বেলিয়াতোড় থানার গদারডিহি গ্রামের এক মহিলা গুনিনের খোঁজ পেয়ে সেখান গেলে গুনিন জানান, মেয়েকে ভূতে ধরেছে। ভূত তাড়ানোর ব্যবস্থা না করলে পরিবার ও মেয়েটির ভয়ঙ্কর ক্ষতি হবে। অমঙ্গলের আশঙ্কায় পরিবারের লোকজন এদিন ওই মহিলা গুনিন বা ওঝাকে নিয়ে আসেন। ওই মহিলা ওঝা ২ জন পুরুষ সাকরেদকে সঙ্গে নিয়ে রামচন্দ্রপুর গ্রামে আসেন। ছাত্রীর বাড়ির অদূরে শুরু হয় পুজা অর্চনা ও মহিলার তুকতাকের কেরামতি। ভূত তাড়ানোর নামে ছাত্রীর উপর অকথ্য অত্যাচার চলতে থাকে বলেও অভিযোগ। ঘটনার খবর পেয়ে ওই গ্রামে যান পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের মেজিয়া ব্লক কমিটির সভাপতি স্বরূপ মুখার্জি। গ্রামবাসীদের বুঝিয়ে মেয়েটিকে ওঝার কবল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও অভিযোগ, ওই ওঝা, তাঁর সহযোগী এবং পরিবারের লোকজন একত্রিত ভাবে বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মীকে লক্ষ করে ব্যাপক গালিগালাজ ও আটক করে রাখেন। তিনি অপারগ হলে মেজিয়া থানার পুলিশকে খবর দেন। ঘটনাস্থলে মেজিয়া থানার পুলিশ গিয়ে বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মীকে গ্রাম থেকে উদ্ধার করে। বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে চায়নি ছাত্রীর পরিবার ও গ্রামের বাসিন্দারা।

স্বরূপ মুখার্জি স্থানীয় পুরুনিয়া- তেলেন্ডা হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, ওই মেয়েটি তাঁর স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। তাই অস্বাভাবিক আচরণ করছে। এর আগেও একবার হয়েছিল। এক মানসিক ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়েছিল। কিন্তু ওষুধ বন্ধ করে দেওয়ায় ফের সেই রোগ বেড়েছে। তাঁর দাবি, এই অসুখের দীর্ঘদিন চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু খেটে খাওয়া পরিবারে অর্থের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞতা ও কু-সংষ্কার আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। তিনি বলেন, আমি একা ওদের বোঝাতে পারিনি। গ্রামে সচেতনতা শিবির করে মেয়েটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।

