অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ২৩ মার্চ: ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পশ্চিমী অভিমুখীর বদলে দেশীয় ভাবধারায় পুষ্ট করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল তথা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের আচার্য ডঃ সি ভি আনন্দ বোস। তাঁর কথায়, “এই ব্যবস্থা ইওরোসেন্ট্রিকের বদলে ইন্ডিয়াসেন্ট্রিক হচ্ছে। নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির এটা অন্যতম মূল ভিত্তি।”
শিক্ষক ও হবু শিক্ষকদের এক সমাবেশে বৃহস্পতিবার বিএসএইইউ অর্থাৎ বাবা সাহেব অম্বেদকর এডুকেশন ইউনিভার্সিটিতে (পূর্বতন ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অফ টিচার্স ট্রেনিং, এডুকেশন, প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) এদিন প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কিছু বিশিষ্টজনের সামনে ‘মিট দি মেন্টর’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এক শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যপাল-আচার্য এ কথা বলেন।
নয়া শিক্ষানীতিতে তাঁর ভাবনার কথা জানতে চাইলে রাজ্যপাল বলেন, “এতে পড়ুয়াদের পড়ার বিষয় নির্বাচনে একটা অভূতপূর্ব সুযোগ থাকছে। কর্ণাটক মিউজিকের সঙ্গে কেউ আগ্রহী হলে কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিতে পারেন। শেক্সপিয়রের জন্মের বহু আগে কালীদাস তাঁর কৃতিত্ব প্রমাণ করে গিয়েছেন। মেকিয়াভেলির হাজার বছর আগে জন্মেছিলেন চানক্য। চানক্য, কালীদাসের মত অতীতের প্রবাদপ্রতিম ভারতীয়দের যথাযোগ্য গুরুত্ব পাওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় কথা, নালন্দা, তক্ষশীলার মত প্রাচীন ঐতিহ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ভারতে। ‘এভরিথিং ইজ কামিং ব্যাক’।
আলোচনায় রাজ্যপাল বলেন, “শিক্ষকের ভূমিকা অনুঘটকের মত— ‘ট্রান্সফরমেশনাল’। পড়ুয়াদের সঠিক পথ দেখাতে নিজেদেরও পরিবর্তন করতে হবে।“ তাঁর কথায়, “কেবল বিএ, এমএ পাশ করে শিক্ষকতা করলে চলবে না। শিক্ষকদের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রাখতে হবে। সমাজের একটা আকাঙ্খা আছে তাঁদের কাছে।“
পড়াশোনা ক্রমেই ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠছে। সমাধানের পথ কী? এই প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যপাল বলেন, “অর্থনৈতিক অসাম্য পড়াশোনার অন্তরায় হওয়া উচিত নয়, কাম্যও নয়। কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের উচিত এর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে মহাত্মা গান্ধী, অ্যারিস্টটল থেকে লেনিন— সকলেই শিক্ষার উপযোগিতার কথা বলেছেন। ‘শিক্ষার অধিকার’ তাই একটা জ্বলন্ত বাস্তব।
রাজ্যপাল সমাবেশে বলেন, “শিক্ষকদের উপযুক্ত শ্রদ্ধা করবেন। কিন্তু মনে রাখবেন তাঁদের চেয়েও আমাদের সকলের জীবনে বড় শিক্ষক হভেন আমাদের মা। মায়ের কাছে সর্বদা মাথা নত করে থাকবেন। এই সঙ্গে পড়ুয়াদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাথা ঠাণ্ডা রাখতেও পরামর্শ দেন আচার্য বোস। পাশে উপবিষ্ট উপাচার্যের দিকে তাকিয়ে স্মিতহাস্যে বলেন, এর জন্য লাগলে বছরভর ঠাণ্ডা জলে স্নান করবেন। লাগলে ঠাণ্ডা জল আপনি সরবরাহ করবেন। না পারলে রাজভবন সেই ব্যবস্থা করে দেবে।
পড়ুয়াদের উন্মেষ এবং ভাবনার ওপরেও গুরুত্ব আরোপ করেন রাজ্যপাল। বলেন, “সেনাবাহিনীতে গোর্খাদের বিশেষ কদর আছে। কারণ, তাঁরা কোনও প্রশ্ন না করে ওপরওয়ালার নির্দেশ তালিম করে। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার জন্য এই আনুগত্যর সঙ্গে ‘ভিশন’ (বিচারবুদ্ধি) ও অ্যাকশন (কাজ)-এর সুষম মেলবন্ধন দরকার। শিক্ষা আমাদের সেই ‘ভিশন’-এর সহায়ক। এ প্রসঙ্গে জন মিলটন ও স্বামী বিবেকানন্দর উক্তির উল্লেখ করেন রাজ্যপাল। পড়ুয়াদের মন বোঝার আবেদন প্রসঙ্গে শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, “ডোন্ট মেক দেম এনি কপিক্যাট অফ টিচার্স অর দেয়ার পেরেন্টস। দে হ্যাভ দেয়ার ওন মাইণ্ড“।
স্বাগত ভাষণে উপাচার্য ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের ভাবনা স্মরণ করে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে ডঃ বোসের মত বহুগুনসম্পন্নের উপস্থিতিতে নীল দিগন্তে সত্যি যেন আজ ফুলের আগুন লেগেছে। শিক্ষাগুরু তৈরি করতে আধুনিক ভারতে এটি দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান। মেন্টার বা গুরুর গুরুত্বের নানা উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যকে পুস্পস্তবক ছাড়াও বাঁধানো ফ্রেমে কৃষ্ণনগরের ডাকের সাজের দুর্গা, তসরের ধুতি-কূর্তা প্রভৃতি উপহার দেন। মুঠোফোনে পরিবেশন করেন দক্ষিণ ভারতের এক বিখ্যাত কবির কন্ঠে মালয়ালাম ভাষায় ডঃ সিভি আনন্দ বোসের একটি কবিতার
আলোচনার শুরুতে বিএসএইইউ-এর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ওপর তথ্যচিত্র দেখানো হয়। পরিবেশিত হয় প্রতিষ্ঠানের প্রতীকি সঙ্গীত ‘বিশ্ব সাথে ’ এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘আগুনের পরশমনি’। সমাপ্তি ভাষণে বিএসএইইউ-এর রেজিস্ট্রার কুণাল ঝা সমাজের বিভিন্ন স্তরে রাজ্যপাল বোসের সুদূরপ্রসারি কৃতিত্ব, বিদেশে ভারতের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে তাঁর অবিস্মরণীয় ভূমিকার উল্লেখ করেন।

