উত্তর দিনাজপুরে ১৩ হাজার লোকশিল্পীর দিন কাটছে চরম কষ্টে

স্বরূপ দত্ত, উত্তর দিনাজপুর, ৯ জুন: যন্ত্রে ধূলো জমেছে, কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। পরিবার পরিজন নিয়ে প্রায় মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন উত্তর দিনাজপুর জেলার কয়েক হাজার বাউল, ভাওইয়া, খন সহ সমস্ত লোকসংগীত শিল্পীরা। কারন একটাই ভয়াবহ অতিমারি করোনার ছোবল। প্রায় দেড় থেকে দুবছর ধরে সরকারি বেসরকারি সমস্ত অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন শিল্পী ও তাঁদের সঙ্গতের পরিবারের সদস্যরা। অনেকে বেছে নিয়েছেন আত্মহত্যার পথও। রাজ্য সরকারের মাসিক এক হাজার টাকা করে বেশকিছু শিল্পী ভাতা পেলেও তা দিয়ে সংসার চলেনা। শিল্পীদের দাবি, রাজ্যের সরকার তাঁদের ভাতা একটু বৃদ্ধি করে বাঁচার পথ করে দিক।

২০২০ সালের প্রায় শুরুর সময় থেকেই করোনার সংক্রমণ ছড়িয়েছে গোটা পৃথিবী জুড়ে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশজুড়ে শুরু হয় লকডাউন। বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত ধর্মীয় উৎসব থেকে শুরু করে সরকারি বেসরকারি সব ধরণের অনুষ্ঠান। আর এতেই মুখ থুবড়ে পড়েন শিল্পীরা। বাউল থেকে ভাওইয়া, খন থেকে কবিয়াল সহ সমস্ত শিল্পী ও তাঁদের সঙ্গতদের বন্ধ হয়ে গেছে রুজি রুটি। উত্তর দিনাজপুর জেলার প্রায় ১৩/১৪ হাজার লোকসংগীত শিল্পী সহ উত্তরবঙ্গের এই সংস্কৃতি জগতের ত্রিশ হাজার শিল্পী ও তাঁদের বাদকেরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

সরকারি বেসরকারি নানান অনুষ্ঠানে তাঁদের গান বাজনা ও সঙ্গীত পরিবেশন করে যে রোজগার হত তা দিয়েই চলত তাঁদের পরিবার প্রতিপালন। শিল্পীরা ভেবেছিলেন ২০ সাল বিদায় নিতেই খুলে যাবে তাঁদের জীবন জীবিকার পথ। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়তেই আবারও লকডাউন, আবারও উৎসব অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধকতা। ফলে আজ প্রায় দেড় বছর ধরে জীবন জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একপ্রকার অনাহার অর্ধাহারে কাটছে এই শিল্পীদের দিন।

রায়গঞ্জ তথা উত্তরবঙ্গের প্রথিতযশা বাউল শিল্পী তরনী সেন মহন্ত আক্ষেপের সুরে জানালেন, তাঁদের দুঃখ কষ্টের কথা। বহু শিল্পী না খেতে পেয়ে মারাও গিয়েছেন, কেউবা আবার উপার্জনহীন হয়ে সংসার প্রতিপালন করতে না পারায় আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে সরকার বেশকিছু শিল্পীকে মাসিক এক হাজার টাকা করে ভাতা দিলেও নিজেদের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারের দেওয়া এক হাজার টাকার পরিবার প্রতিপালন কি করে সম্ভব প্রশ্নটা থেকেই যায়। তাই উত্তর দিনাজপুর জেলার হাজার হাজার শিল্পীদের দাবি, রাজ্য সরকার এই সঙ্কটময় মুহূর্তে তাঁদের ভাতার পরিমান বাড়িয়ে দিয়ে বাঁচার রসদ জোগাক। নইলে একদিন এই শিল্পীদের যন্ত্রে ধূলোর পাহাড় জমবে আর তাঁদের কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে হারিয়ে যাবে। জেলার ঐতিহ্য বাউল আর খন বা ভাওইয়াতে শোনা যাবেনা মধুর গান। শুধুই শোনা যাবে “..জমবে ধূলা তানপুরাটার তারগুলায়, কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়, জমবে ধূলা তানপুরাটার তারগুলায়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *