জে মাহাতো, আমাদের ভারত, মেদিনীপুর, ২৭ জুন: এক আধটা পরিবার নয়, নারায়ণগড়ে প্রায় ২৪ টি পরিবার ভিটে মাটি ছেড়ে নিজেদের থানা এলাকার বাইরে গিয়ে অন্য থানা এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। স্বাধীনতার পরে তো বটেই ‘৩৪ বছরের’ বাম জামানাতেও এই ঘটনা ঘটেনি বলে ঢোঁক গিলছেন তৃণমূলের নেতারাই। যে অত্যাচারে তৃণমূলের এক গোষ্ঠীর হাতে অতিষ্ট হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে নিজের ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে তৃণমূলেরই লোকজনদের।
প্রায় ১৫ দিন ধরে নদী আর জঙ্গলের পাড়ে তাঁবু টাঙিয়ে বাস করা মানুষগুলোর পাশে এখন কেউ নেই। না বিজেপি বা সিপিএম নয় এরা সব্বাই তৃণমূল সমর্থক বলেই পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন তৃণমূলের ব্লক কমিটির নেতাই।
নারায়ণগড় থানা এলাকার মকরামপুরের নাম ২০১৮ সালে রাজ্যব্যাপী ছড়িয়েছিল। তৃণমূলের অঞ্চল কার্যালয়ে বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছিল ৩ তৃণমূল কর্মীর। যে মামলা বর্তমানে হাইকোর্টের বিচারাধীন। সুবিচারের আশায় নিজের দলেরই নেতাদের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছেন তৃণমূল সমর্থক পরিবারই। যদিও এরপরেও বোমা বিস্ফোরণ থামেনি মকরামপুরে। থামেনি একের পর এক তৃণমূল কর্মীর লাশ হয়ে যাওয়ার ঘটনা। সেই মকরামপুর এলাকারই বিভিন্ন গ্রামের ওই পরিবারগুলি ঘরদোর ছেড়ে বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছেন কেলেঘাই নদীর পাড়ে ধানঘরি মৌজায় যা খড়গপুর গ্রামীন থানা এলাকার মধ্যে পড়ে। অস্থায়ী তাঁবুতে থাকা বৃদ্ধ বৃদ্ধা শিশু মিলিয়ে শতাধিক মানুষের দাবি, ২ মে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই চলেছে অসহনীয় অত্যাচার, বাড়ি ভাঙ্গচুর, লুটপাট, জরিমানা এবং মারধর করছেন মকরামপুর অঞ্চল কমিটির সভাপতি লক্ষীকান্ত সিট ও তার লোকেরা। আর যাঁরা ঘর ছেড়ে আছেন তাঁরা প্রাক্তন সভাপতি বর্তমান ব্লক নেতা নাকফুড়ি সিংয়ের অনুগামী। তাঁদের একটাই অপরাধ তাঁরা লক্ষ্মী সিটের অনুগামী নয়। ঘরছাড়া মানুষদের দাবি, তারাও তৃণমূল করেন কিন্তু যেহেতু তাঁরা বিধানসভার আগে দলের লক্ষ্মী সিটের কথা মতো কাজ করেননি তাই তাঁদের ওপর এই অত্যাচার চলছে। ঘরবাড়ির বাসন কোসন থেকে শুরু করে গৃহপালিত পশু অবধি লুট করে নেওয়া হচ্ছে।

যদিও এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে লক্ষ্মীকান্ত সিট বলেছেন, “এসবই মিথ্যা কথা। ওরা সবাই বিজেপির লোকজন। ওদের আক্রমণে আহত হয়েছেন আমাদের লোকজন। আমার নিজের দাদা তির বিদ্ধ হয়েছে। সেই ঘটনায় মামলা দায়ের হওয়ার পর থেকেই গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে পালিয়েছে সবাই।”
সত্যি অবশ্য এরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। গ্রামছাড়া এক ব্যক্তি স্বীকার করেছেন, দিনের পর দিন ‘লক্ষ্মী’ ছাড়া সমর্থক পরিবার গুলির ওপর হামলা আর লুটপাটে বীতশ্রদ্ধ হয়ে হামলা চালানোর সময় লুকিয়ে একজন হামলাকারীদের ওপর তির ছুঁড়েছিল। সেই তিরে আহত হয়েছেন লক্ষীকান্ত সিটের দাদা বীরেন বাবু। অভিযোগ, সেদিন লুটপাটের নেতৃত্বে ছিলেন তিনিই। মামলা একটি দায়েরও হয়েছে বটে কিন্তু তার জন্য নারী শিশুরা পালাবে কেন? আর কেনই বা ভিন্ন গ্রামের লোকেরা পালাবে? নাকফুড়ি সিং দাবি করেছেন, মিথ্যা কথা এরা প্রত্যেকেই তৃণমূল সমর্থক।
দাবি এবং পারস্পরিক দাবির ছাড়াও যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হল ২০১৮ সালের কুখ্যাত সেই বোমা বিস্ফোরণের পরেই দলের সম্মান ও এলাকার ক্রোধ থেকে দলকে বাঁচাতে লক্ষীকান্ত সিটকে সরিয়ে সভাপতির পদে আনা হয় নাকফুড়ি সিংকে। ক্ষমতা লাভের পরেই একদিন লক্ষ্মীকান্তকে ধরে তাঁকে বেধড়ক মারধর করার অভিযোগ ওঠে নাকফুড়ির লোকেদের বিরুদ্ধে। ঠিক লক্ষ্মীকান্ত যে কায়দায় বিরোধীদের মারধর করত সেই একই কায়দায় ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় লক্ষীকান্তর পা। অত্যাচার নেমে আসে লক্ষ্মীদের ওপর। বাদ যায়নি লক্ষ্মীর দাদা, ভাইপো সহ অন্যান্য আত্মীয়রা। মারধর, ভাঙ্গচুর, লুটপাট চলে সেই সময়ও। দলে কোন ঠাসা লক্ষ্মী অনুগামীদের বিরুদ্ধে তখন বিজেপি যোগের অভিযোগ এনে এই কান্ড চালিয়েছিলেন নাকফুড়ি অনুগামীরা।
২০১৯ লোকসভায় বিজেপি ভালো ফল করে এই এলাকায়। নাকফুড়িকে দিয়ে কাজ হচ্ছে না ধরে নিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে ফের লক্ষ্মীকান্তর পুনর্বাসন হয়। আর তখন থেকেই শুরু হয়ে ‘লক্ষ্মী’ছাড়াদের ওপর হামলা। যদিও পার্টি যেটা বুঝতে পারেনি তা হল লক্ষ্মীর পুনর্বাসন মেনে নিতে পারেননি মকরামপুর এলাকার মধ্যবিত্ত মানুষও। কারণ সেই ২০১৮ সালে বোমা বিস্ফোরণে ৩টি প্রাণের বিসর্জন। মানুষ এখনও দৃঢ় ভাবেই বিশ্বাস করেন এলাকায় বোমা-বন্দুক রাজের নায়ক লক্ষ্মীকান্তই। ফলে এই অঞ্চলে দু’হাজারের কাছাকাছি ভোটে পরাজিত হয় তৃণমূল। অভিযোগ সেই পরাজয়ের রাগ মেটাচ্ছেন লক্ষ্মীকান্তর অনুগামীরা। আর তার মাশুল দিচ্ছেন হতভাগ্য বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু-কিশোর, গৃহবধূরাও। রাজায় রাজায় যুদ্ধে কিভাবে উলুখাগড়ার প্রাণ যায় তারপরও উদাহরণ এখন কেলেঘাই নদীর পাড়টিতে। সন্ধ্যে হলে মনে হয় যেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর শশ্মানভূমিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে আছেন কিছু ভারতীয় নাগরিক।

