নামেই সরকারি হাসপাতাল! বালুরঘাটে রক্ত পরীক্ষাতেও সাধারণের রক্ত চুষছে দালালরা, ঘুমিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তর

পিন্টু কুন্ডু, বালুরঘাট, ৬ এপ্রিল: দালালচক্রের বাড়বাড়ন্ত! রক্ত পরীক্ষার আড়ালে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষছে সরকারি হাসপাতাল। বিনামূল্য রক্ত পরীক্ষার বোর্ড লাগিয়ে প্রতিদিনই কাটা পড়ছে কয়েকশো দুঃস্থ মানুষের পকেট। যে ঘটনার পিছনে দালাল চক্র তো বটেই সরকারি হাসপাতালের কর্মীদেরও একাংশ জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ। শুনতে কিছুটা অবাক মনে হলেও দীর্ঘ বেশকিছুদিন ধরেই বালুরঘাট জেলা হাসপাতালে অতি সক্রিয়তার সাথে চলছে এই কারবার। যা দেখেও যেন কার্যত ঘুমিয়ে রয়েছে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর। যদিও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবার আশ্বাস দিয়েছেন দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলাশাসক।

বাংলাদেশ সীমান্ত অধ্যুষিত দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার চিকিৎসা ব্যবস্থা বলতেই সরকারি হাসপাতাল। বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা সে অর্থে তেমন নেই জেলাতে। জেলার সদর শহরে অবস্থিত বালুরঘাট জেলা হাসপাতাল এখন যেন কিছুটা নামেই সরকারি হাসপাতাল। এই হাসপাতাল চত্বর ঘুরলে চোখে পড়বে বিভিন্ন সরকারি বোর্ড। যেখানে বড় বড় করে লেখা রয়েছে সমস্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয় এখানে। যে চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব পশ্চিমবঙ্গ সরকারের। বোর্ডে আরো লেখা রয়েছে রোগী বা তার বাড়ির লোককে কোনোপ্রকার অর্থ প্রদান করতে হবে না এই হাসপাতালে। কিন্তু সেসব লেখা যে শুধুমাত্র লোক দেখানো তা যেন হাসপাতালের রক্ত পরীক্ষাকেন্দ্রে গেলেই টের পাওয়া যাবে।

সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সর্ব্বোচ্চ তলায় অবস্থান করছে সরকারি প্যাথলজি বিভাগ। যে বিভাগ খুঁজতে গিয়েই যেন হারিয়ে যান অনেকেই। আর নীচতলায় অবস্থান করছে পিপিপি মডেলের রক্ত সংগ্রহ কেন্দ্র। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের বর্হিঃবিভাগে ঢোকার মুখেও সেই পিপিপি রক্ত সংগ্রহ কেন্দ্র। আবার পুরনো ভবনের দ্বিতলেও রয়েছে তাদের রক্ত সংগ্রহ কেন্দ্র। অর্থাৎ গোটা হাসপাতাল জুড়ে প্রায় তিনটি জায়গায় রয়েছে পিপিপি মডেলের এই রক্ত সংগ্রহ কেন্দ্র। যেখানে খোলা বাজার থেকে সামান্য কিছু কম মূল্যে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। প্রশ্ন এখানেই, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষাকেন্দ্র যেখানে খুঁজে পাওয়ায় দায়, সেখানে তিন তিনটি কাউন্টার খুলে পিপিপি মডেলের রক্ত সংগ্রহ কেন্দ্র কিভাবে চলছে। তবে কি সরকার চাইছে বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষা কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে?

এখানেই শেষ নয়, এসবের বাইরেও ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা একাধিক ভুয়ো ল্যাবের কর্মকর্তাদের হাসপাতালের সর্বত্র বিচরণ চলছে। যাদের খপ্পরে পড়ে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা করাতে এসে প্রতি মুহূর্তে সর্বসান্ত হচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষজনেরা। ঘটি বাটিও বিক্রি করতে হচ্ছে অনেককে। দীর্ঘ বেশকিছুদিন ধরে বালুরঘাট হাসপাতালে এই চক্র অতি সক্রিয় হলেও হেলদোল নেই স্বাস্থ্য দপ্তরের। যে ঘটনা নিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের উদাসীনতার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ উগড়েছেন হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসা রোগী ও তার পরিবারের লোকেরা।

মাজেদা বিবি ও হরিদাসী মন্ডল নামে দুই রোগী জানান, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা হয় শুনেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে সম্পূর্ণ উলটো চিত্র দেখলাম। টাকা না নিয়ে আসলে চিকিৎসাই হতো না তাদের।

অমল প্রামানিক ও গোপাল মন্ডল নামে দুই রোগীর আত্মীয় বলেন, রক্ত পরীক্ষার নামে চরম হয়রানি চলছে রোগীদের। সরকারি প্যাথলজিতে মাত্র একটি করে রক্ত পরীক্ষা করেই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বাকি রক্তপরীক্ষা করতে গিয়েই তাদের পকেট কাটা পড়ছে। সরকার যখন বলছে বিনামূল্যে চিকিৎসা, তখন কেন তাদের টাকা দিতে হচ্ছে চিকিৎসা করাতে এসে। এসব বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা বলেন, আগামী সপ্তাহেই রোগী কল্যাণ সমিতির মিটিং রয়েছে। সেখানেই এব্যাপারে আলোচনা করে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *