স্বরূপ দত্ত, আমাদের ভারত, উত্তর দিনাজপুর, ৬ জুন: কালিয়াগঞ্জের রাধিকাপুরে পুলিশের গুলিতে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হল মঙ্গলবার। এই ঘটনার সাথে জড়িত সকল আধিকারিক, প্রত্যক্ষদর্শী ও জনসাধারণকে এদিন সাক্ষ্য দিতে আসার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিলো।
সেইমত এদিন রায়গঞ্জের মহকুমাশাসক কিংশুক মাইতির উপস্থিতিতে পুলিশের পক্ষ থেকে ওই গুলি চালানো ন্যায়সঙ্গত ছিলো কি না তা জানার জন্যই সকাল সাড়ে ১১টা থেকে কালিয়াগঞ্জ বিডিও অফিসের সভাকক্ষে এই সাক্ষ্যগ্রহণপর্ব শুরু হয়। বিকেল ৩টে পর্যন্ত গুলিতে মৃত মৃত্যুঞ্জয় বর্মনের বাবা, স্ত্রী, দাদা-সহ এলাকার প্রায় ৩৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। তবে এদিন ওই ঘটনার সাথে জড়িত কোনো পুলিশ কর্মী সাক্ষ্য দিতে আসেনি। মৃতের পরিবারের সদস্য ও এলাকার বাসিন্দারা প্রত্যেকেই ঘটনার সিবিআই তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্ত পুলিশ কর্মীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন বলে জানা গিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২১ শে এপ্রিল কালিয়াগঞ্জের সাহেবঘাটায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এক ছাত্রীর মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাকে ধর্ষণ করে খুন করার অভিযোগে ওঠে। ২৫ এপ্রিল বিজেপির পক্ষ থেকে এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় সাংসদের নেতৃত্বে পুলিশ সুপারের দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। পাশাপাশি রাজবংশী ও আদিবাসী সংগঠনের পক্ষ থেকে এই একই ইস্যুতে কালিয়াগঞ্জ থানা অভিযানের ডাক দেওয়া হয়। রায়গঞ্জ পুলিশ সুপারের দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি কার্যত শান্তিপূর্ণভাবেই হয়।
কিন্তু কালিয়াগঞ্জ থানা অভিযানকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ বাঁধে। গোটা কালিয়াগঞ্জ শহর কার্যত রণক্ষেত্রের আকার নেয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে আক্রমণ করার পাশাপাশি কালিয়াগঞ্জ থানায় ঢুকে তান্ডব চালায়। পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙ্গচুর করার পাশাপাশি থানার একাধিক গাড়ি ও বিল্ডিংয়ে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে কালিয়াগঞ্জ ব্লকের রাধিকাপুর এলাকার চাঁদগা গ্রামে বুধবার গভীর রাতে পুলিশ তল্লাশি অভিযান চালাতে গিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বর্মন (৩৩) নামে এক যুবক পুলিশের গুলিতে মারা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। মৃতের পরিবার ঘটনার সিবিআই তদন্তের দাবি জানালেও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনসূত্রে জানা গিয়েছে, উচ্চ আদালত ও মানবাধিকার কমিশনের গাইডলাইন অনুযায়ী কোথাও পুলিশের গুলিতে কেউ মারা গেলে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত করতে হয়। সেই নিয়ম মেনেই পুলিশের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের কাছে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত করার আবেদন করা হয়। সেই আবেদনের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রায়গঞ্জের মহকুমাশাসক কিংশুক মাইতিকে এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২২ মে এই মর্মে মমহকুমাশাসক একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। তাতে বলা হয়, ৬ জুন কালিয়াগঞ্জ বিডিও অফিসে ওইদিন রাধিকাপুরের চাঁদগা গ্রামে রাতে তল্লাশি অভিযানে অংশগ্রহণকারী সকল পুলিশ কর্মীকে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়। এর পাশাপাশি মৃতের পরিবারের সদস্য, এলাকার বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শীদেরও আসার জন্য বলা হয়।
এদিন সকাল ১১ টা থেকে এই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। তার আগেই মৃত মৃত্যুঞ্জয় বর্মনের বাবা রবীন্দ্রনাথ বর্মন, স্ত্রী গৌরী বর্মন, দাদা বিষ্ণু বর্মন সহ এলাকার প্রায় ৫০ জন বাসিন্দা বিডিও অফিসে চলে আসে। প্রত্যেককে আলাদা করে মহকুমাশাসক জিজ্ঞাসাবাদ করেন ও তাদের বয়ান ভিডিও রেকর্ড করা হয়।
প্রশাসনসূত্রে জানা গিয়েছে, ২৭ জনের বয়ান ভিডিও রেকর্ড করা হয়। পাশাপাশি আরও কয়েকজন তাদের বয়ান কাগজে লিখে জমা দেয়। কোনো পুলিশ কর্মী এদিন সাক্ষ্য দিতে না আসায় তাদের জন্য আগামী সপ্তাহে একদিন নির্দিষ্ট করা হবে বলে জানা গিয়েছে।
নিহত মৃত্যুঞ্জয় বর্মনের স্ত্রী গৌরী বর্মন জানিয়েছেন, “মহকুমাশাসক সাক্ষ্যগ্রহণ করার শুরুতেই সেদিন ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা শোনেন। বিনা প্ররোচনায় পুলিশ সেদিন আমার স্বামীকে কিভাবে গুলি চালিয়ে খুন করেছে, তা জানাই। ওই অভিযুক্ত পুলিশ কর্মীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি আমি সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছি।”
এলাকার এক বাসিন্দা সত্যচরণ বর্মন জানিয়েছেন, “সেদিন আমি পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বাড়ির বাইরে আসতেই পুলিশ আমাকে ভয় দেখিয়ে সরে যেতে বলে। মৃত্যুঞ্জয় ঘর থেকে বেড়িয়ে পুলিশকে তার বাবাকে ধরে নিয়ে যাবার কারণ জিজ্ঞেস করতেই এক অফিসার গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। তখনই তাকে গুলি চালানো হয়।”

