কায়াকোরার প্রেমে

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

আমাদের ভারত, ২৭ মে: আমার কর্মক্ষেত্রে এক প্রাচীন বটগাছ জুড়ে বহুবছর ধরে একটি লতা দেখতাম; বসন্তে আসতো তার ফুলেল শোভা, প্রতি বসন্তে অপেক্ষা করে থাকতাম। ফার্মের এক বৃদ্ধ শ্রমিকের কাছ থেকে জানলাম লতাটির নাম ‘কায়াকোরা’। বাহ্, বেশ সুন্দর নাম তো! আমার মনের গহনে ঢেউ তুলে যেত কায়াকোরার বসন্ত; তার কায়া, তার দেহ জড়িয়ে নিতে চাই আমি; সে আমার পত্নী-কল্প। একবার চিরকূটে কবিতাও লিখলাম —
“কায়াকোরার পড়েছি প্রেমে
একটুখানি রোসো।
বলে আমায় ইশার-ডেকে
আমার পাশে বোসো।”
বটের তলায় বসি আর গাছের নামকরণের অর্থ খোঁজা শুরু করি। পাশেই চায়ের দোকানে নানান মানুষের ভীড়। কায়া মানে তো দেহ; আর কী তাৎপর্য থাকতে পারে! পেলাম ‘কায়া’ কথাটির মানে বাংলাদেশের সিলেটে ‘ক্ষীণ’; দিনাজপুর, বাখেরগঞ্জ, কুমিল্লা, ফরিদপুর, চট্টগ্রামে ‘কোরা’ শব্দের অর্থ রজ্জু বা দড়ি। অর্থাৎ ক্ষীণ দড়ির মতো এক লতা; সত্যিই তো তাই! আবার রাজশাহীতে ‘কোঁড়া’ মানে ফুলের কুঁড়ি। তাহলে কী কায়াকোঁড়া? যেহেতু লতার ফুল আর কুঁড়িগুলি ক্ষীণ; সেই কারণেও লতাটির এমন নাম হতে পারে।

বটের তলায় বাৎসরিক মেলা বসে, তখন নানান অঞ্চল থেকে মানুষ আসে। এক বুড়িমা বললেন, এর নাম ‘মেঠামারি’, মেঠা বা মেঁঠা মানে ভেড়া। গ্রামে ভেড়া ও অন্যান্য পশুর থেকে বাড়ির বাগানের গাছ বাঁচাতে বেড়ায় তুলে দেওয়া হতো এই লতা, তাই এর নাম মেঠামারি। হাতে না মেরে ভাতে।

গাছটির ফুল সমেত একটি ডাল শুকিয়ে উদ্ভিদবিদের কাছে নিয়ে গেলাম; জানলাম এর ল্যাটিন নাম Capparis zeylanica L.

দেহ ক্ষীণ হলেও বেশ দৃঢ় এর লতা, কালচে সবুজ তার রঙ। হাল্কা সবুজ কচি পাতা, গড়নে লম্বা, পরিণত হলে ডিম্বাকার। পাতার উপরতল মসৃণ, তেল চকচকে, যেন মোমের প্রলেপ। পাতার গোড়ায় কাঁটা, যেন এক একটি হুক। পাতার কক্ষ ভেদ করে বসন্তে ফুলের গোছা বেরোয়। তা গোলাপি বা হাল্কা গোলাপি, কোনো প্রজাতি আবার সাদা।

ফুলের মধ্যে লম্বাটে সরু সরু পুংকেশর চোখ টানে, সেগুলি বেশ লম্বা, খাঁড়া, রঙ গোলাপি। পুংকেশরের ডগায় রেণুথলি। ফল প্রথমে সবুজ চকচকে, যেন তেল মাখিয়ে রেখেছে কেউ, পাকলে হয়ে যায় গোলাপি। গ্রাম-বাংলায় এখনো পবিত্র বনকুঞ্জে, কবর-শ্মশানের নিরিবিলি স্থানে কিছু কিছু দেখা মিলবে, মিলবে পুরনো বাগিচায়, এমনকি খোদ কলকাতার পার্কে বড় গাছে বুনোলতা হিসাবেও দেখেছি, দেখেছি পোড়ো বাড়িতে লতিয়ে উঠতে। বুনো লতায় ভাঙ্গা বাড়ির সুরকি-খসা অট্টালিকায় কায়াকোরার বাসন্তী ফুলের শোভাই আলাদা! একটি অতিলৌকিক সৌন্দর্য যেন এই লতার মধ্যে অনুভব করি। অনেক সময় হয় কি, এক একটি দমকা বাতাস কোথা থেকে নিঃশব্দে এসে পুরোনো বট-অশ্বত্থের শাখায় ঘুরপাক খাওয়ার সময়বটগাছে জড়ানো কায়াকোরায় স্লিম শরীরেও দোলা দিয়ে যায়–সে এক অপূর্ব শোভা।

মনেহয় ভরা বসন্তের দিনে কায়াকোরার সঙ্গে ফুলদোল খেলি গহন অরণ্যে। আসলে এই লতার প্রকৃত বাসস্থান যে বনেরই নীরবতা, মানুষের লোকচক্ষুর বাইরের আনোখা জঙ্গল। যেখানে বৃদ্ধ বনস্পতির তরুণী ভার্যা হয়ে ওঠে এই লতা, আর তারই কোমল সৌন্দর্যে তাকিয়ে আমার পরকীয়া প্রেম। তরুলতার গহন প্রকৃতিতে চুপিসারে কে যায় অভিসারে! লোকবসতির থেকে দূরে প্রকৃতি পরিবেশে কার হয়েছে এমন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা! কার প্রথম প্রেম হয়েছে কায়াকোরার লতা? কারই বা সহধর্মিণী অচিন তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ফুটে থাকে মেঠামারির ফুল হয়ে?

ইংরেজিতে একটি লতার নাম ‘লাভার্স লেন’, অর্থাৎ গলির পথে পথে সেই লতার ফুল থোকায় থোকায় ধরে আছে অনবদ্য সৌন্দর্যের গয়না পরে! কিন্তু কায়াকোরার লতায় গলি বা ‘পারগোলা’ সাজানো হবে না; সাজাতে হবে কুঞ্জ বা ‘বাওয়ার’, তবেই ‘লাভার্স হাট’ নাম দেওয়া যেতে পারে এই অনিন্দ্য-সুন্দর লতাটিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *