দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানায় রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু ৩ ঠিকা শ্রমিকের, অসুস্থ ৫

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ১৮ ফেব্রুয়ারি: কারখানার কনভেটারে রিফেক্টরি কাজ করার সময় রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হল ৩ ঠিকা কর্মী। অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ৫ জন। বিষাক্ত গ্যাসে দুর্ঘটনা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে শ্রমিকরা। শুক্রবার চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সেইল’র দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানায় (ডিএসপি)। ঘটনায় কর্তৃপক্ষের সুরক্ষার গাফিলাতির অভিযোগ তুলেছে শ্রমিক সংগঠনগুলি। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে দুর্গাপুর ইস্পাত কর্তৃপক্ষ।
ঘটনায় জানাগেছে, দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার (ডিএসপি) বেসিক অক্সিজেন ফার্নেসে (বিওএফ) কনভেটারে রিফেক্টরীর কাজ চলছিল। বেসরকারি এক ঠিকা সংস্থা ওই কাজ করছিল। 

শুক্রবার রিফেক্টরির কাজ করার সময় আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়ে এক সুপারভাইজার সহ ৮ জন ঠিকা কর্মী। খবর পেয়ে, কারখানার সিআইএসএফ, দমকল কর্মীসহ অন্যান্য কর্মীরা উদ্ধার কাজ শুরু করে। অসুস্থদের উদ্ধার করে প্রথমে কারখানার ভেতরে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাদের ডিএসপি মেইন হাসপাতালে যায়। সেখানে সিন্টু যাদব (২৪) নামে একজনকে মৃত বলে ঘোষণা করে চিকিৎসকরা। বাকিদের অবস্থার অবনতি হওয়ায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

বেসরকারি হাসপাতাল সুত্রে জানা গেছে, সেখানে স্বজন চৌহান (৪৮) ও সন্তোষ চৌহান (৩৪) নামে দু’জনের মৃত্যু হয়। বাকিরা চিকিৎসাধীন। এদিকে ঘটনার কারণ নিয়ে রহস্য দানা বেঁধেছে। যেখানে কাজ চলছিল ওই ইউনিটে ফার্নেসের গ্যাস ও কোকওভেন গ্যাস চালিত হয়। রিফেক্ট্রির কাজ চলার সময় ওই ইউনিটে সার্টডাউন ছিল বলে দাবি ডিএসপি কর্তৃপক্ষের। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন, তাহলে ওই শ্রমিকরা অসুস্থ হল কিভাবে? যদিও ‘বেসিক অক্সিজেন ফার্নেস’ অক্সিজেন কম হওয়ায় কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে ঠিকা কর্মীরা অসুস্থ বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

উল্লেখ্য, গত ২০২১ সালে মার্চ মাসে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার ব্লাস্ট ফার্নেসে গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয় ১০ জন শ্রমিক। ফার্নেসে মূলত কার্বণ মনোক্সাইড সম্বলিত গ্যাস থাকে। ওইদিন তার সংস্পর্শে এসে ১০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে কারখানার দমকল কর্মীরা উদ্ধার কাজ শুরু করে। আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করতে গিয়ে, দমকল বাহিনীর কয়েকজন সদস্য গ্যাসের কবলে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। 

তারও আগে গত ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দুর্গাপুর ইস্পাত (ডিএসপি) কারখানায় গ্যাস লিক করে অসুস্থ হয় ৩ জন। কারখানার ৪ নং ব্লাস্ট ফার্নেসের ৩ নং কন্ট্রোলে ও র’ মেটেরিয়াল হ্যান্ডেলিং ইউনিটের কাছে পাইপ লাইনে গ্যাস লিক হয়। ওই পাইপ লাইনে ব্লাস্ট ফার্নেস গ্যাস যায়। ওই পাইপ লাইনে ৩ নং কন্ট্রোলের কাছে ভালভে অত্যধিক চাপে গ্যাস বের হওয়ায় ৩ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।

অন্যদিকে, বার বার ইস্পাত কারখানায় গ্যাস দুর্ঘটনায় সরব হয়েছে শ্রমিকরা। কারখানা কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকে দুষছে শ্রমিক সংগঠনগুলি। যার জেরে এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।

ঘটনায় ডিএসপির সিটু নেতা সৌরভ দত্ত বলেন,
“কারখানার অনেক মেশিনারিজ বহু পুরোনো। সেগুলো বদল করা দরকার। কারখানায় শ্রমিক প্রতিনিধি নিয়ে সেরকম সেফটি কমিটি নেই। তাই সেফটি কমিটি গঠন করা হোক। ওই কমিটি শ্রমিক সুরক্ষার জন্য কারখানার সমস্ত পরিকাঠামো খতিয়ে দেখে রিপোর্ট করবে। সেই মত কাজ হলে কারখানার শ্রমিকদের বিপন্মুক্ত করা সম্ভব।” 

যদিও ডিএসপির জনসংযোগ আধিকারিক আশরাফুল হোসেন মজুমদার জানান,” সঠিক কি কারণে অসুস্থ হয়েছে, সেটা তদন্তের পর জানা যাবে। উচ্চপর্যায়ে কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হচ্ছে।”  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *