আমি একটা ছাগল

প্রদীপ দাস, আমাদের ভারত, ১৮ মার্চ: আমি একটা ছাগল! এটা অবশ্য আমি আগে জানতাম না, কারন আমার বুদ্ধি তো কম, তাই এতদিন বুঝতে পারিনি। আজ সকালে আমার এক সাংবাদিক বন্ধু ফোন করে আমাকে জানিয়ে দিলো যে আমি একটা ছাগল।

অনেকক্ষণ ধরে ভাবলাম, কারণ ছাগলেরও তো ছাগল বুদ্ধি আছে! ছাগলের বুদ্ধিতে ভেবে দেখলাম সত্যিই তো ঠিকই বলেছে। কয়েকদিন আগে মুদিদোকানে গিয়েছিলাম দোকানদার বললেন, অচিন্ত্যর বাবা দোকানে এসে বলে গেল, মোদীকে ভোট দিও না। বিজেপি জিতলে সব সোনা নিয়ে চলে যাবে। কোথায় নিয়ে যাবে তা অবশ্য তিনি বলেননি। আমিও ভাবলাম হয়ত নিয়ে যেতে পারে। আমার মতো অনেকেই ভেবেছিল, কারণ কেউ নাকি প্রতিবাদ করেনি। আজ আমি নিজেকে ছাগল জানার পরে ভাবলাম সত্যিই তো ওই ভদ্রলোকের ঘরে তো আমি যতদূর জানি একটুও সোনা নেই, এমনকি সোনার একটা নাকছাবিও নেই। জীবনে কত বছর আগে সোনার গয়না হাত দিয়ে ধরে ছিলেন তাও বোধহয় মনে নেই। অথচ রাজ্যের সোনা মোদী নিয়ে যাবে এই চিন্তাতেই তিনি মানুষকে বোঝাতে নেমে পড়েছেন!

আবার দিন কয়েক আগে দেখলাম আমার পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধা বিকেলে আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলাম মাসি কোথায় যাচ্ছেন? মাসি বললেন, আর বলিস না বাবা ওই কাউন্সিলর ডেকেছে, বাড়িতে এসে সব বুড়ো-বুড়িদের বলে গেছে। যারা বৃদ্ধ ভাতা পায়, বিধবা ভাতা পায় তাদের সবাইকে ডেকেছে। তাই যাচ্ছি, না গেলে যদি আবার টাকা না দেয়। এই ভয়ে সব বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা অসক্ত শরীরে টুকটুক করে হেঁটে সেদিন মিটিংয়ে হাজির হয়েছিলেন। কয়েকদিন পরে জিজ্ঞেস করলাম মাসি কি বলল? মাসি বললেন, বিজেপি যদি আসে তাহলে আমরা আর টাকা পাব না। মাসির মত আমিও বিশ্বাস করলাম। হ্যাঁ তাইতো, এ টাকা তো আর বিজেপি দেয় না– মানে আমি সেটাই জানি– তা বিজেপি এসে যদি বন্ধ করে দেয়। তাহলে এই বৃদ্ধ বয়সে মানুষগুলো যাবেনই বা কোথায়! আমার বন্ধু অবশ্য জানাল আরে ছাগল এই টাকাও কেন্দ্রীয় সরকার দেয়। কীজানি কার কথা ঠিক। আমিতো আর জানি না টাকাটা কোথা থেকে আসে, সবাইতো রাজ্যের ব্যাঙ্ক থেকে পায়। পাওয়ার আগে কাউন্সিলরের সই লাগে। তা হলে?

গতকাল যখন শাসক দল তার নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করল যে প্রত্যেক পরিবারের বছরে ছয় হাজার টাকা রোজগার নিশ্চিত করা হবে। প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীদের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দেওয়া হবে। তারা আট লক্ষ টাকা লোন নিতে পারবে। আমি তো আনন্দে আত্মহারা আর কি চাই! রেশন বাড়িতে পৌঁছে যাবে। ছেলে আর মেয়ের নামে নামে দশ লক্ষ করে ২০ লক্ষ টাকা ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে নেব। আমার আর কোনও চিন্তাই থাকবে না, ঘরে বসে বসে ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুলে খাব।

আমার বন্ধু আবারও আমাকে ছাগল বলল। আরে টাকার জন্য যে উন্নয়নের কাজ করতে পারছে না, সে কি করে তোকে এই টাকা দেবে? কত হাজার কোটি টাকা লাগবে জানিস? তার ওপরে স্বাস্থ্যসাথী আছে, এত টাকা কোথা থেকে আসবে, যে তোকে দেবে? ধরে নিলাম, আর যদিও পাস তাহলে তো টাকাটা শোধ করতে হবে। এই যা, ও আবার কী কথা? আমিতো ভেবেছিলাম এ টাকা শোধ করতে হবে না। বলল, তোর ঘাড় ধরে টাকা শোধ করে নেবে। ওটা লোন আর তুইতো শোধ করতে পারবি না, তোর সে ক্ষমতাও নেই। কাজ করবি না বলছিস, কাজ না করলে একসয় কাজ করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলবি। তোর ছেলে মেয়েরাও কাজ করবে। না তোর পরিবারটা একসময় দেউলিয়া হয়ে যাবে। শুধু তোর নয় এই বাংলার মানুষগুলো আগামী দিনে অকর্মণ্যে পরিণত হবে। একসময় দেউলিয়া হয়ে যাবে। সরকারের দানের উপরে বেঁচে থাকবে, নিজের কোনও কিছু করার ক্ষমতা থাকবে না। তুই কি জানিস এই যে মুদি দোকান থেকে যে জিনিসগুলো কিনিস সেগুলো কটা এই রাজ্যে তৈরি হয়? প্যাকেটের গায়ে লেখা ভালো করে দেখ, তাতে বেশিরভাগেরই উত্তর প্রদেশ বা অন্য কোনও রাজ্যের নাম রয়েছে। এই রাজ্যে শিল্প-কলকারখানা কিচ্ছু নেই। তোর মেয়েটা কন্যাশ্রীর টাকা পাচ্ছে, সবুজ সাথী সাইকেল পেয়েছে, যেটা তুই নিজে চালাস। কখনও কি ভেবেছিস, তোর মেয়ে যখন পাস করে বেরোবে তখন তার বিয়ে দিবি কোন ছেলের সঙ্গে। রাজ্যে তো চাকরি বা কাজ নেই। যার সঙ্গে বিয়ে দিবে সেই ছেলেটা কি চাকরি করবে নাকি তোর ছেলের মত সেও দান নিয়ে অকর্মণ্য পরিণত হবে! যার সঙ্গে তোর মেয়ের বিয়ে দিবি সে আর তোর মেয়ে কি তখন ভিক্ষা করে খাবে?

ছাগলের বুদ্ধিতে বেশ কিছুক্ষণ ভাবলাম। অনেকদিন দাড়ি কাটিনি দাড়িগুলো একটু বড় হয়েছে। হঠাৎ মনে হল আমার দাড়ি কি নড়ছে? সঙ্গে সঙ্গে গালে হাত দিলাম, বুঝলাম নড়ছে না, কারণ দাড়িগুলো এখনও তত বড় হয়নি। তখনই মনে হলো, আমি বোধহয় পুরোপুরি ছাগল হইনি। আচ্ছা তাহলে বাকিরা কি আমার মতই একটু করে সেই দিকে এগোচ্ছে? এই যে বলছে রাজ্যে যে উন্নয়ন হয়েছে সারা পৃথিবীতে এরকম হয়নি। এই বাংলায় এত কাজ হয়েছে যা আর কোথাও হয়নি। পৃথিবীর মধ্যে সেরা রাজ্য এই বাংলা। তাহলে সেই কথাগুলো যারা বিশ্বাস করছে তাদেরও কি আমার মত বুদ্ধি! তাদেরও কি ধীরে ধীরে আমার মত ছাগলের দাড়ি গজাচ্ছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *